শরতের রোগা সকালটা মাতোয়ারা ঘ্রাণে—কাঁচা ধানের সবুজ গন্ধ;
তার সঙ্গে দ্রবীভূত তোমার উষ্ণতার নিকোটিন;
দু পাশে সারিবদ্ধ গাছ, ধানখেত, উপরে শাদাকালো আকাশ—
‘মোগলে আজম’-এর দর্শক সবাই, সবার চোখে সেলিমের চোখ,
আনারকলি অধর;
সম্রাট আকবর পরাজিত সবখানি পথ—সারাটা সময়।
গাড়ির জানালা ফুঁড়ে তোমার আমার নিঃশ্বাস পদ্মা-যমুনার
সম্মিলিত স্রোত হয়ে মিশে যায়—
ইলামিত্রের এমবোস স্কেচ আঁকা ভূগোলে।
অথচ আমি জড়িয়ে ধরিনি বাহু, চুমু দিইনি ইচ্ছুক অধরে!
আমাকে টানছিলো মঞ্চ; আমাকে টানছিলো সম্বর্ধনা;
আমাকে টানছিলো সময়!
সমস্ত অনুষ্ঠান জুড়ে তুমি ছিলে দ্বিতীয় কৌতূহল;
তোমার ওই চোখের সমুদ্রে, ঠোঁটের নদীতে—
সাঁতার কেটেছে ডিজিটাল ফ্ল্যাশের ডুবুরি।
আমাকে দেয়া উপহার ও উষ্ণতা শংসা ও সম্মান—
জমা হচ্ছিলো তোমার কোলে; তুমি ধরে রাখছিলে
আমার উদ্বোধিত আবেগ ও অভিব্যক্তি, ছন্দ এবং ছবি;
অথচ আমি একবারও উচ্চারণ করিনি সেই শব্দ
যা ধরার জন্য তৃষিত রিসিভার ছিলো তোমার কান;
তোমাকে বহুবার দেখেছি কিন্তু একটিবারও মেলে ধরিনি
সেই দৃষ্টি যা ধরার জন্য CANON DSLR হয়ে প্রস্তুত
ছিলো তোমার চোখ!
আমি তখন মঞ্চ; আমি তখন সম্বর্ধনা; আমি তখন উদ্যাপন!
দিন শেষ—ভেঙে গেছে সভামঞ্চ; ভেঙে গেছে ভিড়—
থেমে গেছে উপচে পড়া কৌতূহল
অতিথি দর্শক শ্রোতা সবাই শুধু প্রস্থান—
সবাই শুধু অনুপস্থিতি—সবাই শুধু অদৃশ্য।
আর ততক্ষণে এবং সেটা অনেক বছর পর,
আমরা দুজন বিজয় সেনের রাজধানী—
বিজয়নগরের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে;
আমাদের পায়ের নিচে গণইতিহাসের
গণকবর, বিচ্ছিন্ন করোটি ও চাপাকান্না;
আমাদের মাথার ওপর সন্ধ্যার শামিয়ানা,
আমাদের চারপাশে অন্ধকারের বিশ্বস্ত পাহারা;
আমাদের দিকে তাকিয়ে নীরব পদ্মার জলে ভেজা পুরাতন প্রেম;
আমি তোমার বুকের ওঠানামা টের পাচ্ছি,
লোনা উত্তেজনা ছুঁয়ে যাচ্ছে শান্তসাঁঝের পৌরুষ!
প্রবল বাতাসের বেগ কিন্তু তা রূপ নিচ্ছে না ঝড়ে!
এমন অবস্থায় আগে হলে—
আমি তোমাকে শ্রাবণ-ঝড়ের পদ্মা করে তুলেছি;
এমন অবস্থায় আগে হলে তোমাকে ভূকম্পরোধক
ভূমিকম্পের বাড়ি করে তুলেছি!
অথচ আজ শুধু সাড়াহীনতা, আজ শুধু নন-পারফরমেন্স
যদিও তোমার ঠোঁটের কাছে আমার ঠোঁট,
তোমার বুকের কাছে আমার বুক;
আমাদের মনের দেয়ালে অভিন্ন স্মৃতির সাঁওতালি আলপনা!
তোমার গল্পবোনা আঙুল নিয়ে চুমু দিচ্ছি না আমি;
আমার কবিতা লেখা হাতটি হাতে নিয়ে তুমিও চেপে ধরছো না গালে!
এমনি করে সাঁঝ ফুরোলে,
ক্লান্ত শরীরের দখল নেয় সার্কিট হাউজের ভিআইপি নিদ!
মেঘঘন ভোরে—ঘুম থেকে জেগে উঠে লিখতে বসেছি কবিতা;
অতীতের গর্ভ থেকে উঠে আসা স্মৃতির শব্দেরা
কোলাকুলি করছে টেবিলে,
উত্তরাধুনিক নিষেধাজ্ঞা ভেঙে দলে দলে ঢুকে পড়ছে চিত্রকল্প।
রবি ঠাকুরের মুগ্ধ স্বপ্নের উজ্জয়িনী-প্রিয়া নয়,
জীবনানন্দের ট্যাক্টফুল ভাবনার বনলতা সেন নয় নাটোরের,
একদিন বিজয় সেনের রাজধানীতে দিনের আলোয়
মুখোমুখি হয়েছিলাম আমরা; কোনো পূর্বসূত্র ছিলো না।
তোমার চোখ জুড়ে ছিলো পানিহার পাবলিক লাইব্রেরি;
আমার বুক জুড়ে পাঠের পিপাসা।
আমি পাতার পর পাতা উল্টিয়ে গেছি;
তোমার সঙ্গীরা কে কী ভেবেছিলো কে জানে!
অতঃপর একদিন একপাশে উজির, অন্যপাশে অমাত্য,
টেবিলে শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির পুনর্মুদ্রিত সংস্করণ,
ডিবি পুলিশের চোখে চেয়ে তার ৩(২) উপবিধি!
সবকিছু উপেক্ষা করে আমি চুমু দিয়েছি
সংবেদনশীলতার পাহাড়ে ও পর্বতে, সৈকতে ও সমতলে;
উত্তাল অভিকর্ষে টান টান হয়ে উঠেছে সেন্টার অব গ্রাভিটি!
অতঃপর বাসে-ট্রেনে-বেডরুমে-বৈঠকখানায়,
সার্কিট হাউজের ভিআইপি নির্জনতায়,
চাইনিজ রেস্তোরাঁর ডিজিটাল আলো-আঁধারে—
সবখানেই বেজে উঠেছে—
ভালোবাসার আবহসংগীত দানাদার চুম্বনের শব্দ!
সেন্ট মার্টিন দ্বীপে তুমি উড়িয়েছো প্রণয়েরর ফ্ল্যাগ;
গঙ্গামতির মেরুন সূর্যোদয়ে,
গ্রেট ওশান রোডের সমুদ্রস্বনিত মোড়ে
আমি গেয়েছি ভালোবাসার গান।
শেষ হেমন্তের জোছনা ছুঁয়ে প্রণয়ের জলচিঠি পৌঁছে গেছে
নীলস্বপ্নের দুয়ারে। আকাশে-বাতাসে পাহাড়ে-পর্বতে
মুগ্ধতার বর্ণমালা সাজিয়ে দিয়েছে প্রণয়ের পাঠশালা।
সিলেবাস জুড়ে শুধু প্রণয়ের পাঠ, ভালোবাসার হোমওয়ার্ক।
কিন্তু এইবার কেন এই ব্যতিক্রম?
আমি কি তোমার কাছ থেকে সরে এসেছিলাম?
আমাকে কি ডেকে নিয়েছিলো অন্য কোনো প্রেম?
ভালোবাসা কি এশিয়ার নদী যে খুলে দেয়
উজানের মুখ নব প্লবনের আগমনে ও আবেদনে?
হয়তোবা এ প্রশ্নেরও উত্তর আছে।
কিন্তু তথ্য অধিকার আইন যা-ই বলুক,
যতই যুক্তি তুলে ধরুক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল,
এটা জানার সুযোগ পাবে না অন্য কেউ।
শুধু তুমি জেনে রেখো—
ইউরোপের নানা ক্লাবে খেলেও মেসি যেমন আর্জেন্টিনার,
আইপিএলে কাউন্টিতে খেলেও
সাকিব যেমন বাংলাদেশের,
বিজয় সেনের রাজধানী বিজয়নগরের
ধূসর ধংসাবশেষে দাঁড়িয়ে থাকা হে অনার্য রাজকন্যা,
প্রণয়ের পতাকা হাতে আমিও তেমনি তোমার!