বাংলাদেশটা তখন ছিল পূর্ব পাকিস্তান,
তখনো এই সবুজ মাঠে ফলতো সোনার ধান।
কিন্তু তখন ঘরে ছিল শত্রু বিভীষণ,
জিন্নাহ থেকে ইয়াহিয়া ছিল নানান জন,
কলঙ্কিত পতাকাতে খচিত এক চান,
পাকভক্ত মুসলিম লীগের বেহুদা সম্মান।
কায়েদে আযম দখল করতে চাইলো মুখের ভাষা,
উর্দু হবে রাষ্ট্রভাষা, এটাই ছিল আশা।
ফুঁসে উঠলো সব বাঙালি, গেল তাজা প্রাণ,
শাসকশ্রেণি আয়েশে নেয় তাজা রক্তের ঘ্রাণ।
ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী আর ভাসানী ত্রয়,
গঠন করেন যুক্তফ্রন্ট যা আনে বিপুল জয়।
শাসকশ্রেণির হূদয় ভেঙে হলো যে খান খান,
ভেতর পোড়া হূদয় রেখে উপরেতে ভান।
যুক্তফ্রন্টকে রাজ্যশাসন করতে কি দেয় তারা?
কয়েকদিনেই শয়তানেরা দেয় যে মাথাচাড়া।
ক্ষমতাচ্যুত করতে ফ্রন্টকে মন করে আনচান,
ভারতপ্রীতির দোষ দেখিয়ে বাঁচায় হারের মান।
পাকিস্তানের রাজস্বটার সিংহভাগের দাতার,
প্রতিরক্ষার নাই ব্যবস্থা কেবল বান্ধে কাতার।
পঁয়ষট্টির যুদ্ধে সবার ওষ্ঠাগত প্রাণ,
পাক-ভারতের গুলির শব্দে যায় বাঙালির কান।
এদিক গুলি ওদিক গুলি শাসক নেয় না খোঁজ,
পূর্ব পাকিস্তানের দুখেও ওদের ভুঁড়িভোজ।
বুঝে ফেলে পাকিরা ঠিক দিচ্ছে না সম্মান,
আড়মোড়াটা ভেঙে সবাই তখনই টান টান।
উনিশশত ছেষট্টি সাল তেইশ তারিখের মার্চে,
শেখ মুজিবুর ভেবে বলেন, ছয় দফা দিই তারচে।
পাকিরা সব খাচ্ছে বসে শিককাবাব আর নান,
ঠিক সে সময় লাহোরে পেশ করেন দাবিখান।
আবার শাসক ফুঁসে ওঠে ছয় দফারই তোড়ে,
সবাইকেই করে গ্রেফতার কেবল গায়ের জোরে।
আগরতলা ষড়যন্ত্রের কৌশলে দেয় শান,
তখন ক্ষমতাতে আসীন শয়তান আইয়ুব খান।
রাজপথটা কেঁপে ওঠে লোকের পদভারে,
ছাড়বে না পথ শাসক যদি নেতাকে না ছাড়ে।
জহিরুল হক, শামসুজ্জোহা, আর কত লাশ চান?
শেখ মুজিবের মুক্তি চেয়ে ওঠে যে স্লোগান।
অবশেষে শেখ মুজিবুর জেল মুক্তি পান,
বঙ্গবন্ধু উপাধি পায় পাকাপোক্ত স্থান।
জনরোষটা বাড়তে থাকে শাসকশ্রেণির প্রতি,
নির্বিচারে চালায় গুলি হয় যে জানের ক্ষতি।
পূর্ব পাকিস্তানে আসে অস্ত্রেরও চালান,
আবারও তাই শ্যামল ঘাসে রক্তস্রোতের বান।
বঙ্গবন্ধু একুশ দফার যখন তোলেন দাবি,
স্বঘোষিত লৌহমানব খায় যে তখন খাবি।
সিংহাসনের মায়া ছাড়েন বদ আইয়ুব খান,
পাকিস্তানে শেষ হয় না বদমাশের চালান।
আইয়ুব খানের পরে আসে আরেক খানের চেলা,
নিপীড়নটা তাদের কাছে যেন একটা খেলা।
মানবরক্ত খাওয়ার প্রতি তার দেখা যায় টান,
খুন-খারাপির কৌশল তাই দেখায় সে নানান।
এরই মধ্যে সাইক্লোন হয় পূর্ব পাকিস্তানে,
ভয়ংকর সে দিনের কথা ভুক্তভোগীই জানে।
চতুর্দিকেই লাশের সারি সামনে বাম আর ডান,
মুহূর্তে দেশ হয় যেন এক গণকবরস্থান।
ইয়াহিয়া নেয় না খবর ভাগ্যহত লোকের,
শোকপ্রস্তাব আনে না সে এতবড় শোকের।
দুর্গতদের দেয় না মোটেও কোনোরকম ত্রাণ,
সবাই বোঝে নাই যে ওদের একটুখানিও টান।
ছদ্মবেশী শত্রু ওরা নাই কোনো আর আপোস,
নির্বাচনে তাই ফলাফল আসন নিরঙ্কুশ।
আওয়ামী লীগ হয় বিজয়ী—বিশাল ব্যবধান,
সিংহাসনের মায়া বুঝি হয় দিতে কোরবান।
শেখ মুজিবুর সদলবলে যদিও বা জেতে,
ভুট্টো কিন্তু হেরে গিয়েও ক্ষমতা চায় পেতে।
শুরু করে টালবাহানা আলী এবং খান,
দুয়ে মিলে হয়ে ওঠে জানের টুকরা জান।
নিপীড়ন আর বৈষম্যে দেয়ালে পিঠ ঠেকে,
শেখ মুজিবুর সাতই মার্চে বলেন না আর ঢেকে।
নেতার মুখে কবির ভাষা, মধুর কলতান,
প্রেমাবেগে গেয়ে ওঠেন যুদ্ধজয়ের গান।
এবারের এই সংগ্রামটা কেবল সবার মুক্তির,
সংগ্রামটা স্বাধীনতার নয় মোটে সংযুক্তির।
প্রতি গ্রামে দাও উড়িয়ে সংগ্রামী নিশান,
যার যা আছে তা-ই নিয়ে হও যুদ্ধে আগুয়ান।
এরই মাঝে পঁচিশে মার্চ শকুন নামে দেশে,
পাকিস্তানি শকুনগুলো মানুষ মারে হেসে।
আর্তনাদে প্রকম্পিত হয় জমিন আসমান,
বাদ যায় না বাড়ি-গাড়ি নদীরও সাম্পান।
বঙ্গবন্ধু ওয়ারলেসে, মেজর জিয়া বেতারে—
পড়ে শোনান এই ঘোষণা দিতে বলছেন কে তারে।
দেশের মানুষ রেডিওতে শোনে পেতে কান,
বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীন দেশের আহ্বান।
পিত্তিজ্বলা পাকিস্তানে নিত্যি খবর যায়,
বীরবাঙালি নিরস্ত্র তাও না কোনো ভয় পায়।
জোর কদমে যুদ্ধ চলে হয় না তো নিষ্প্রাণ,
শয়তানেরা চায় যে নিতে মা-বোনের সম্মান।
জলপাই রং ট্যাংক ঢুকে যায় শহর থেকে গাঁয়ে,
ছেলে গেছে মুক্তিযুদ্ধে, ভয়ার্ত বাপ-মায়ে।
জান বাঁচাতে কিছু মানুষ প্রাণভিক্ষা চান,
দলে দলে শরণার্থী ভারতমুখী যান।
ন’মাসব্যাপী যুদ্ধ করে অস্ত্র শিক্ষা নিয়ে,
খালি গায়ে, খালি পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে,
চলে হেঁটে, নদী সাঁতরে নাই তো বাহন যান,
রক্তস্রোতের মাঝে আসে বিজয়ের নিশান।
ডিসেম্বরের ষোলোয় পালায় পাকিস্তানি খান,
গলা ছেড়ে গায় বাঙালি মুক্তদেশের গান।
তিরিশ লক্ষ প্রাণে বাঁচে শেখ মুজিবের মান,
দু’লাখ বোনের সম্ভ্রমেতে বাঁচে দেশের প্রাণ,
আমার সোনার বাংলাদেশ আজ, মুক্ত স্বাধীন স্থান।