/ ব্রত রায়
[বইমেলাতে যাব বলে বাসে চড়েছিলাম কুড়ি টাকা সম্বল করে। শাহবাগে এসে ভাঙতি না থাকায় বাসের কন্ডাকটর আমাকে আর একটি মেয়েকে একটি কুড়ি টাকার নোট দিয়ে বলেছিল ভাঙিয়ে নিতে। ভাঙাতে না পেরে দশ টাকা দিয়ে একটি গোলাপ ফুল কিনে সেই ফুল আর বাকি দশ টাকা মেয়েটির হাতে দিয়ে হাঁটা ধরলাম। সে-ও এলো আমার সঙ্গে সঙ্গে। তারপর আরও দু’টো কথা শুনিয়ে ফুল হাতে নিয়ে সাদিয়া নামের মেয়েটি তার বান্ধবীর হলের দিকে চলে গেলো। আমি গেলাম আমার বন্ধু রিয়াদের খোঁজে। তারপর...]
রিয়াদ ছেলেটা ভালো। আমার কাছে ভালো মানুষের সংজ্ঞা খুব সিম্পল। যারা বিপদে-আপদে টাকা ধার দেয় তারাই ভালো মানুষ। এই সংজ্ঞানুসারে আমার ছোট চাচা ভয়ঙ্কর খারাপ। চাচার তুলনায় চাচি কিছুটা কম খারাপ। চাচি মাঝেমধ্যে ধার দেয়। ছোট চাচা আজফারউদ্দিন—যাকে আমি বাটপারউদ্দিন নাম দিয়েছি, ওষুধের বিজনেস করে। কুড়িবছর আগে চাকরিবাকরি যখন কিছুই পাচ্ছিল না তখন আমার বলদ বাপ নিজের ডিপিএস আর সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে তাকে চার লাখ টাকা দিয়েছিল। সেই টাকা চোদ্দ বছর ধরে ধানাইপানাই করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়েও ফেরত দেয়নি। বাটা ও অন্যান্য কোম্পানির প্রচুর জুতার সোল ক্ষয় করেও সেটা উদ্ধার করা যায়নি। বাটপারউদ্দিনের ধারণা আমার বাপ আমার দাদার কোটি কোটি টাকার (?) সহায়সম্পত্তি ভোগ করেছে, সুতরাং চার লাখ টাকা তো নেওয়াই যায়! বলাই বাহুল্য, আমার দাদার কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি ছিল না। তবে লাখ লাখ টাকা ঋণ ছিল। আমার গাধা বাপ সেইগুলো শোধ করেছে। নিজের ভাইবোনকে পড়িয়ে-শুনিয়ে অমানুষ করেছে! এখন তার ফল ভোগ করছে।
রিয়াদ বাংলা একাডেমির কি একটা প্রোগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে স্ক্রিপ্ট রাইটিং শেখে। এর বিনিময়ে কিছু টাকাও পায়। তবে এটাই তার আয়ের মূল উত্স নয়। সে একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। ভালো ইনকাম হয় সেটা থেকে। তবে এটাও তার আয়ের মূল সোর্স না। তার বাপের খাতুনগঞ্জে আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা আছে। যখন যে দ্রব্যের দাম আকাশচুম্বি হয়ে যায় তার বাপ সেই দ্রব্যের মজুদ করে অথবা উল্টো করে বলা যায়, তার বাপ ও বাপের বন্ধুরা যখন যে দ্রব্যের মজুদ করে সেই দ্রব্যের দাম আকাশচুম্বি হয়ে যায়। এই লোকের টাকা-পয়সার কোনো হিসাব-নিকাশ নেই। রিয়াদও ঠিকঠাক জানে না।
রিয়াদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলো বাপের টাকা ধ্বংস করা। সে আর্টফিল্ম বানাবে। সত্যজিত্ রায় হবে। আব্বাস—সামথিং হবে। নিজে সে ভালোই ইনকাম করে তবে সেই ইনকাম তার চা-নাস্তায় আর বন্ধুবাত্সল্যে খরচ হয়। বাপের টাকাই তার আয়ের মূল উত্স। তার বাপ ছেলেকে পছন্দ করে না, কিন্তু সেই অপছন্দের সঙ্গে আর্থিক বরাদ্দের কোনো সম্পর্ক নেই।
রিয়াদ আমার কাছে কত টাকা পায় তারও কোনো হিসাব নেই। হিসাব রাখার দায়ও নেই। সে দিয়েছে সে-ই হিসাব রাখবে। তবে হিসাব তার কাছেও নেই। তার টাকা ফেরত দেওয়ার কোনো দূরতম পরিকল্পনা আমার নেই। তবে প্রতিবার টাকা ধার দেওয়ার সময় রিয়াদ আমাকে বলে, ‘দোস্ত টাকাটা সোমবারের মধ্যে ফেরত দিস! আমার খুব টানাটানি চলছে। মিস করিস না!’
কোন সোমবার সে বিষয়ে কোনো মতৈক্য হয়নি। হয়ও না। আমি বলি, ‘অবশ্যই দোস্ত।’
রিয়াদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের ইতিহাস প্রায় সুলতানি আমলের। রম্য গল্প মানে ইতিহাসের ক্লাস নয় (যদিও ইতিহাসে প্রচুর ফানি ব্যাপার আছে), কাজেই বলার প্রয়োজন মনে করছি না। তবে বন্ধুত্বটা এমন যে তার কাছে টাকা ধার চাওয়ার সময় ফিলিংটা হয় এমন— যেন টাকাটা আমারই, তার কাছে গচ্ছিত ছিল। চাহিবা মাত্র টাকা ধার দিতে বাধ্য থাকিবে—টাইপের ব্যাপার!
আমি একটা কন্সট্রাকশন কোম্পানিতে কাজ করি। এরা বিল্ডিং, রাস্তাঘাট বানায়। কিন্তু এদের বিল আটকে থাকে মাসের পর মাস। সম্প্রতি আগের সরকারের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির একটা বড়ো প্রজেক্টে এরা সিভিল কন্ট্রাকটর হিসেবে কাজ নিয়েছিল। বিরাট বিনিয়োগও করেছিল ব্যাংকলোন নিয়ে। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর বেচারা দুর্নীতি মামলায় ফেঁসে গেছে। কে না জানে এ দেশের সকল দুর্নীতি আগের সরকার করে! ভদ্রলোকের সমস্ত ব্যাংক একাউন্ট সিজ করে দিয়েছে সরকার। কাজেই পেমেন্ট বন্ধ। আমার কোম্পানির মাথায় হাত। রড-সিমেন্ট-বালুর সাপ্লায়াররা কোটি কোটি টাকা পাবে। আমাদের মালিক পালিয়ে গেছে মালয়েশিয়ায়। বেতন বন্ধ তিন মাসের মতো। টেকনিক্যাল লোকজন অন্যত্র চাকরি নিয়ে নিয়েছে, আমি গিয়েছি ফেঁসে। অফিসের একটা ল্যাপটপ ছিল আমার কাছে—ওটা বেচে দিয়েছি গতমাসে। সে টাকাও শেষ। এখন রিয়াদই ভরসা।
রিয়াদের জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে অপেক্ষা করানো। তার জন্মগত সমস্যা এটি। তার মা ডেলিভারি পেইন নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। তিনদিন অপেক্ষা করিয়েছে রিয়াদ তাকে। ও যদি বলে আধঘণ্টা লাগবে, তার মানে হচ্ছে ও কেবল ঘুম থেকে ওঠেছে। সাদিয়ার সঙ্গেও নিশ্চয়ই সে এরকমই করে। তবে ওর সঙ্গে মেয়েটার যেহেতু এতদিনের... সেহেতু সে-ও নিশ্চয়ই বুঝে গেছে রিয়াদের আধঘণ্টা আসলে ত্রিশ মিনিট নয়।
আজ সে অবশ্য একুশ মিনিটের মধ্যেই এলো। একগাল হেসে বলল, ‘কি রে কখন এসেছিস?’ রিয়াদের হাসি প্রীতি জিনতার মতো। আমি বেজার মুখে বললাম, ‘এই তো মাত্রই এসেছি।’
‘ভালো দিনে এসেছিস। আজ সাদিয়ার জন্মদিন।’
‘সাদিয়ার জন্মদিন তো আমি কী করব? মুজরা? আমার টাকাটা দিয়ে দে চলে যাই!’
আমি এমনভাবে বললাম যেন আমি ধার চাইতে আসিনি, ওই আমার কাছ থেকে ধার নিয়ে ঘোরাচ্ছে!
রিয়াদ বলল, ‘আরে দাঁড়া দাঁড়া! কোন রাজকার্য করিস তুই! তোর অফিসটাই তো উঠে গেছে! শালা বেকারের আবার ব্যস্ততা! দাঁড়া, সাদিয়া আসছে। তোকে দেখলে খুশি হবে। ফুলটুল কেনার টাকা আছে, না তাও নেই? এই নে ধর একশো টাকা। শাহবাগ মোড় থেকে কিনে দিস! শালা ডিনার করাব পাঁচশ টাকার—একশ টাকা ইনভেস্ট কর!’ তারপর কী মনে হতে বলল, ‘শালা ইনভেস্টও তো আমিই করছি! ফকিরনির ফকিরনি! এই একশও লিখে রাখিস, এমনিই আমার হাতে টাকা-পয়সা একদম নেই!’
আমি একশ টাকা হাতে নিয়ে তেতোমুখ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। এবং ঠিক করলাম, ফুলটুল কিচ্ছু কিনব না!
রিয়াদ সিগারেট ধরিয়ে কয়টা টান দিয়ে আমাকে দিয়ে বলল, ‘ওই তো সাদিয়া আসছে!’
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। সাদিয়া আসছে। তার সঙ্গে ওটা কে? আমার খালাত বোন! সর্বনাশ! g