ফেসবুক থেকে বিদায়

/ শেখ সজীব আহমাদ

 

আবুল মন খারাপ করে একটি বটগাছের নিচে বসে আছে। তেমন কারো সঙ্গে কথাবার্তাও বলে না। মন খারাপের কারণ হলো, এবারের বইমেলায় তার একটিও বই বিক্রি হয়নি।

ফেসবুকে তার পাঁচ হাজার বন্ধু রয়েছে। তার বই সংগ্রহ করবে বলে অনেকেই আশ্বাস দিয়েছিল। বইটা নিয়ে কত যে প্রচারণা—ফেসবুক থেকে শুরু করে, পত্র-পত্রিকাসহ  টেলিভিশনেও।

আবুল বইটির জন্য অনেক টাকা খরচ করেছে। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। আবুল মেলার শেষের দিন তার প্রকাশনীর স্টলে গিয়ে দেখে যেভাবে বইগুলো ছিল, সেভাবেই আছে। মনে হয়, কেউ নেড়েচেড়েও দেখেনি। তারপর আবুল অনলাইনে বই বিক্রির খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো— অনলাইনেও তার বই বিক্রি হয়নি। আবুল চিন্তায় পড়ে যায়, কেন বই বিক্রি হলো না!

আবুল ফেসবুকে লেখা পোস্ট করা মাত্রই লাইক-কমেন্টসের বন্যা বয়ে যেত। কমেন্ট বক্সে অনেকেই লিখত—‘ভালো লাগল, পাঠে মুগ্ধ!’ ‘দারুণ হয়েছে! আরও লেখা চাই।’ ‘বাহ্ চমত্কার!’ ‘অসাধারণ, চালিয়ে যান।’ ‘মনোমুগ্ধকর, হূদয়ছোঁয়া প্রকাশ’ ইত্যাদি। তাই আবুল ভেবেছিল পাঠকের অভাব হবে না। যদি এবার বইমেলায় তার বই বের হয় তাহলে ভালোই চলবে।

কিন্তু আবুল বুঝল না, তার লেখা যে মানসম্মত না। তার লেখায় যে কত ভুল আছে, তা সে নিজেও জানে না। এত লেখা ফেসবুকে পোস্ট করেছে, কোনোদিন কমেন্ট করে সংশোধন করার জন্যে কেউ বলেনি। বলবে বা কেমন করে, সবাই তো তার লেখাটা পড়ে কমেন্ট করে না। অনেকে না পড়েই কমেন্ট করা শুরু করে।

তবে আমি লেখাটা পড়তাম, চোখে ভুল দেখলেও কিছু বলতাম না, যদি মনে কষ্ট পায়! উত্সাহ দিয়ে যেতাম।

আর প্রকাশনী টাকা পেলে প্রকাশ করবে, এটাই স্বাভাবিক। মেলা শেষ হওয়ার পরই, প্রকাশনী আবুলকে ডেকে বইয়ের হিসেব দিয়ে তাকে সব কপিই ফেরত দিয়ে দেয়। আবুলের মুখে কোনো কথা নেই। প্রকাশনী প্রকাশক আবুলকে বলে, ‘দেখেন ভাই, আপনার মুখের দিকে চেয়ে, আপনার অনুরোধেই আপনার মানহীন লেখাগুলো ছাপাইছি।

আপনার লেখায় এত ভুল, তা সম্পাদকের পক্ষে সম্পাদনা করা সম্ভব ছিল না।

আবুলের মুখে কোনো কথা নেই।

চুপ হয়ে মন খারাপ করে বুড়িগঙ্গা নদীর দিকে এসে বইগুলো নদীতে ফেলে দিল। তারপর বলল, ‘লেখালেখির গোষ্ঠিকিলাই! আর লেখালেখি করব না। ফেসবুকও চালাব না।’

তারপর আবুল ফেসবুক থেকে বিদায় নেয় একটি স্ট্যাটাস দিয়ে—

‘আমি আর লেখালেখি করছি না এবং ফেসবুকে আসব না, ফেসবুক থেকে বিদায়।’

তত্ক্ষণাত্ একজন কমেন্ট করে- ‘ভাই, আমি আপনার ‘ফেসবুক থেকে বিদায়’ গল্পের বইটি কিনতে পারিনি, মেলাও তো শেষ। বইটা অনলাইন থেকে কিনে নেব।’ তারপর এক এক করে কমেন্ট আসতে থাকে—‘শুভ কামনা রইল, আরও এগিয়ে যান।’ ‘ভাই, এই বইটি মেলায় কেমন চলছে?’ ‘আপনে তো আমাকে সৌজন্য কপি দিলেন না।’

আবুল ভুলেও আর ফেসবুকে তাকাল না।

কমেন্টগুলোও দেখল না। আবুল বইটির নামও দিয়েছিল ‘ফেসবুক থেকে বিদায়।’ এবার আবুল ফেসবুক থেকে বিদায় গল্পটির মতোই ফেসবুককে বিদায় জানালেন। কেউ আর বলল না, ‘ভাই, কী হয়েছে? সত্যি-ই কি ফেসবুক থেকে বিদায় নিচ্ছেন?’

আমার মতো অনেকেই ভেবেছে, হয়তো এটিও ‘ফেসবুক থেকে বিদায়’ গল্পের কোনো অংশ। আমিও কমেন্ট করলাম—‘বন্ধু, আমি তোমার বইটি কিনতে পারিনি। আমি তো দেশের বাইরে আছি। আমার জন্য এক কপি রেখে দিও, দেশে এলে যেন পাই।’

টঙ্গীবাড়ি, মুন্সীগঞ্জ।