‘এতদিন কোথায় ছিলেন মহামান্য হিরু মহা সেন (মহাশয়)?’ হিরুদের পাড়ার কোনো কবি নয়, যেন স্বয়ং জীবনানন্দ দাশই প্রশ্নটা করলেন!
হিরু কবির দিকে তাকিয়ে প্রথমে কিছু বলল না। সুরুত্ করে চায়ের কাপে চুমুক দিলো।
কবি ফের বললেন, ‘আপনি নাই, জানেন—এদিকে কত কত কাণ্ড ঘটে গেলো...।’
হিরু প্রশ্নসূচক মুখে কবির দিকে তাকাল।
কবি বললেন, ‘তার আগে একটি কথা বলুন তো— কী এমন কাজ নিয়ে বিজি ছিলেন যে বইমেলায় বই বের করলেন না?’
‘ইজি কাজে বিজি ছিলাম।’ হিরু জবাব দিলো।
কবিকে সন্তুষ্ট মনে হলো না। তিনি বলতে লাগলেন, ‘তবে এটা ভালো কাজ করেছেন। ব্যস্ততার কারণে বই করেননি। কিন্তু একদিকে বইও বের হলো অন্যদিকে আপনি ব্যস্ততার কারণে সময়ই দিতে পারলেন না, তাহলে কিন্তু সাড়ে সর্বনাশ হতো!’
‘কেন?’ হিরু জানতে চাইল।
‘বা-রে! আপনি দেখছি কিছুই জানেন না। এখন বই বের হলে সেই বই বিক্রির দায়িত্ব এসে লেখকের ঘাড়েই ওঠে। আর আপনি বই প্রকাশ করে যদি লাপাত্তা হয়ে যান, তাহলে আপনার বই বেচবে কে?’
‘ওওও।’ হিরু ছোট্ট করে বলল।
‘কেবল ‘ও’ বললে হবে না। সিরিয়াস ব্যাপার। আপনাকেও সিরিয়াস হতে হবে। কেবল বই বের করে মেলায় গিয়ে স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেই হবে না। হকারদের মতো করে পাঠককে স্টলে ডেকে আনতে হবে।’
হিরু বলল, ‘এভাবেই বুঝি বেস্ট সেলার লেখকদের বই চলে?’
‘না। তাদেরটা চলে অন্য স্টাইলে।’
‘কেমন সেটা?’
‘এক শ্রেণির লেখক বেস্ট সেলার হয় পুশ সেলিংয়ের মাধ্যমে। তার কাছে যারা যারা বিভিন্ন কাজে ধরা, তাদের দিয়ে বই কেনায়। বই কিনে কারা দলা পাকিয়ে ফেলে রাখল নাকি ঠোঙা ব্যবসায়ীর কাজে বিক্রি করে দিল—সেই ভাবনা ভাবার সময় লেখকের নেই। দিন শেষে প্রকাশক দেখে—তার বই বিক্রি হচ্ছে! আর যারা পুশ সেলিংয়ে নেই, তারা বিজ্ঞাপন আর বুস্টিং-এর মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন পাঠকের সামনে উপস্থাপন করে। যেই টাকা তারা বিজ্ঞাপনের পেছনে খরচ করল, সেই টাকার বই বিক্রি হয় না বটে, কিন্তু প্রকাশকের তো তা জানতে বয়েই গেছে। সে দেখে, আরে এই লেখকের বই তো দেদারসে বিক্রি হচ্ছে, যাকে বলে একেবারে মুড়ি-মুড়কির মতো...।’
কবি চুপ। হিরু বলল, ‘এভাবেই বইমেলা চলছে নাকি?’
কবি উত্তেজিত। বললেন, ‘তাহলে আর বলছি কী। এখন বইমেলা চলে ক্ষমতায় আর টাকায়।’
‘তা আপনার বই কিসে চলল?’
কবি হঠাত্ থমকে গেলেন।
হিরু ফের বলল, ‘আমি যদ্দুর জানি—আপনার বই বেস্ট সেলার না হলেও ভালো চলে। সেসব কি ক্ষমতায় নাকি টাকায়?’
‘জানেনই তো— ও দুটোর একটাও আমার নাই।’ কবি অসহায় ভাবে বললেন।
হিরু বলল, ‘দরকারও নাই। মেধা থাকলে বই চলবেই। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ—এরা কি মেলায় গিয়ে বসে থাকেন? মৃত্যুর পরেও এদের কী এমন ক্ষমতা? তাদের হয়ে টাকাই বা যোগায় কে? ভূতে? কেউ না। এদের বই কি চলে না? ভালো চলে। ভালো লিখলে বই চলবেই। তা আজ না হোক কাল।’
‘তা ঠিক।’
‘তাছাড়া এখনকার বেস্ট সেলার লেখকরা সব ইজি কাজে বিজি আছেন। লেখালিখি সবচে কঠিন কাজ। সেখানে তারা সময় দেন না। লেখার মান নেই। বাক্য বিন্যাসও ঠিক নেই। কাহিনি ত্যানাপ্যাঁচানো। সেসবে তারা জোর না দিয়ে জোর দেন বইয়ের বিজ্ঞাপনে। এভাবে ইজি কাজে বিজি হলে লেখক হিসেবে টেকা যাবে না। মহাকাল মনে রাখবে না তাদের।’
কবিকে এতক্ষণে বেশ উত্ফুল্ল মনে হলো। বললেন, ‘জানেন, গত একমাস কী পরিমাণ মানসিক চাপ গেছে। একই স্টলে বেস্ট সেলার লেখকদের কী দৌরাত্ম্য, আর আমার বই চলে কচ্ছপের গতিতে... আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন? আপনার থেকে এই কথাগুলো আরো আগে শুনলে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে পারতাম। চা খাবেন আরেক কাপ?’
দুই.
পাড়ার ছোটভাই আরিফ হিরুকে দূর থেকে দেখে প্রায় দৌড়ে সামনে এসে দাঁড়াল।
‘হিরু দা, এতদিন কোথায় ছিলে?’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল ছেলেটা।
‘ইজি কাজে বিজি ছিলাম রে...।’
‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করছিলে এতদিন, তাই না?’ আরিফ হিরুর কথায় কানই দিলো না। ‘এদিকে আমি ভালো কাজ করতে গিয়েও মানুষের দাম পাই না...!’ হতাশ ছেলেটা।
হিরু আরিফকে ভালো করেই চেনে। ভদ্র। নানা ধরনের সামাজিক কাজ করে বেড়ায়। গাছ লাগায়। রক্ত লাগলে যোগাড় করে দেয়। নানাভাবেই মানুষের উপকারে দৌড়ে আসে। অথচ, সেই ছেলেরই কিনা দাম নাই...!
হিরু বলল, ‘এভাবে মানুষ দেখে দৌড়ে গেলে দাম পাবি কেমনে?’
‘কী বলো ভাই।’
‘শোন, মানুষের উপকার করিস, করবি। একশবার নয় হাজারবার করবি। কিন্তু তুইও তো বড়ো হচ্ছিস। একটু ভাব নিতে শেখ।
‘কীভাবে ভাব নিবো ভাই?’
‘সবসময় ইজি কাজে বিজি থাকবি।’
‘বুঝলাম না ভাই।’
‘মানুষকে ব্যস্ততার ভান দেখাবি।’
‘কীভাবে?’ আরিফ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় ওর ফোন এলো। আরিফ একবার হিরুর দিকে তাকিয়ে তার হিরু দা বিরক্ত হয় কিনা এই ভেবে ফোনটা রিসিভ করে ফিসফিস করে বলল, বিজি আছি। পরে ফোন দিচ্ছি।’
ততক্ষণে হিরুর চোখমুখ বিস্ফোরিত।
‘কী হলো হিরু দা? ভূত দেখলে নাকি?’
হিরু স্ফিত হেসে বলল, ‘জানতাম—তুই আমার পরামর্শটা নিবি। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যে রপ্ত করে ফেলবি, বুঝতে পারিনি।’
আরিফের বুঝতে পাক্কা এক মিনিট সময় লাগল। তারপর হো হো করে হেসে ফেলল।
হিরু ছেলেটার পিঠ চাপড়ে দিয়ে সামনে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল, ‘আমি ফোন দিলে আবার ‘ব্যস্ত আছি ভাই, পরে ফোন দিচ্ছি’ বলিস না যেন!
‘কিন্তু যদি ইজি কাজে নয়, সত্যি সত্যিই বিজি থাকি, তখন?’ পেছনে আরিফ কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
তিন.
আজ নারী দিবস। সারাদিন হিরুকে নানা কাজে আটকে রেখেছে সোলায়মান কেবলাপুরী ও তার সাঙ্গরা। উদ্দেশ্য, এমন দিনে নিজের স্ত্রী কিংবা পাড়ার নারীদের নিয়ে হিরু যাতে কোনো প্রোগ্রাম না করতে পারে। ইতিবাচক কোনো বক্তব্য রাখতে পারে। বইকে সময় দিতে না পারে। হিরুও বোকার মতো ওদের ফাঁদে পা দিল!
সারাদিনে হিরুর বউ বার কয়েক ফোন দিলেও হিরু গা ধরেনি। কেবল বলল, ‘ইজি কাজে বিজি আছি। বাসায় গিয়ে কথা হবে।’
রাত গড়াচ্ছে। কেবলাপুরী ও তার সাঙ্গরা ভাবছে, এখন হিরুকে ছেড়ে দেওয়াই ভালো। বাসায় বউয়ের উত্তপ্ত উনুনে গিয়ে পড়ুক!
হিরুর পেছন পেছন চলল সকলে। পাড়ার লোকজনও সঙ্গ নিয়েছে। হিরু প্রথমে দোকান থেকে এক পিস গোলাপ কিনল।
‘মাত্র একটা গোলাপ! এতে কি বউ শান্ত হবে?’ সোলায়মান কেবলাপুরী ও তার সাঙ্গরা ভাবল।
হিরু বাসায় গিয়ে অবাক। বউ তার জন্য এক তোড়া ফুল নিয়ে বসে আছে।
‘এবার জমবে খেলা।’ সোলায়মান কেবলাপুরী ও তার সাঙ্গরা মনে মনে উত্ফুল্ল।
সারাদিন পর হিরুকে দেখে তার বউ ক্ষ্যাপাস্বরে বলল, ‘মিনসে, মাত্র এক পিস ফুল?’
হিরু বলল, ‘তুমি এক তোড়া নিয়ে এসেছো, তাতেই হবে।’
‘আরে, এটা তো আজ এক অনুষ্ঠানে গিয়ে পেলাম।’
হিরু এবার গাল ফোলাল, ‘তারমানে তুমি আমার জন্য কিছুই কেনোনি?’
সোলায়মান কেবলাপুরী গং ভাবল, এই বুঝি ঝগড়া লেগে গেলো। ঘরের সমস্ত কাপ-পিরিচ-শোপিচগুলো ভাঙতে চলল...!
কিন্তু কিছুই হলো না।
হিরু তার বউকে ফুলটা দিয়ে বলল, ‘তুমি আমার রানি।’
হিরুর বউ তোড়াটা বাড়িয়ে ধরে বলল, ‘তুমি আমার রাজা।’
অন্যরা অধৈর্য্য। এ আবার কেমনতর পরিবার! পারিবারিক ঝগড়াবিবাদ ছাড়া কি ফ্যামিলি হয়? আর ঝগড়ার যে ধরন! একটা পিরিচ পর্যন্ত কেউ ছুঁড়ে মারল না।
সোলায়মান কেবলাপুরী তার সাঙ্গপাঙ্গদের বলল, ‘এরা ইজি কাজে বিজি আছে। কিন্তু আমরা তো ওদের মতো ভ্যাদাইম্মা না। বহুত কাজ পড়ে আছে। চল।’
সোলায়মান কেবলাপুরীর সাথে সাথে পাড়ার অতি উত্সুক লোকগুলোও বাড়ির পথ ধরল। একটু পরে তারা প্রত্যেকেই ইজি কাজে বিজি হয়ে পড়ল।
দাম্পত্য কলহ! g