‘গোল্ডেন গার্ল’ মারজান

কারাতের পোশাকে লাগানো থাকে জাতীয় পতাকা। ওই পতাকার দিকেই তাকিয়েছেন প্রতিটি লড়াইয়ের আগে। যখন খেলতে নেমেছেন তখন তার মনে হয়েছে এই পতাকার জন্য লড়বেন। কিছু একটা করে দেখাবেন। মারজান করে দেখিয়েছেন। তবে মেয়ের এমন আনন্দের দিনে নিশ্চয় সবচেয়ে খুশি হয়েছেন মারজানের মা-বাবা

 

আহসান জোবায়ের

 

কথা ছিল রঙ-তুলির আঁচড়ে আঁকবে সারাবিশ্ব, জিতবে পুরস্কার। কিন্তু এসব গত্বাঁধা ধারণার বাহিরে এসে চারুকলায় পড়ুয়া মেয়েটি দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে সেরা হলো কারাতের কুমিতে! ধারণার হালচাল পাল্টে দিতে অনেক বাঁধা বিপত্তিও পাড়ি দিতে হয়েছে ফেনীর মেয়ে মারজানকে। মা-বাবা কখনো চাইতেন না মেয়ে পড়ালেখার বাইরে এসে মারামারি। পিতা-মাতার স্বপ্ন পূরণে ভর্তি হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। কিন্তু প্রিয়ার স্বপ্ন একদিন সে কারাতে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবেন। সেই স্বপ্ন পূরণে তাকে খুব বেশি দিন অপেক্ষাও করতে হলো না। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তার নামের পাশে লেখা হলো স্বর্ণ জয়ের নাম। নেপালে এসএ গেমসে ত্রয়োদশ আসরে অনূর্ধ্ব ৫৫ কেজি ওজন বিভাগে স্বর্ণ জেতেন মারজান আক্তার প্রিয়া। তবে এই স্বর্ণ জয় তার জন্য খুব একটা সহজ ছিল না।

মারজান কারাতে খেলবে তার মা-বাবা কখনো তা চাইতেন না। মারজান যাতে কারাতে খেলতে না পারে এজন্য মা-বাবার পক্ষ থেকে ছিল অনেক বাঁধা। তবে মা-বাবার সাহায্য ছাড়া যে সে খেলতে পারেননি এমন কথাও বলেন মারজান আক্তার। মা-বাবার বাঁধার জেদেই নাকি তাকে আরো এ খেলায় আকর্ষণ করতো এমন কথাও বলেন তিনি। কিন্তু তার এ জেদ এত অল্প সময়েই যে চূড়ায় পৌঁছে দেবে তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।

কারাতের পোশাকে লাগানো থাকে জাতীয় পতাকা। ওই পতাকার দিকেই তাকিয়েছেন প্রতিটি লড়াইয়ের আগে। যখন খেলতে নেমেছেন তখন তার মনে হয়েছে এই পতাকার জন্য লড়বেন। কিছু একটা করে দেখাবেন। মারজান করে দেখিয়েছেন। তবে মেয়ের এমন আনন্দের দিনে নিশ্চয় সবচেয়ে খুশি হয়েছেন মারজানের মা-বাবা। কাঠমান্ডুর সাতদাবাতোর ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্টস কমপ্লেক্সে মেয়েদের অনূর্ধ্ব ৫৫ কেজি ওজন বিভাগে পাকিস্তানের কৌসরা সানাকে ৪-৩ পয়েন্টে হারিয়ে এই সোনা জেতেন মারজান আক্তার প্রিয়া। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে মারজান পরেন প্রথমবারের মতো সেরার মুকুট।

কারাতে আসার পেছনের গল্পটা কেমন ছিল জানতে চাইলে স্বর্ণজয়ী মারজান আক্তার প্রিয়া বলেন, ‘আমার শুরুটা যখন ভিকারুন্নিসা নুন স্কুলে পড়ি তখন। খালেদ মনসুর নামে একজন লোক একটি স্টাইল শুরু করেন, সেখানে প্র্যাকটিস করতাম। তবে সেটা কারাতে ছিল না। আমার এসএসসির পর কারাতে শুরু করি। যখন থেকে খেলা শুরু করি তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতাম, একদিন বড় কোনো আসরে পৌঁছাবো। দেশকে ভালো একটি জায়গায় রিপ্রেজেন্ট করবো। ইউটিউবে যখন অন্য বন্ধুরা মুভি-নাটক দেখতো, আমি তখন খেলাধুলা রিলেটেড ভিডিওগুলো বেশি দেখতাম।’

স্বর্ণ জয়ের ব্যাপারে মারজান বলেন, ‘জয়ের জন্যই ছুটেছি সারাক্ষণ। স্বপ্ন লালন করেছি। লক্ষ্য ছিল একটাই পরিবারকে দেখিয়ে দিতে চাই, আমিও পারি জয় নিয়ে আসতে। এসএ গেমসে স্বর্ণপদক পেয়ে সে স্বপ্ন পূরণ হলো। এখন আমার জন্য আমার পরিবারকে সারাদেশ চিনতে পারছে। এতে আমার পরিবার খুব খুশি।’

ডিসেম্বরের বিজয়ের মাসে আরও একটি বিজয় দেখেছেন মারজান আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার প্রতিপক্ষ পাকিস্তান হওয়ায় আমার চ্যালেঞ্জটা আরও বেড়ে গিয়েছিল। বিজয়ের মাসে আরেকটি বিজয় আমার ছিনিয়ে আনতে হবেই। আল্লাহর রহমতে এনেছিও। দেশকে আরেকটি বিজয় এনে দিতে পেরে তাই আমি অনেক বেশি উচ্ছ্বসিত।’ মারজান আক্তার প্রিয়া বর্তমানে পড়াশোনা করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগে। স্বপ্ন দেখেছেন কারাতে খেলবেন। যদিও শুরুটা ছিল নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্যই। তার মতে, প্রত্যেক মেয়েরই কারাতে শেখা দরকার। সবাই মনে করেন কারাতে মারামারি করার জন্য। আমি বলি, না। এটি নিজেকে সেফ রাখার জন্য। বাধ্যতামূলক মেয়েদের কারাতে শেখা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে এখনও মেয়েদের সিকিউরিটি নেই, তাই নিজের সিকিউরিটি নেওয়ার বড় মাধ্যম কারাতে।