শিফারুল শেখ
গত ২৯ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গে চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দুঃশাসনে পিষ্ট আফগানদের জীবনে শান্তি ফেরানোর উদ্দেশ্যে চুক্তিটির নামও দেওয়া হয়েছে শান্তিচুক্তি। তবে এই চুক্তিকে অনেকেই বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আত্মসমর্পণের চুক্তি হিসেবে। দীর্ঘ ১৮ বছরের সহিংসতায় যেমন আফগানদের জীবন বিপন্ন হয়েছে তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয়সহ জীবনের অপচয় হয়েছে। সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং জাতিসংঘে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত সুসান রাইস বলেছেন, চুক্তিটি ব্যর্থ হবে। কারণ এর মূল সমস্যা এতে আফগান সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আর তালেবান যা চেয়েছে তাই-ই হয়েছে। এরই মধ্যে তালেবান আফগান সরকারি বাহিনীর ওপর হামলা শুরু করেছে। ফলে শান্তি আফগানিস্তানে সুদূরপরাহত!
জটিলতা যেখানে: মার্কিন প্রশাসন চেয়েছিল তালেবান আগে আফগান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসুক। কিন্তু তালেবান আফগান সরকারকে ‘মার্কিন পুতুল’ বলে উল্লেখ করে। তারা জানায়, আলোচনার প্রথম শর্ত আফগানিস্তান থেকে বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার। এজন্য তারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চায়। মার্কিন প্রশাসন সেই দাবি মেনে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবি, আল-কায়েদাসহ অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠী যেন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশের ওপর হামলায় আফগানিস্তানকে নিরাপদ স্বর্গ হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। তালেবান এতে সম্মত হয়। কিন্তু ক্ষমতায় আসলে আফগানিস্তানে সরকার কী মার্কিনপন্থি, গণতান্ত্রিক নাকি উদারপন্থি হবে সেই বিষয়ে কোনো অঙ্গীকার করতে অস্বীকার করে তালেবান। বরং আফগান সরকারের সঙ্গে আলোচনার আগে তাদের সদস্যদের কারামুক্তির দাবি জানিয়েছে যা চুক্তিতে আছে। তালেবান চেয়েছে আফগানিস্তান একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হবে যেখানে বিদেশি সৈন্য থাকবে না। এক্ষেত্রে কোনো ‘যদি’, ‘কিন্তু’ বা ‘হতে পারে’ শব্দ থাকবে না। আফগানিস্তানের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত রায়ান ক্রোকারের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আত্মসমর্পণ করেছে।
চুক্তি অনুষ্ঠানে আফগান সরকারের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তার কোনো সরাসরি ভূমিকা ছিল না। দোহায় মার্কিনীদের সঙ্গে তালেবানরা যত আলোচনা করেছে, তাতে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি সরকারের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল না। তালেবানের অন্যতম মুখপাত্র সোহাইল শাহীন বলেন, আমরা আফগান সরকারের কাউকে দোহায় আমন্ত্রণ জানাইনি। যুক্তরাষ্ট্র আমন্ত্রণ জানালে তা আমাদের ধর্তব্যের বিষয় নয়। যদিও তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সরকার একটি কমিটি করেছে। শাহীন বলেন, আস্থা তৈরির জন্য আফগান জেলে বন্দি আমাদের ৫ হাজার সদস্য ও আমাদের কাছে আফগান সরকারের ১ হাজার বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে। এরপরই কেবল অভ্যন্তরীণ আফগান সংলাপ শুরু হতে পারে।
সুসান রাইস বলছেন, চুক্তি হতে দীর্ঘদিন সময় লাগবে। কিন্তু বিদেশি সৈন্য তো সেখানে থাকবে না। ফলে তালেবানরা যা ইচ্ছা তাই করার সুযোগ পাবে। ক্ষমতা দখল তো আছেই, মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপরও হামলা হতে পারে। বলতে গেলে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন আফগানিস্তানের নিরাপত্তার সাব-কন্ট্রাক্টটা তালেবানের হাতে ছেড়ে দিয়ে আসছে। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন, তালেবানরা আবার আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করতে পারে।
শান্তি ফিরবে?: চুক্তির পরও আফগানিস্তানে শান্তি ফিরবে কি না তা নিয়ে সংশয় আছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রধান নির্বাহী রবার্ট ম্যালি বলছেন, কোনো চুক্তিই সম্পূর্ণ নয়। এই চুক্তিও তেমনি। আফগান সরকারের সঙ্গে আলোচনার ফলই বলে দেবে চুক্তিটি সফলতা পাবে কি না। আবার তালেবান ক্ষমতার কেন্দ্রে আসলেই কী দেশটির মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবেন? এমন প্রশ্ন অনেকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। কাবুলের ১৩ বছরের সারা হাবিব তার ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তিত এজন্য যে তালেবান বা তাদের মতো কেউ ক্ষমতায় আসলে তার শিক্ষা গ্রহণের অধিকার থাকবে না। যদিও তালেবান বলছে, তারা তাদের আদর্শে আধুনিকায়ন করেছে। ইসলাম নারীদের ব্যবসা, মালিকানা, শিক্ষা গ্রহণ, কাজ, স্বামী নির্বাচন করা এবং নিরাপত্তা ও ভালো থাকার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু দেশটির নারীরা এখনো তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না।
এরই মধ্যে আফগানিস্তানে তালেবান হামলা শুরু হয়েছে। গত ৪ মার্চ আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার আফগানিস্তানের নয়টি প্রদেশে বেশ কয়েকটি হামলার শিকার হয়েছে দেশটির সরকারি বাহিনী। নিরাপত্তাবাহিনীর ১৪ জন সদস্য নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও তালেবানের ওপর পালটা হামলা চালায়। আবার বৃহস্পতিবার এক রাজনৈতিক সমাবেশে হামলায় ২৭ জন নিহত হয় যেখান থেকে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান দেশটির প্রধান নির্বাহী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ।