তালেব রানা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে প্রথমবারের মতো ভারত সফর করে গেছেন। ট্রাম্পের ৩৬ ঘণ্টারও কম সময়ের এই সফর নিয়ে আয়োজনের কমতি ছিল না নরেন্দ্র মোদি সরকারের। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি গুজরাটের আহমেদাবাদে সরদার বল্লভভাই বিমানবন্দরে অবতরণ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বহনকারী বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ান। বিমানবন্দরে ট্রাম্পকে আলিঙ্গন করে স্বাগত জানান নরেন্দ্র মোদি।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় নরেন্দ্র মোদি টেক্সাসের হিউস্টনে ‘হাউডি মোদি’ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানের আদলে ট্রাম্পের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঐ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতি ভালোবাসা এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের কথা জনসমক্ষে জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সব দিক নিয়ে আলোচনা করেন ট্রাম্প এবং মোদি। এরপর যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে ট্রাম্প জানান, দুই দেশের মধ্যে ৩০০ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছে।
ট্রাম্পের এই সফরের লাভ-লোকসান নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা শুরু হয়েছিল। তার সফর শেষে সেটা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। ভারতীয় গণমাধ্যম বলছে, বুশ ও ওবামার মাধ্যমে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের যে সূত্রপাত হয়েছিল, ট্রাম্পের সফরে সেই অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রটি আরো জোরদার হয়েছে।
বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সফরকালে ট্রাম্পকে খুশি করতে যথাসাধ্য সবকিছুই করেছে ভারত। বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ক্রিকেট স্টেডিয়ামে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে শুভেচ্ছা আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন ট্রাম্প। এমনকি বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছেন ট্রাম্পকন্যা ইভাঙ্কা ও তার স্বামী জেরেড কুশনার।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ইন্ডিয়া প্রজেক্টের পরিচালক তানভি মাদনের মতে, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে বিক্ষোভের মুহূর্তে এই সফর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে রাজনৈতিকভাবে চাঙ্গা করবে এবং তার জন্য ভালো কিছু সংবাদ তৈরি করবে। তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির পাশে দেখা যাবে।
তাহলে এ সফরে ট্রাম্পের লাভ কী? বিশেষ করে—ভারতীয় উপমহাদেশে ‘আমেরিকাই প্রথম’ নীতি নিয়ে যখন বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই ট্রাম্পের।
বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এই সফরে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল একটি সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি। গত কয়েক মাস ধরে এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এ ব্যাপারে কিছু চূড়ান্ত হয়নি। তবে এ ব্যাপারে দুই পক্ষ আশাবাদী। এই সফর দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরো জোরালো করবে। ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে তিন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তির কথা জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি মার্কিনিদের বোঝাতে পারবেন যে—এতে করে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান আরো বাড়বে।
তবে এই সফর ট্রাম্পের জন্য অন্য কারণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অভিশংসিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কোনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তার আগে ভারতে এই সফর মার্কিন ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের ইমেজ বাড়াবে। তার প্রচারণা টিম বিষয়টি এমনভাবে দেখাবে যে—প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সারা বিশ্বে সমাদৃত। এছাড়া তিনি ভারতীয়-মার্কিন ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪৫ লাখ ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক আছেন এবং দেশটির রাজনীতিতে ভারতীয়রা একটি ক্রমবর্ধিষ্ণু শক্তি। সাধারণত তারা ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়ে থাকে। ন্যাশনাল এশিয়ান আমেরিকান সার্ভে অনুযায়ী ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প মাত্র ১৬ শতাংশ ভারতীয়র ভোট পেয়েছিলেন। সেই অঙ্কটা যদি ৮০ বা ৯০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে বাণিজ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি মিলে ভারত সফর হয়ে দাঁড়াবে ট্রাম্পের জন্য ‘ট্রাম্প কার্ড’!