বিশ্বচ্যাম্পিয়ন তিন বাংলাদেশির প্রজেক্ট ‘কিউর’

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ‘হার্ভার্ড ন্যাশনাল মডেল ইউনাইটেড নেশনস-২০২০’ সোশ্যাল ভেঞ্চার চ্যালেঞ্জ (এসভিসি) সম্মেলন। এতে অংশগ্রহণ করেন তিন বাংলাদেশি তরুণ। তারা হলেন—মাহামুদুল হাসান তন্ময়, সাদমান সাকিব, রিদওয়ানুল আরেফিন অর্ণব। এই তিন বন্ধু মিলে তৈরি করেন প্রজেক্ট ‘কিউর’। প্রজেক্ট কিউর’র প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তন্ময়। বিজয়ী হিসেবে তারা লাভ করেছেন রেজুলেশন প্রজেক্টের ফেলোশিপ সম্মাননা। সেই সঙ্গে নাম লিখিয়ে নেন বিশ্ব সেরা হিসেবে।

‘কিউর’ বাংলাদেশি তিন বন্ধুর তৈরি করা একটি সফটওয়্যার প্রজেক্ট। ডিজিটাল এই যুগে এসে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় এখনো ডিজিটালাইজেশনের তেমন ছোঁয়া পড়েনি। তাই স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে শুরু হয় প্রজেক্টটি। এই অ্যাপে চিকিত্সক ও রোগীর জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ‘চ্যাটিং অপশন’। রোগী তার সমস্যাগুলো বলতে পারবেন এবং একই সময়ে চিকিত্সক সে অনুযায়ী পরামর্শ দেবেন। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে ডাক্তার চেম্বারে দেখা করতে বলবেন। চ্যাটের সঙ্গে ছবি এবং ভিডিও পাঠানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। নিকটবর্তী ফার্মেসি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যোগাযোগ করা যাবে অ্যাপটির মাধ্যমেই। ঘরে বসেই ওষুধ পেয়ে যাবেন রোগী। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্ট আনতে যেতে হবে না, রিপোর্ট সরাসরি অ্যাপের মাধ্যমে আপলোড হয়ে যাবে। রোগী ও ডাক্তার দুজনই রিপোর্ট দেখতে পাবেন। অনলাইনের মাধ্যমেই পেমেন্ট করা যাবে।

ঢাকাকে কয়েকটা জোনে ভাগ করে এই সুবিধা দেওয়া হবে। এছাড়া রোগীর সমস্যা, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা সবকিছুর তথ্য সংরক্ষিত থাকবে অ্যাপে। ডাক্তার এক নজর দেখলেই রোগীর ‘মেডিকেল হিস্ট্রি’ জেনে নিতে পারবেন। বলা যায়, কিউর’র মাধ্যমে ঘরে বসেই এক অ্যাপে পাওয়া যাবে সকল স্বাস্থ্যসেবা।

এই সফটওয়্যারের চিন্তা কীভাবে এলো জানতে চাইলে মাহামুদুল হাসান তন্ময় বলেন, ‘আমাদের দেশে ভালো ডাক্তার এবং হসপিটাল দুটোই ঢাকায় অবস্থিত। তাই ডাক্তার দেখানোর জন্য অনেককেই বছর অন্তত ৩-৪ বার ঢাকায় আসতে হয়। যা বয়স্ক ব্যক্তির জন্য খুবই ঝামেলার। কেননা তাদের আসা-যাওয়ায় অনেক সময় লেগে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, সামান্য সমস্যার জন্য তাকে ঢাকায় আসতে হয়, হতে পারে যার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। আজকাল শহরের মানুষ খুব ব্যস্ত থাকে। তারা ছোটোখাটো কোনো সমস্যা হলে ডাক্তারের কাছে যায় না। তার কারণ হলো দূরত্ব, ট্রাফিক, লম্বা সিরিয়াল। কিন্তু এর জন্য পরবর্তীকালে তাদেরকে চরম খেসারত দিতে হয়।’ এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২২ দশমিক ৪ শতাংশ মেয়েরা নিয়মিত চিকিত্সকের কাছে যায় না। কারণ তাদের সঙ্গে যাওয়ার মতো কেউ থাকে না। আর ৯ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ ডাক্তারের কাছে যায় না যানজটের কারণে। ভারতীয় গবেষকদের এক গবেষণায় পাওয়া গিয়েছে—৭০ শতাংশ সমস্যা টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।

কিউর সংশ্লিষ্টরা পুরো প্রজেক্টের কাজ করার সময় কাজগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করে নেন। প্রজেক্টের সফটওয়্যার এবং টেকনিক্যাল কাজগুলো করেন মাহামুদুল হাসান তন্ময়। সাদমান সাকিবের কাজ হলো ইউজার এক্সপিরিয়েন্স এবং ইউজার ইন্টারফেস। আর প্রজেক্টের ব্যবসায়িক দিক ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছেন অর্ণব। মূল কাজগুলো ভাগ করে নিলেও প্রজেক্ট সম্পর্কিত যে কোনো সিদ্ধান্ত তিনজন একসঙ্গেই নিয়ে থাকেন।

প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ৬০টি দেশের প্রায় ২ হাজার প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। বিশ্বব্যাপী সামাজিক নানান সমস্যাগুলোর সমাধান দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাজ থেকে প্রজেক্ট জমা দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখান থেকে বাছাই করা প্রজেক্ট বিশেষজ্ঞ বিচারকদের একটি প্যানেলের সামনে তিনদিন উপস্থাপন করতে হয়। এরপর চূড়ান্ত পর্যায়ে তারা সেরা প্রজেক্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আর সেই স্বীকৃতি লাভ করেছে বাংলাদেশের তিন বন্ধুর তৈরি করা প্রজেক্ট ‘কিউর’।