ফারুক হোসেন শিহাব
ঘোর অমানিশায় অপ্রতিরুদ্ধ দীপশিখার মতো দীপ্তমান তারা। শত প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে পথ চলাতেই যেন তাদের আনন্দ। কী মঞ্চে, কী রাজপথে—সর্বত্রই অনির্বাণ-আপোষহীন; সত্য-সুন্দর প্রতিষ্ঠায় অবিচল থেকে অনিশ্চিত বাস্তবতাকে মেনে নিতে তারা বদ্ধপরিকর। এতটা বিসর্জন নাটকের মানুষদের ক্ষেত্রেই সম্ভব। তবে প্রতিক্রিয়াশীল ও মৌলবাদে আচ্ছন্ন একটি জেলা শহরে এতটা প্রগতিশীল সৃজনকর্ম সত্যি দুরূহ এবং দুঃসাহসিক বটে। ঠিক তেমনটিই করে যাচ্ছে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনভুক্ত নাট্যসংগঠন লক্ষ্মীপুর থিয়েটার। ‘জঙ্গি-অবক্ষয়-দুর্নীতি, মানবে না এ সংস্কৃতি’ স্লোগানে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের আয়োজনে প্রায় ৪০০টি নাটক নিয়ে ১২ থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি ৬৪ জেলায় অনুষ্ঠিত হয় ‘জাতীয় নাট্যোত্সব ২০২০’। নিবেদিত নাট্যচর্চার ধারাবাহিকতায় সদ্যসমাপ্ত ‘জাতীয় নাট্যোত্সব ২০২০’-এর অংশ হিসেবে ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় লক্ষ্মীপুর টাউন হল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় লক্ষ্মীপুর থিয়েটারের নাটক ‘দহল’। গুণী নাট্য ও সংস্কৃতিজন অধ্যাপক মাইন উদ্দিন পাঠান রচিত ও নির্দেশিত এ নাটকে গ্রামের সহজ-সরল ছেলে তারেক। শহরের কলেজে পড়তে আসে। অত্যন্ত মেধাবী সে। দরিদ্র বড়ো বোনের বাসায় থেকে পড়াশোনা করে। ধনাঢ্য পরিবারের মেয়ে পুষ্পিতা ও আবিরের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব। একটা সময় পুষ্পিতা তারেকের প্রেমে পড়ে। তাদের সহপাঠি শিব্বির ভদ্রতা দেখিয়ে সবার মন কেড়ে নেয়। মহান মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কলিম উল্যাহ তার নেতা। ধর্মের লেবাসধারী এই নেতা স্বাধীন দেশেও প্রচুর অর্থ-বিত্তের মালিক। মাদক, চোরাচালান এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তার অর্থ-সম্পদের উত্স। তার হাতে জঙ্গি সৃষ্টির কারখানা। সে শিব্বিরকে দিয়ে অনেকের মতো তারেককেও দলে ভিড়ায়। ফলে তারেক আর গ্রামের সেই সহজ-সরল ছেলেটি নেই। পুষ্পিতা ও আবির তাকে এই ধ্বংসের পথ থেকে ফিরাতে পারে না। একসময় নেতার চক্রান্তে তার পরিণতি হয় অস্বাভাবিক মৃত্যু।
এই নাটকের মধ্য দিয়ে নাট্যাকার সমসাময়িক দেশীয় রাজনৈতিক সমীকরণের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। যেখানে ধর্মের লেবাসধারী-সুবিধাভোগী ধর্মের নামে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। দ্বীনের দোহাই দিয়ে কীভাবে যুবসমাজকে বিপথগামী করছে—এই নাটকে সেটিই তুলে ধরা হয়েছে। সময়ের বিচারে এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক গল্পের নাটক। একইভাবে পাণ্ডুলিপি ও নাট্যনির্মাণে যথেষ্ট সাহিত্য ও শিল্পমানের দাবি রাখে। পুরো নাটকে দেশাত্মবোধের গভীরতর উপলব্ধি এবং হূদয়-খচিত সংলাপের কারুকাজ হলপূর্ণ দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। নাটকে রোমান্টিকতা, ঘাত-অভিঘাত, সংকট, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রভাব, দেশপ্রেম-উপভোগীদের চেতনে রেখাপাত ঘটিয়েছে। যে কারণে পিনপতন নীরবতায় পুরো নাটকটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো উপভোগ করেছেন লক্ষ্মীপুুরের দর্শক।
শুরুটা রোমান্টিকতাপূর্ণ হলেও ধীরে ধীরে দেশদ্রোহীগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দ্বন্দ্ব উপনীত হয় নাটকের গল্পে। যা পশ্চিমা শক্তির ফরমায়েশী তাবেদারীতে আচ্ছন্ন। তাদের একটাই উদ্দেশ্য— এদেশের স্বাধীনতাকে ভুলণ্ঠিত করে ইসলামের নামে মৌলবাদকে প্রতিষ্ঠিত করা। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তে চরম উত্তেজনা ও শৈল্পীক দৃশ্যকাব্যের উদ্রেক ঘটেছে। নাট্যকার এখানে প্রতীকী কিছু শব্দ ও সংলাপ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে চমত্কার কিছু নাট্যক্রিয়া সৃষ্টি করেছেন। অস্ত্রশস্ত্রকে ‘কিতাব-কলম’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমনি অনেক রূপকতার পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ও তাদের অর্থ-সম্পদের উত্স ও বিস্তার নিয়ে গভীরতর উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। বিষয়টি স্বাধীনতা বিরোধীদের মুখোশ উন্মোচনের পাশাপাশি এই অপশক্তির বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মকে সোচ্চার হতে আগ্রহী করে তুলবে। সমসাময়িকতা ও বিষয়বস্তুর দিক থেকেও নাটকের গল্প যথেষ্ট আবেদন রাখে। এককথায়, এটি সময়ের সাক্ষ্য বহন করে।
এমন দূরদর্শী এবং চেতনালব্দ নাট্যপ্রয়াসের জন্য নাট্যকার অবশ্যই সাধুবাদ পাবেন। নাট্যকারই এই নাটকের নির্দেশক হওয়ায় মঞ্চে তার মনোকল্পের যথার্থ দৃশ্যকাব্য উপস্থাপনের প্রাণবন্ত রূপায়ন সম্ভব হয়েছে। একইভাবে প্রতিটি অভিনেতা-অভিনেত্রীর চরিত্র নির্মাণ অনেক বেশি সুদৃঢ় মনে হয়েছে। বিশেষ করে শিব্বির চরিত্রে আশরাফুল মোবারক মুন্না মনোগ্রাহী অভিনয় কারুতে উপভোগীদের চমক দেখিয়েছেন। পাশাপাশি তারেক চরিত্রে শাওন হোসেন এবং পুষ্পিতার ভূমিকায় কাঁকন অভিনয়ে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন। অবির চরিত্রে মাসুম জুলকারনাইনও চেষ্টার ত্রুটি করেননি। তার চরিত্রের মধ্য দিয়ে নাট্যকার নতুন প্রজন্মের আদর্শিক রূপ এবং নাটকের দ্বন্দ্বকে উস্কে দিয়েছেন। আবার সেই দ্বন্দ্বকে শিব্বির ও তার নেতার কুটকৌশলে উত্তপ্ত করে তুলেছেন। যেখানে চমত্কার কিছু নাট্যমুহূর্ত তৈরি হয়েছে। নাটকে তারেকের বোন রৌশন চরিত্রে রেবেকা সুলতানা স্মৃতির মসৃণ উচ্চারণ, প্রাণময় অভিব্যক্তি দর্শকদের স্মৃতিপটে দাগ কেটেছে। কিছু অসঙ্গতি ছাড়া কলিম উল্যাহ চরিত্রে রিয়াদ হোসেনও অভিনয়ে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। পাশাপাশি আজগর ও শরীফ চরিত্রের মধ্য দিয়ে নাট্যকার নবতর এক চরিত্রায়ন ঘটিয়েছেন যা হাস্যরস্যে উপভোগীদের মাঝে বাড়তি বিনোদন জুগিয়েছে। একজন অভিনয়শিল্পীর যে নিজের সেরাটা দেখানোর জন্য ক্ষুদ্র একটি মুহূর্তই যথেষ্ট; এই দুই চরিত্রে হাসান মাহমুদ ও ফাহিম হোসেনকে সেভাবেই উপস্থাপন করেছেন নাটকের নির্দেশক। তবে তারেক, আবির ও পুষ্পিতা চরিত্রের আঙ্গিক ও বাচিকতায় কিছুটা অসংলগ্নতা ছিল লক্ষণীয়। বিশেষ করে টেনে টেনে যাত্রাটিক সংলাপ প্রক্ষেপন, এলোমেলো দৃষ্টিপাত এবং নাটকে ভাষাব্যবহারে কোথাও কোথাও প্রমিত ও আঞ্চলিকতার মিশেলে ত্রুটিপূর্ণ মনে হয়েছে। কাঁকন এবং রিয়াদকে প্রায়ই মনে হয়েছে যেন—মুখস্থ সংলাপ দ্রুত শেষ করলেই বাঁচি।
দহলের সহ-নির্দেশনায় ছিলেন মাহতাব উদ্দিন আরজু। নাটকজুড়ে তার অকৃত্রিম পরিশ্রমেরও ছাপ রয়েছে। গল্পের প্রাসঙ্গিকতায় শ্রী শৈবাল কান্তি সাহার সেট ছিল যথার্থ। নির্দেশকের পরিকল্পনায় নাটকের আলোকপ্রক্ষেপনে ছিলেন ডালিম কুমার দাস টিটু এবং আবহ সংগীতে ছিলেন মাহতাব উদ্দিন আরজু ও শান্তন দাস।