ইচ্ছামৃত্যু

[‘যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ

মরিবার হলো তার সাধ’]

 

কাশ্মিরের ডাল লেকের ধার ঘেঁষে কাচে ঘেরা সুন্দর একটি রেস্তোরাঁ। রেস্তোরাঁয় বসে ডাল লেকের দৃশ্য দেখা যায়। ভ্রমণের মৌসুম এখনো শুরু হয়নি। ডাল লেকের বরফ গলা সবে শুরু হয়েছে। লেকের এখানে ওখানে ভাসমান বরফ দেখা যায়। হাউজ বোটের চলাচলও তেমন শুরু হয়নি। মাঝে মাঝে দু-একটি চোখে পড়ে। ট্যুরিস্টদের আনাগোনা খুবই কম। রেস্তোরাঁ এমনিতে ফাঁকা। আমরা দেখছি দুজন প্রবীণ মানুষ লেক সাইড রেস্তোরাঁর এক কোণে দু কাপ ধূমায়িত কফি নিয়ে ডাল লেকের দিকে তাকিয়ে আছে। এদের একজন পুরুষ, চন্দন, বয়স পঁচাত্তর। অন্যজন মহিলা, বাঁধন, বয়স সত্তুর। তারা বাংলায় কথা বলছেন।

পাঁচ দিন হয় তারা কাশ্মির বেড়াতে এসেছে। এ কয়দিন তারা গুলবার্গ পহেলাগাঁও, সোনামার্গ, মোগল গার্ডেনস দেখা শেষ করেছে। বাকি আছে ডাল লেকে হাউজ বোটে বসবাস।

বাঁধন ডাল লেক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মৃদু হেসে বলল, অবশেষে কাশ্মির দেখা হলো।

চন্দনকে কিছুটা লজ্জিত মনে হয়, মনে আছে বিয়ের পর কাশ্মিরে হানিমুন করার জন্য কী কঠিন বায়না করেছিলে? কাশ্মির তো দূর অস্ত, আমি তোমাকে কক্সবাজারেও নিয়ে যেতে পারিনি।

বাঁধন মৃদু হেসে লজ্জিত গলায় বলল, আমি খুব ছেলেমানুষ ছিলাম। তোমার ওপর যখন তখন রাগ হতো। আমি যা বলতাম, তুমি সবটাতে না বলতে। তোমার বন্ধু, বন্ধুপত্নী দলবেঁধে আগ্রা জয়পুর গেল। আমাদের যাওয়া হলো না।

কফিতে চুমুক দিয়ে চন্দন বলল, তুমি হাঙ্গার স্ট্রাইক করলে। আমার অক্ষমতা আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে।

বাঁধন তার শীর্ণ শীতল হাত চন্দনের হাতে রেখে বলল, তুমি খুব ভালো মানুষ। কখনো আমাকে নিয়ে রাগারাগি করনি, হৈ চৈ করনি। কী অভিমানী যে ছিলে! একবার চার দিন আমার সঙ্গে কথা বলনি।

চন্দন হেসে ফেলল, একবার বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলাম। কাউকে কিছু না জানিয়ে। তোমার মনে আছে?

বাঁধন হাসতে হাসতে বিষম খেল। কফির কাপ নামিয়ে রেখে বলল, তুমি সকালের চায়ে প্রথম চুমুক দিয়েছো, আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলে। তুমি ভাবতেও পারনি আমি কী করে খবর পেলাম, কী করে এত সাত সকালে বার্ডে পৌঁছে গেলাম। মুহূর্তে তোমার রাগ-অভিমান উধাও। বরং আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলে, যদি আমার কোনো দুর্ঘটনা ঘটত। তুমি আবার গ্রেপ্তার হলে।

বড়ো ভাবির চালাকি। সেই তোমাকে ফোনে সব বলেছে।

সেদিন ছিল আমাদের বিয়েবার্ষিকী। মনে আছে?

আমাদের চোর-পুলিশ খেলা ভাবি খুব মজা পেয়েছে। খুব বড়ো করে ভাবির ওখানে আমাদের বিয়েবার্ষিকীর অনুষ্ঠান করেছিল।

আচ্ছা, আমাদের বিয়ের দিনটির কথা তোমার মনে আছে?

মৃদু লাজুক হাসল বাঁধন। এই সত্তুরে এসেও তাঁর শীর্ণ ফর্সা গালে লালের আভা লাগে। চন্দনের চোখে তাকাতে লজ্জা হয়। নতমুখে বলে, মনে নেই আবার, তুমি যা অসভ্য ছিলে!

চন্দন উত্সাহিত হয়, কবিতার কথা তোমার মনে আছে? তোমাকে নিয়ে আমার প্রথম লেখা। বিয়ের রাতে তোমাকে শুনিয়েছিলাম।

বাঁধন অপরাধীর ভান করে দু পাশে মাথা নেড়ে জানায়, মনে নেই। এরপর অনুচ্চস্বরে আবৃত্তি করে,

আমিই প্রথম আমিই শেষ

চুম্বনের এই অধিকার

তুমিই জীবন তুমিই মরণ

প্রেমের এই অঙ্গীকার।

বাঁধনের কণ্ঠ ভেজা। চোখে জল।

চন্দন বলল, আগামীকাল আমাদের বিয়েবার্ষিকী। পঞ্চাশতম। আমাদের জীবনের শেষ বিয়েবার্ষিকী।

বাঁধন কোনো কথা বলে না। ডাল লেকে আঁধার নামছে। একটা দুইটা করে হাউজ বোটে আলো জ্বলছে। চন্দন অকারণে খালি কাপ মুখের কাছে তুলে ধরে। অপ্রস্তুত হয়ে আবার নামিয়ে রাখে।

চন্দন আবারও বলল, জীবনের কাছে আমাদের আর কি কিছু চাইবার আছে, বলো? তোমার ছেলে হার্ভার্ডের অধ্যাপক, বউমার মতো এমন হূদয়বতী মেয়ে এ যুগে কয়টি আছে? আর আমাদের নাতি বিদ্যায় মেধায় তোমার ছেলেকেও একদিন ছাড়িয়ে যাবে। ওদের জন্য আমাদের আর কিছু করার নেই। বরং আমাদের এই বয়সের ভার, আমাদের জন্য দুশ্চিন্তা ওদের চলার পথে আমরা বোঝা হয়ে আছি।

বাঁধন মুখ ফেরাল। কিছুটা রাগতঃস্বরে বলল, মোটেও না। অর্ক এমন ছেলে নয়। আমার ছেলে বউমা নাতি প্রতিদিন আমাদের ফোন করে, খোঁজ-খবর নেয়।

সে আমি জানি। তুমি-আমি অসুস্থ হলে সে অ্যায়ার অ্যাম্বুলেন্স পাঠাবে। যত ডলার দরকার হবে, সব মেটাবে। কিন্তু তোমার যদি ইচ্ছে হয়, ছেলে তোমার অসুস্থ কপালে হাত রেখে ব্যাকুল নয়নে তোমার মুখপানে তাকিয়ে থাক, তা কি তুমি পাবে? মৃত্যুর আগ মুহূর্তে ছেলেকে তুমি দেখতে চাইলে, তা কি সম্ভব?

বাঁধন কিছু না বলে মুখ ফিরিয়ে নেয়। হয়তো চোখের জল লুকাতে। একটু পানি দাও, বলতে গিয়ে কথা আটকে আসে। কাশতে শুরু করে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

চন্দন ব্যাকুল হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, বেয়ারা, বেয়ারা, ওয়েটার, পানি লাও, কুইক...। এরপর পাগলের মতো ইনহেলার খুঁজতে লাগল। ওয়েটার পানি নিয়ে আসার আগেই ইনহেলার পাওয়া গেল।

বাঁধন ইনহেলার নিয়ে স্বস্তি বোধ করে। শ্বাসকষ্ট কমে আসে। মৃদু স্বরে বলে, তুমি এত চ্যাঁচামেচি করলে, লোকগুলি সব তাকিয়ে আছে। আজই তো আমাদের শেষ দিন। আমি এখন মরে গেলেই বা কী ক্ষতি হতো?

চন্দন বলল, শোন বাঁধন, আমরা অনেক ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ডাল লেককে বেছে নিয়েছি। আমি তোমার ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চাই না। তোমার যদি এমন মনে হয়, আমাদের সিদ্ধান্ত ভুল, তাহলে চলো আমরা ঢাকায় ফিরে যাই।

সত্তুর বছরের বাঁধন তাঁর একটি শীর্ণ শীতল হাত হূদয়ের উষ্ণতায় পঁচাত্তর বছরের চন্দনের হাত আঁকড়ে ধরে। মুখে ফুটে ওঠে লাজুক মধুর হাসি। যেন এই প্রথম দেখা হলো। চন্দনের মুখেও পরিতৃপ্ত জীবনযাপনের মৃদু মধুর হাসি। অনুচ্চ স্বরে ধীরলয়ে দুজনে আবৃত্তি করে :

তোমারই সঙ্গে ভালোবেসে পঞ্চাশ বছর বেঁধেছি ঘর

মৃত্যুর পরে বরফের ঘরে থাকবো দুজন শত বছর।

এমন সময় হোটেলের ওয়েটার এসে জানাল, স্যার হাউজ বোটকা আদমি আয়া।

ছোট হাউজ বোট দুজনের জন্য আরামদায়ক, সুপ্রশস্ত। লোকটির সঙ্গে এক সপ্তাহের চুক্তি। মৌসুম শুরু হওয়ার আগে এমন খদ্দের পেয়ে বোটের মালিক দারুণ খুশি। চন্দন কিছু শর্ত দিয়েছে। লেকের মাঝ বরাবর একটি জায়গায় হাউজ বোট নোঙ্গর করা থাকবে। বোটে কোনো মাঝি থাকবে না। বোট মালিক একদিন অন্তর বোটে আসতে পারবে। পানি, শুকনো খাবার বোটে রাখা আছে। ডাল লেকে যে শিকারা আসে, সেখান থেকে নিত্য দিনের বাজার করা যায়। বোট মালিককে অগ্রিম ভাড়া দিয়ে চন্দন কৌশলে জেনে নিল এ রকম পুরনো একটি হাউজ বোটের দাম কেমন হতে পারে।

হোটেলের রুমে ফিরে চন্দন হাউজ বোটের মালিককে একটি চিঠি লিখল। সঙ্গে হাউজ বোটের ক্ষতিপূরণের একটি চেক দিল। প্যাকেট খুলে ড্রিল ম্যাশিনটি দেখল। তখন রাত বারোটার ঘণ্টা বাজল।

দরজায় নক হলো। ওয়েটারের হাতে একটি কেক। টেবিলে কেকটি সাজিয়ে রেখে যুবক ওয়েটার উইশ করে, হ্যাপি অ্যানিভারসারি স্যার।

দুজনে একত্রে কেক কাটে। চন্দন এক টুকরো কেক বাঁধনের মুখে তুলে ধরে, বাঁধন চন্দনের মুখে। তারপর দুজন লেপের নিচে ঢুকে পড়ে। বাঁধন তার শীতল হাত বাড়িয়ে চন্দনের হাত ধরে, শিশুর সারল্য জিজ্ঞেস করে, জীবন এত সুন্দর কেন?

চন্দন বলল, মৃত্যু সত্য তাই জীবন সুন্দর।

এরপর দুজন দুজনকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।