ওম পোহাবার রাতে মৃতপুত্রের গল্প—এই গল্পের পরতে পরতে শোক আর কান্না—স্মৃতি আর আবেগ—ভালোবাসা আর ঘৃণা—মায়া আর মোহ—আবদার আর আহাজারি!
বছর দুই আগে বাড়ির উঠোনের সামনের মুকুল ধরা আম গাছটায় ফাঁসি নিলো মানিক। আহারে মানিক! মাইট্যাল সিরাজের কলিজার টুকরা—আবছার নাড়ি ছেঁড়া ধন! কী এমন কষ্ট ছিল যে মাত্র ষোল বছর বয়সে আমগাছের ডালে নাইলন দড়িতে ঝুলতে হলো? সেই আম গাছটা যে গাছের বীজ পেয়েছিল সিরাজ এক ফকির বাবার কাছ থেকে। আসমান থেকে এনে দিয়েছিল সিরাজের হাতে। আহ, কি মধুমাখা আম! কত শখ করে সিরাজ আঁটিখানা বাড়ির সামনে লাগিয়েছিল। চৌদ্দ বছরের গাছে যেই না মুকুল ধরল আর অমনি ষোল বছরের মানিক নিল ফাঁস। যেই দেশের যেমন সংস্কার—ফাঁস নেওয়া গাছ রাখে যাবে না—কেটে ফেলতে হবে। গাছ কাটা হয়ে গেছে এবার শেকড়ের স্মৃতি বিচলিত করে আবছাকে। অন্তরের ভিতরটা গুমরে গুমরে ওঠে তার। এই গাছের শেকড়শুদ্ধ তুলে ফেলতে হবে তবেই শান্তি। পুত্রশোকের দুই বছরের মাথায় সেই শিকড়ের ওমে ওমে আবছা আর মাইট্যাল সিরাজের মনে পড়ে মানিকের কথা। কত জেদ আছিল পুত্রের। ঘুড়ি ওড়াতে হবে চারখানা—একবার না করাতে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় সাতে। বর্ষাকালে নীল ছাতা তার চাই। বাপের সঙ্গে পুকুর কাটতে যাবে সে। মাইট্যালের পুতের মাইট্যাল হওয়ার সখ। গুমড়ে ওঠে সিরাজ। মাছ ধরার সুতা কেনার টাকা নিয়ে কিনে আনছে নাইলনের দড়ি। সেই দড়ি দিয়ে আবার নিজের গলাতে নিছে ফাঁস। কু-পুত্র! কু-পুত্রই তো—যে পুত্র বাপ মায়ের কথা না ভেবে শুধু নিজের জেদের বশে গলায় ফাঁস নেয় সেই পুত্র সু-পুত্রও হয় না কোনোদিন! নিজ ইচ্ছায় যদি মৃত্যুবরণ করে তবে তার তো জানাজা হয় না। মাটি চাপা দিতে হবে তাকে। এও কি মাইট্যাল সিরাজের কম কষ্টের! ইমাম সাহেব তো স্পষ্টই বলে দিলেন জানাজা পাওয়ার বিধান ধর্মে নাই। ফাঁসি নিয়ে পাপ করেছে সে। হায়রে মানিক! ক্লাস ফোরে কোরআন খতম করে কোন কাজে লাগল? শিশুকালের কোরআন খতমের চেয়েও কাল হয়ে দাঁড়াল এই গাছ সেই গাছ থেকে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা পেরে খাওয়া; যাত্রাগান শোনা; বাঁশি বাজানো! এত এত স্মৃতি সিরাজ ও আবছার মনে। কী নিয়ে বাঁচবে সিরাজ? কী করে থাকবে? থাকসে সে কথা। নাট্যের শুরুতে পুকুর কাটার যে কোরিওগ্রাফির ঝলক তা সত্যিই অসাধারণ। তার সঙ্গে আবার পুকুরে পানি তোলার গান। এ যেন এই নাটকের বন্দনা। মাইট্যাল সিরাজের কোদালের কোপে ছমছমাইয়া পানি ওঠে পুকুরে। ছমছমাইয়া পানি তোলার গতির সঙ্গে আসাদুজ্জামান আমান ও সাজ্জাদ আহমেদ রাজিবের অভিনয়ের গতি বেশ গতিশীল ও ছন্দময়তা তৈরি করছিল। তবে শুরুর দিকে সাজ্জাদ রাজিবের অভিনয় ও নাট্যের বর্ণনা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। মাইট্যাল সিরাজ, মানে আসাদুজ্জামান আমান যখন মসজিদে মসজিদে পুত্রের জন্য ঘোরার কথা বলে আবছাকে সেই সময়ে অভিনয় তো একেবারেই অসাধারণ। হূদয় ছুঁয়ে যাওয়া। সামিউন জাহান দোলা পুত্রের মৃত্যুশোক কিছু অনুধাবণ করতে পারলেও এশা ইউসুফ বোধহয় কিছুই অনুভব করতে পারেননি। সামিউন জাহান দোলার অভিনয় ছন্দের যে দোলা দুলিয়ে দিচ্ছিল সেই দোলায় ছেদ পড়ছিল এশা ইউসুফের অভিনয়ে শুধু দুই এক জায়গায় বর্ণনা বাদ দিলে ছন্দের পতনটা বেশ ভালোই বুঝতে পারা যায়। নাট্যকার সেলিম আল দীনের পুত্রশোক শোকাহত করতে পারল না দর্শককে। তার সঙ্গে অবশ্য হুজুর চরিত্রে সউদের আনকোড়া অভিনয়। হুজুর যখন জানাজা করা যাবে না বলে কট্টর হয়ে যায় সেখানে তো তার আবেগে কান্না বিজড়িত হওয়ার কিছু নেই। নাট্য প্রয়োগ ভাবনায় ভালো লাগা তৈরি হলো শুরুর উপস্থাপনায়। শুরু থেকেই কিছু বিমূর্ততা তৈরি হতে থাকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মূল হলে গত ২১ ও ২২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়। মানিক ফিরে ফিরে আসে—মৃত মানিক—কাফনের সেই সাদা কাপড়ে মুখ মুড়িয়ে। ভাবনাটা দারুণ লাগে কিন্তু দ্বিতীয় প্রদর্শনীতে মানিকের কথা যখন বয়ন করা হয়, তখন প্রোজেক্টরে মানিকের অবয়ব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টাকে ব্যর্থ প্রয়াস বলেই মনে হয়েছে। দারুণ নান্দনিকতার নিদর্শন পাওয়া যায় পুত্রের নির্দেশনা, পোশাক পরিকল্পনা ও সুরে। দারুণ এক অভিব্যক্তির প্রকাশ পায় শিমুল ইউসুফের কাজে। ঢালী আল মামুনের শিকড় দিয়ে মঞ্চ সাজানোর যে শিল্প ভাবনা সেটিও চমত্কার। ঢাকা থিয়েটারের নতুন প্রযোজনাটিকে চমত্কার আলো দিয়ে শ্রীবৃদ্ধি করার জন্য অভিনন্দন নাসিরুল হক খোকন। অভিনয় সাবলীলতায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক পরবর্তী প্রদর্শনীগুলো।