অধ্যাপক মবিন খান
পৃথিবীর জন্য দুই হাজার বিশ সালের সূচনা হয়েছে একটি নতুন আতঙ্ক দিয়ে। আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। গত বছর ডিসেম্বর মাসে চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস এখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। বিশ্বা স্বাস্থ্য সংস্থা সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করেছে এবং নুতন ভাইরাসজনিত রোগ নির্ণয়, চিকিত্সা ও প্রতিরোধে গাইডলাইন তৈরি করেছে। এই প্রবন্ধে আমরা নতুন করোনা ভাইরাসের উত্পত্তি, বিস্তৃতি এবং রোগের লক্ষণ, চিকিত্সা ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জানতে পারব।
উত্পত্তি ও বিস্তৃতি
গণচীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে একটি বিখ্যাত সামুদ্রিক খাবারের বাজার হলো হুয়ানান সাউথ চায়না সি-ফুড বাজার। ২০১৯-এর ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে উহান শহরের মিউনিসিপ্যাল হেল্ত কমিটি প্রকাশ করে যে, তাদের হাসপাতালে নতুন এক ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাচ্ছে যারা সর্দি, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসছে এবং যাদের অধিকাংশই উক্ত মার্কেটে ভ্রমণ করেছিল। উক্ত নতুন ভাইরাসের জেনেটিক সিকোয়েন্স পরীক্ষা করে দেখা যায়, এটি নতুন এক ধরনের করোনা ভাইরাস স্ট্রেইন। ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে।
চীনর বাইরে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়াতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। চীনের বাইরে শতাধিক দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। চীনে করোনা ভাইরাসজনিত রোগে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৩ হাজারের অধিক এবং চীনের বাইরে অনেকে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী প্রথম ধরা পড়ে ৮ মার্চ। বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠািন আইইডিসিআরের তথ্য মতে তিন জন রোগীতে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে, যারা সম্প্রতি ইতালি থেকে ফিরছেন।
করোনা ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য
করোনা ভাইরাস মানুষ ছাড়াও অন্য প্রাণী যেমন গন্ধগোকুল, বাদুড় ও উটে পাওয়া যেতে পারে। এর মধ্যে বাদুড় হলো নানান রকম করোনা ভাইরাসের বাসা। ধারণা করো হচ্ছে, নতুন করোনা ভাইরাস বাদুড় থেকে মানুষে ছড়িয়েছে। মানুষের রোগের জন্য এতদিন দায়ী ছিল মূলত ছয়টি করোনা ভাইরাস স্ট্রেইন। এগুলো হলো-HCoV 229E, HCoV OC43, HCoV NL63, HCoV HKU1, SARS-CoV এবং MERS-CoV। এর মধ্যে প্রথম চার ধরনের করোনা ভাইরাস সারা বছর জুড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সংক্রান্ত ঠান্ডা কাশি রোগ করে থাকে। সার্স-করোনা ভাইরাস ২০০২ সালের চীনের গুয়াংডং প্রদেশে বাদুড় থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং মার্স-করোনা ভাইরাস ২০১২ সালে মধ্যপ্রাচ্যে উটের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিজ্ঞানীরা নতুন করোনা ভাইরাসে গবেষণা করে দেখেছেন যে, এটির সঙ্গে হিউম্যান সার্স করোনা ভাইরাসের প্রায় আশি শতাংশ মিল আছে এবং বাদুড়ের সার্স-করোনা ভাইরাসের সাথে প্রায় ৯৫ শতাংশ মিল আছে। এজন্য তারা নতুন করোনা ভাইরাসটির নাম দিয়েছেন সার্স করোনা ভাইরাস-২। অন্যদিকে নতুন করোনা ভাইরাসের জন্য যে রোগ হয় তার নাম হলো কোভিড-১৯।
কাদের করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি বেশি
পর্যটক যারা করোনা ভাইরাস আক্রান্ত স্থানে সম্প্রতি ভ্রমণকরেছেন, বয়স্ক ব্যক্তি যাদের অন্য রোগের কারণে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে, শিশু এবং ধূমপায়ী ব্যক্তিদের করোনা ভাইরাসে ঝুঁকি বেশি।
সার্স করোনা ভাইরাস-২
যেভাবে ছড়ায়
নতুন করোনা ভাইরাস ছড়ায় এয়ার ড্রোপের মাধ্যমে। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে হাঁচি ও কাশির ফলে, আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে, ভাইরাস আছে এমন কোনো কিছু স্পর্শ করে হাত না ধুয়ে মুখে, নাকে বা চোখে হাত লাগালে এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি বা কাশি দিলে তার শ্বাস থেকে নিঃসৃত ড্রপলেট কোনো বস্তুর ওপর বা তলে পড়ে এবং উক্ত তরল স্পর্শ করে অন্য ব্যক্তি তার নাক, মুখ বা চোখে হাত দিলেই ভাইরাসটি তার শরীরের প্রবেশ করে। এ কারণে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বারবার হাত ধোয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
কোভিড-১৯ রোগের লক্ষণ হলো
কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সাধারণ লক্ষণ হলো—জ্বর, দুর্বলতা ও শুকনা কাশি। এছাড়া প্রাথমিকভাবে দেখা দিতে পারে সর্দি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, শরীর ব্যথা, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্ট। যাদের তীব্রভাবে আক্রান্ত করে তাদের মারাত্মক শ্বাসকষ্ট হতে পারে। তীব্র শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীর নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে কিছু আক্রান্ত মানুষের কোনো ধরনের লক্ষণই প্রকাশ পায় না। সাধারণত ৮০ শতাংশ মানুষের কোনো বিশেষ চিকিত্সা ছাড়াই সাধারণ সর্দি-কাশির চিকিত্সাতেই রোগ ভালো হয়ে যায়। ১৪ শতাংশ রোগীর নিউমোনিয়া হতে পারে। ৫ শতাংশ রোগীর ক্রিটিক্যাল কেয়ার লাগতে পারে। প্রতি ছয় জনে এক জন আক্রান্ত ব্যক্তি তীব্রভাবে আক্রান্ত হয়। যেসব রোগী বৃদ্ধ এবং উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হার্টের সমস্যায় ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কা অধিক।
কোভিড-১৯ ও লিভার
করোনা ভাইরাস যেহেতু রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে সেহেতু এটি লিভারকেও আক্রান্ত করতে পারে। তবে সাধারণত যাদের তীব্র মাত্রায় রোগ হয় তাদের ক্ষেত্রে এটি লিভার ও অন্যান্য অঙ্গকেও আক্রান্ত করে। লিভার আক্রান্ত হলে সর্দি-কাশির পাশাপাশি জন্ডিস দেখা দিতে পারে। পরীক্ষা করলে লিভার এনজাইম বেশি পাওয়া যেতে পারে। এখন পর্যন্ত অল্প কিছু রোগীর ক্ষেত্রে লিভারের এনজাই বেশি পাওয়া গিয়াছে।
কোভিড-১৯ রোগের চিকিত্সা
সাধারণত ভাইরাস-বাহিত যে কোনো রোগে মানবশরীর কিছু দিনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ইমিউনিটি তৈরি করে। ফলে রোগটি ধীরে ধীরে এমনিতেই সেড়ে যায়। তারপরও বিজ্ঞানীরা খুব দ্রুত নভেল করোনা ভাইরাসের ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ততদিন পর্যন্ত কোভিড-১৯ রোগের চিকিত্সা মূলত রোগের লক্ষণভিত্তিক। জ্বর হলে, জ্বরের ওষুধ সেবন, ঠান্ডা-কাশির জন্য চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া প্রচুর পরিমাণে পানি পান ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল খাওয়া যেতে পারে।
প্রতিরোধই মূলমন্ত্র
নতুন করোনা ভাইরাস রোগ থেকে মুক্তির মূল মন্ত্র হলো রোগ নিয়ন্ত্রিত রাখা ও ছড়াতে না দেয়া। এজন্য চীনের সরকার জানুয়ারির মাঝামাঝি পুরো উহান শহরকে কোয়ারেন্টিন করে ফলে। মানুষের যাতায়াত সীমাবদ্ধ করে ফেলা, শহর থেকে বাইরে যাওয়া ও শহরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা, ঘরে থাকতে উত্সাহিত করা প্রভৃতি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ইতালিতে একটি গ্রামে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে উক্ত গ্রামকেও পুরোপুরি কোয়ারেন্টাইন করে ফেলা হয়। ভাইরাস খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তখন যাতায়াত নিয়ন্ত্রিত করে রোগের বিস্তৃতি থামিয়ে রাখা কষ্টকর। এজন্য সবচেয়ে বেশি ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র সব পর্যায়ে সতর্কতা ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের নির্দেশনা অনুযায়ী করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাসে যা করণীয় তা হলো—
১. ঘন ঘন হাত ধোয়া
২. সাবান পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার করুন অথবা অ্যালকোহলে হাত রগড়ে নিন।
৩. হাত না ধুয়ে মুখ, চোখ ও নাক স্পর্শ করবেন না।
৪. হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় টিসু পেপার দিয়ে অথবা কনুইয়ের ভাঁজ দিয়ে নাক এবং মুখ ঢেকে রাখুন।
৫. ঠান্ডা এবং ফ্লু জাতীয় উপসর্গেও যে কারো সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে চলুন।
৬. আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে এক মিটার বা ৩ ফুট দূরে থাকার চেষ্টা করুন।
৭. গোশত এবং ডিম এমনভাবে রান্না করুন যেমন তা ভালোভাবে সিদ্ধ হয়।
৮. বন্য ও গবাদি পশু পাখিদের সঙ্গে অরক্ষিত অবস্থায় সংস্পর্শ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন।
ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। বিশেষ করে জীবাণু থাকতে পারে এমন কিছু স্পর্শ করার পর, হাঁচি-কাশির দেয়ার পর, খাবার খাওয়া ও খাবার প্রস্তুত করার আগে ও পরে, টয়লেট করার পর, যখনই হাত ময়লা হয় এবং পশুপাখি কিংবা পশুপাখির মল স্পর্শ করার পর।
করোনা ভাইরাস নিয়ে ভীতি না ছড়িয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সর্বপ্রকার ব্যবস্থা সামর্থ্য সাপেক্ষে গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করতে হবে যেন তিনি এই বিপদ থেকে বাংলাদেশের অগণিত মানুষকে রক্ষা করেন।
লেখক :পরিচালক
দ্য লিভার সেন্টার, ঢাকা, বাংলাদেশ
মির্জা গোলাম হাফিজ রোড
বাড়ি-৬৪, রোড-৮/এ
ধানমন্ডি, ঢাকা