বিশেষায়িত আমলাতন্ত্র ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়
মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম একজন সফল উদ্যোক্তা। ব্যাবসায়িক জীবন শুরু ১৯৯১ সালে। জাপান হতে আমদানি ও বিপণন নির্ভর একটি ছোট্ট ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। কঠোর পরিশ্রম ও সততা তাকে নিয়ে এসেছে সাফল্যের চূড়ায়। বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় এইচএনএস গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ রিকন্ডিশনড যানবাহন আমদানিকারক ও ডিলার্স সমিতির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। সম্প্রতি আলাপচারিতায় তিনি সামগ্রিক উন্নয়ন বিষয়ে ইত্তেফাকের সঙ্গে কথা বলেন। অটোমোবাইল খাতের বর্তমান সংকট ও সম্ভাবনার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যাংক ঋণের সরল সুদ চালু করাসহ নিবিড় গবেষণা, দূরদর্শী পরিকল্পনা ও বিশেষায়িত আমলাতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন— জামাল উদ্দীন
প্রশ্ন :ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। সুদের হার ৯ ও ৬ শতাংশ নির্ধারণে আপনার অভিমত কি?
n এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। কোনো অর্থনৈতিক ফোরাম বা অর্থনীতিবিদের পক্ষে বলছেন না। আমি প্রশ্ন করতে চাই, পৃথিবীর কোনো দেশে ৯ শতাংশ সুদের হার আছে কি না? অর্থনীতিবিদগণ বলছেন সুদের হার মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিতে। এখন সুদ হার ১৪ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যমান। ব্যক্তি স্বার্থের ওপর কেউই উঠতে পারছেন না। গরিব মানুষের কথা বলা হচ্ছে, যার ২০ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা আছে সে কি গরিব? গরিব লোকের সংজ্ঞাও নতুন করে লেখা দরকার। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই আরো ব্যাংকের অনুমোদন দিন। কিন্তু শর্ত থাকবে যে, সুদের হার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ রাখতে হবে। ব্যাংক কীভাবে টাকার ব্যবস্থা করবে তার দায়িত্ব সরকারের বা জনগণের নয়। বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও করোনা ভাইরাসের কারণে উন্নত দেশগুলো সুদের হার কমিয়েছে। আমরাও উদ্ভূত পরিস্থিতির শিকার এবং তাতে ঋণের সুদহার ৬ শতাংশ নির্ধারণ করলেও ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কষ্টসাধ্য হবে। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সরল সুদহার অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রশ্ন :দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং কার্যকর নীতিমালা ছাড়া স্থিতিশীল উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের দেশে দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং কার্যকর নীতিমালার অভাব রয়েছে। এর কারণ কি বলে আপনি মনে করেন?
n একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে মুজিব শতবর্ষে আমি বলতে চাই, গভীর দেশপ্রেমের জন্য স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে স্বাধীনতার ৪৮ বছর অতিবাহিত করেছি কিন্তু এখনো আমরা একটি উন্নত দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছি। একটি জাতি হিসেবে আমাদের অনেক সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আমার বিশ্বাস, এ থেকে উত্তরণকল্পে দেশ পরিচালনা করার জন্য একটি নিবেদিত ও বিশেষায়িত আমলাতন্ত্র প্রয়োজন। যা দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞার সঙ্গে নীতি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। সর্বোপরি, দূরদর্শী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য দেশপ্রেম ও সততা প্রয়োজন। বিশেষায়িত আমলাতন্ত্রের অভাবে, আমরা জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও গঠনের সময় কোন্ কোন্ বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকার পেতে পারে তা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারছি না। ফলে, সমস্যা সমাধানে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হওয়ার পরও আমরা সন্তোষজনক ফলাফল পাই না। তেমনি, জাতীয় সম্পদ ও সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানোর জন্য আমাদের করণীয় বিষয়সমূহের অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করতে ভুল করছি এবং ব্যর্থ হচ্ছি।
প্রশ্ন :আপনি বিশেষায়িত আমলাতন্ত্রের কথা বলছেন, এটি কি এবং কেন প্রয়োজন।
n ‘বিশেষায়িত আমলাতন্ত্র’ ধারণাটি নতুন নয়। এটি বেশির ভাগ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে প্রচলিত রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মূল্যবান শিক্ষা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরিপূর্ণ সদ্ব্যহার করার জন্য তাদের চাকরির ধারাবাহিকতা ও কর্মজীবন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই খাতে বা একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখাই ‘বিশেষায়িত আমলাতন্ত্র’—এর মূল ধারণা। সকল পেশায়ই এটি থাকা উচিত। উদাহরণ হিসেবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একজন আমলা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে জড়িত থাকতে পারেন না, কেননা উনার এ বিষয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নেই। কারণ প্রশাসন ও নীতি নির্ধারণে আমলাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি একজন আমলা সুপারম্যান নন, তারও সীমাবদ্ধতা আছে। কেবল বিশেষায়িত আমলা যারা একই বিভাগে শুরু থেকে কাজ করে আসছেন তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে সক্ষম। উচ্চ শিক্ষিত, দক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কর্মকর্তাদের দ্বারা সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত করা সম্ভব এবং এর মূল্যায়নও হওয়া উচিত। ‘বিশেষায়িত আমলাতন্ত্র’ ধারণাটি আমাদের দেশে এখনো অনুসরণ করা হচ্ছে না, এটা খুবই দুঃখজনক।
প্রশ্ন: সম্প্রতি আপনি বারভিডার নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দ্বিবার্ষিক এই নির্বাচনে আপনি সর্্বোচ্চসংখ্যক ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন, এ বিষয়ে আপনার অনুভূতি কী?
n আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছি। বারভিডার সদস্যদের প্রতি আমি অনেক অনেক কৃতজ্ঞ। তাদের ম্যান্ডেট এই খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। এজন্য, আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সমান্তরালভাবে ব্যবসা নিশ্চিত করা ও অনুকূল শুল্ক কাঠামোতে মৌলিকত্ব দান করা। এমনিতেই শুল্ক বৈষম্যসহ নানা কারণে দেশে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবসা অসম্ভব মন্দা। ফলে, ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত গ্রাহকগণ চাপে আছেন। অপরদিকে, এই খাতে সরকারের রাজস্ব আয় হ্রাস পেতে শুরু করেছে। বিভিন্ন দেশ হতে নিম্নমানের নতুন গাড়ি দেশে আসছে এবং জাতীয় ও জনস্বার্থ ব্যাহত করছে। মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, অটোমোবাইল খাতের সামগ্রিক বিকাশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা, আইন এবং শুল্ক কাঠামো তৈরি করা।
প্রশ্ন: রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাজস্ব সংগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, রাজস্ব প্রদানের বিষয়টি ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও জনগণের নৈতিক দায়িত্ব। তবে প্রদানকারী এবং গ্রহণকারীর মধ্যে বিরোধ রয়েছে. এটি কীভাবে সমাধান করা যায়?
n দেশের উন্নয়ন তথা সরকার পরিচালনা করার জন্য রাজস্ব দরকার। তাই রাজস্ব আদায় করা সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ভ্যাট, ট্যাক্স ও শুল্ক নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে দূরদর্শী পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এজন্য এ জাতীয় গবেষণা ও অনুসন্ধানকে আরো জোরদার করা দরকার। স্টেকহোল্ডারদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। উন্নত দেশের পদ্ধতি অনুকরণ করার চেয়ে কাস্টমাইজড পদ্ধতিকেই আমি গুরুত্ব দিতে অনুরোধ করব।