এম এ আলআমিন
ইউরোপ সাফ জানিয়ে দিয়েছে—তারা নতুন শরণার্থী গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। শরণার্থী অনুপ্রবেশ রোধ করতে শক্তি প্রয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে। ঘটনার শুরু গত মাসে তুরস্কে ২০১৬ সালের শরণার্থী স্থগিত রেখে ইউরোপের সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর। শেষ পর্যন্ত তুরস্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঐ চুক্তি পর্যালোচনা করতে রাজি হয়েছে।
তুরস্ক সম্প্রতি বুলগেরিয়ার সঙ্গে সীমান্ত খুলে দিয়েছে। এরপরই তুরস্কের ভেতরে থাকা হাজার হাজার শরণার্থী ইউরোপ অভিমুখে বেরিয়ে পড়ে। ১১ মার্চ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেন, ইইউ তুরস্কের সব দাবি পূরণ না করা পর্যন্ত সীমান্ত উন্মুক্ত থাকবে। সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর থেকে প্রতিদিনই হাজার হাজার শরণার্থী পাড়ি দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য ইউরোপের ভূখণ্ডে ঢোকার চেষ্টা করে; কিন্তু গ্রিসের নিরাপত্তাবাহিনী কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও লাঠিচার্জ করে শরণার্থীর ঢল আটকানোর চেষ্টা করে। তাড়া খেয়ে শরণার্থীরা গ্রিসের সর্বচেয়ে পুবের দ্বীপ লেসবসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সেখানে প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে থাকতে বাধ্য হচ্ছে ভীতসন্ত্রস্ত শরণার্থীরা। প্রায় ৩২ হাজার শরণার্থীকে আটক করা হয়েছে। গ্রিস শরণার্থীদের আবেদন গ্রহণ করার কাজ বন্ধ রেখেছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে দেশটিতে অনুপ্রবেশকারীদের বহিষ্কারের হুমকিও দিয়েছে দেশটি। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা জানিয়েছে, গ্রিসের জন্য শরণার্থীদের বহিষ্কারের কোনো বৈধ ভিত্তি নেই। এ পর্যন্ত শরণার্থীবাহী একটি নৌযান ডুবে যাওয়াসহ দুই শরণার্থীর মৃত্যুরও খবর পাওয়া গেছে। গ্রিক প্রধানমন্ত্রী কারিয়াকস মিতসোতাকিস এসব ঘটনার জন্য কোনো দুঃখ প্রকাশ করেননি। বরং তিনি বলেছেন, ‘আমরা আমাদের সীমান্ত রক্ষার চেষ্টা করেছি, এটি ইইউর সীমান্তও বটে।’ গ্রিক সরকারের এক মুখপাত্র ১ মার্চ বলেন, ‘ইইউ কমিশন প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন গতকাল গ্রিস ঘুরে গেছেন। সীমান্ত রক্ষার বিষয়ে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গ্রিসকে তিনি ‘ইউরোপের ঢাল’ উল্লেখ করে সীমান্ত রক্ষা কর্মসূচিতে ৭০০ মিলিয়ন ইউরো সহায়তার কথা ঘোষণা করে গেছেন।
এদিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রধান ডেভিড ম্যাকঅ্যালিস্টার পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক কমিটিতে বলেছেন, ‘কোনো মতেই ২০১৫ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেওয়া চলবে না। ঐ বছর ইউরোপে ১৩ লাখ শরণার্থী গিয়েছিল। যাদের বেশির ভাগ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া ও লিবিয়ার মানুষ। গ্রিসের মধ্য দিয়েই তারা ইউরোপে ঢোকে। পরিস্থিতি নিয়ে তখন খুব একটা জটিলতার উদ্ভব হয়নি। কারণ মানবিক কারণে গ্রিস তখন হস্তক্ষেপ করেনি। তবে সমস্যার মূলে যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ছিল তার সমাধানের জন্য ইউরোপের দেশগুলো কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমানে সেখানে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে তার মূলে আছে সিরিয়া যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা। এরদোয়ান অভিযোগ করেছেন, ২০১৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী শরণার্থী শিবির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইইউ বা ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর তুরস্ককে যে অর্থ দেওয়ার কথা ছিল তারা সেটি দেয়নি। অনেকে মনে করেন, ঐ চুক্তি আসলে শরণার্থী সমাধানের জন্য যথেষ্ট ছিল না। বরং শরণার্থী ইস্যুতে নিজেদের পলিসি ঠিক করে নেওয়ার জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোকে কিছুটা সময় দেওয়াই ছিল চুক্তির উদ্দেশ্য। চুক্তির অন্যতম প্রণেতা ছিলেন জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেল। এতে তুরস্ককে ৬ বিলিয়ন ইউরো সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এছাড়া তুরস্কের ইইউ সদস্য হওয়ার বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া ও কিছু শর্তসাপেক্ষে তুরস্কের নাগরিকদের অবাধে ইউরোপের দেশগুলো ভ্রমণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল চুক্তিতে। বিনিময়ে শরণার্থীরা যেন ইজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে ঢোকার চেষ্টা না করে সেটি দেখতে বলা হয়েছিল। এই সময়ের মধ্যে ইউরোপের দেশগুলো শরণার্থীদের কোটা অনুযায়ী যার যার দেশে নিয়ে নেয়। তুরস্কে যে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ঢোকে তার সামান্য একটি অংশ ইইউ গ্রহণ করলেও বাকিদের নেয়নি। তুর্কীদের ওপরও ভিসা নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেনি। ইইউ দাবি করে—তারা দুই কিস্তিতে ৩ বিলিয়ন ইউরো করে দিয়েছে; কিন্তু আঙ্কারার দাবি—তারা এই অর্থের মাত্র অর্ধেক পেয়েছে। এভাবে দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক ক্রম অবনতির দিকে গড়িয়েছে।