বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্ক

সাখাওয়াত আলী খান

 

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন ছিল উত্তাল। শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম থেকেই তার সমসাময়িক তরুণ, দেশপ্রেমিক ও প্রতিভাবান সাংবাদিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন তার চাইতে বয়সে কম কিন্তু সাহসী ও কর্মঠ। প্রগতিশীল এই সাংবাদিকদের তিনি নানা নামে ডাকতেন। সেই ডাকের মধ্যেই মুজিবের এই বোধ স্পষ্ট হয়ে উঠত যে এই পেশাদার সাংবাদিকেরা তার দোষত্রুটি দেখলেও তা জনগণের সামনে তুলে ধরবেন

 

রাজনীতিকদের সঙ্গে সাংবাদিকদের কেমন সম্পর্ক থাকা দরকার, সে সম্পর্কে অনেকের কথা ও লেখা থেকে আমি নানা রকম মত পেয়েছি। বিষয়টি সম্পর্কে মাঝে মাঝে চিন্তাভাবনা করে আমার মনে হয়েছে সম্ভবত এ দুটি পেশার মানুষ পরস্পরের পরিপূরক। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, রাজনীতিকদের সঙ্গে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের সঙ্গে প্রায়শই সাংবাদিকদের হঠাত্ হঠাত্ একধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে যায়। কেন এমন হয়?

এ প্রসঙ্গে একটি আদর্শ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সাংবাদিকতাকে কেন ফোর্থ এস্টেট বা চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়, সে ব্যাপারে একটু আলোচনা করে নিলে ভালো হয়। খুব সংক্ষেপে বললে, এই চারটি এস্টেট বা স্তম্ভ হচ্ছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণপরিষদ কিংবা পার্লামেন্ট বা সংসদ, যার সদস্যরা মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দেশের শাসনতন্ত্রসহ নানা আইন প্রণয়ন করেন। দ্বিতীয় স্তম্ভ হচ্ছে এক্সকিউটিভ বা সরকারি প্রশাসন, যারা সেই আইন অনুযায়ী প্রশাসন চালান। তৃতীয়টি হচ্ছে জুডিশিয়ারি বা বিচারব্যবস্থা, আইন অনুসারে যারা বিচার করে থাকেন কিংবা কোনো প্রণীত আইন দেশের শাসনতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, সে সম্পর্কে চূড়ান্ত মত দেন এবং সবশেষে রয়েছে সাংবাদিকতা বা প্রেস, যারা সরকারি-বেসরকারি সব ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং দেশে-বিদেশে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি সঠিকভাবে তুলে ধরে সেগুলোর বিশ্লেষণের চেষ্টা করেন। প্রয়োজনে আমরা এই ফোর্থ এস্টেটের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পর্ক কেমন ছিল সে বিষয়ে কিছুটা আলোচনার চেষ্টা করব। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে এ বিষয়ে কিছু লেখার মতো যোগ্যতা আমার নেই। একটি প্রধান জাতীয় দৈনিক থেকে কেবল অনুরুদ্ধ হয়েই নিজের স্মৃতি এবং এ বিষয়ে শোনা নানা অসমর্থিত তথ্য দিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করব। ফলে লেখার সীমাবদ্ধতা ও ভুল-ত্রুটি পাঠকেরা নিজ গুণে ক্ষমা করবেন এবং সেই সঙ্গে প্রয়োজনবোধে তাদের মতামত আমাকে জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।

বঙ্গবন্ধুর জীবন সম্পর্কে যতটুকু জানা গেছে, তাতে এই ধরণা হওয়া স্বাভাবিক যে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকতার ফোর্থ এস্টেট ভূমিকা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় যে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টাই ছিলেন একজন সাংবাদিক, প্রজ্ঞাবান, অসীম সহাসী এবং অসাধারণ লেখনীর অধিকারী তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। তবে সাংবাদিক মানিক মিয়ার সঙ্গে রাজনীতিক শেখ মুজিবুর রহমানের মাঝে মাঝে মতবিরোধও হয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, দেশের স্বার্থে তারা আবার একাত্ম হয়ে গিয়েছেন। মানিক মিয়া ও তার ইত্তেফাকের সমর্থন পেয়েই বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। দুঃখের বিষয়, মানিক মিয়া মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের জন্ম দেখে যেতে পারেননি। বাংলাদেশের কর্ণধার হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে দেখে যেতে পারলে মানিক-বঙ্গবন্ধু সুগভীর সম্পর্ক কী পর্যায়ে গড়াত, তা এখন শুধু কল্পনাই করা যেতে পারে।

সবাই জানে, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন ছিল উত্তাল। শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম থেকেই তার সমসাময়িক তরুণ, দেশপ্রেমিক ও প্রতিভাবান সাংবাদিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন তার চাইতে বয়সে কম কিন্তু সাহসী ও কর্মঠ। প্রগতিশীল এই সাংবাদিকদের তিনি নানা নামে ডাকতেন। সেই ডাকের মধ্যেই মুজিবের এই বোধ স্পষ্ট হয়ে উঠত যে এই পেশাদার সাংবাদিকেরা তার দোষ-ত্রুটি দেখলেও তা জনগণের সামনে তুলে ধরবেন। যদিও এই তরুণ সাংবাদিকদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। মহান নেতা এদের মধ্যে অনেককেই নিজের ছোটো ভাই বলে মনে করতেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি এদের মধ্যে তিন জনের নাম দিয়েছিলেন ‘আপদ’, ‘বিপদ’ ও ‘মুসিবত’। কেন এমন নাম দেওয়া? কারণ মুজিব জানতেন, তার ভুলভ্রান্তিও এই অনুজসম সাংবাদিকেরা পেশাদারিত্বের তাগিদে জনগণের সামনে তুলে ধরা থেকে বিরত থাকবেন না। প্রিয় মুজিব ভাই, তাই জেনেশুনেই এই তিন সাংবদিককে দেখলেই স্নেহের সুরে আপদ, বিপদ ও মুসিবত বলে সম্বোধন করে কথা বলতেন। এই তিন সাংবাদিক কারা ছিলেন তা কি আপনারা জানতে চান? এ ব্যাপারে কিছু মতান্তর থাকলেও আমি কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই বলছি, এরা সম্ভবত ছিলেন এ বি এম মুসা, এম আর আখতার মুকুল ও ফয়েজ আহমদ। আমাদের জন্য দুঃখজনক এই যে তিন জনই এখন প্রয়াত।

আপদ, বিপদ, মুসিবত ডাকার ব্যাপারটি সম্পর্কে কিছুটা মতান্তরের সুযোগ থাকলেও তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলার সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাংবাদিকদের একটি মর্মস্পর্শী ঘটনার বিবরণ সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ফয়েজ আহমদ, অর্থাত্ আমাদের ফয়েজ ভাইয়ের কাছ থেকে আমি নিজেই শুনেছিলাম। ফয়েজ ভাইকে যারা দেখেছেন তারা সবাই জানেন, ভাঙা ভাঙা গলার স্বরে ফয়েজ ভাই সহাস্যে কীভাবে চমত্কার সব ঘটনার বিবরণ দিতেন। যখন আগরতলা মামলা চলছে, তখন কিছু কিছু সাংবাদিককে আদালতে উপস্থিত থেকে রিপোর্ট করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আদালত বসত ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে। বঙ্গবন্ধুকেও রাখা হয়েছিল ক্যান্টনমেন্টের মধ্যেই। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুকে যখন আদালতে উপস্থিত করা হতো, তখন সাংবাদিকদের মধ্যে রীতিমতো আলোড়ন পড়ে যেত। সিনিয়র সাংবাদিকদের মধ্যে অনেকের সঙ্গেই শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। এছাড়া অনেক সাংবাদিককেই তিনি চিনতেন। আদালতে প্রবেশ করে সাংবাদিকদের অনেকেরই   নাম উচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলতেন,           ‘কি রে, কেমন আছিস?’ অনেকের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতেন। এ ছিল আদালত চলাকালীন বঙ্গবন্ধু ও সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রায় নৈমিক্তিক ঘটনা। বলা বাহুল্য, সাংবাদিকদের জন্য আদালতে আলাদা জায়গা বরাদ্দ থাকায় বঙ্গবন্ধুর পক্ষে একসঙ্গেই সবাইকে দেখার সুযোগ ছিল।

এসব দেখেশুনে মিলিটারি কর্তৃপক্ষ, যারা ছিল আদালতকক্ষের নিয়ন্ত্রক, তারা একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিল যে আদালতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কোনোরূপ কথোপকথন করা যাবে না। এমনকি সাংবাদিকদের জন্য এমন নির্দেশও জারি করা হলো যে আদালতে বঙ্গবন্ধুর প্রবেশের সময় তার দিকে তাকানো পর্যন্ত যাবে না। এই নির্দেশনামা পাওয়ার পরবর্তী সময়ে যখন আদালতের অধিবেশন শুরু হলো, তখন বঙ্গবন্ধুর আদালতে প্রবেশের সময় নিচের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া সাংবাদিকদের গত্যন্তর ছিল না। এরপর যখন আদালত বসল, বঙ্গবন্ধু যথারীতি তার অননুকরণীয় রাজসিক ভঙ্গিতে আদালতকক্ষে প্রবেশ করে প্রথমেই সাংবাদিক গ্যালারির দিকে তাকালেন এবং স্বভাবসুলভ কণ্ঠে ‘কিরে ফয়েজ, কেমন আছিস?’ বললেন, তখন ফয়েজ ভাইসহ সব সাংবাদিকই নীরবে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু কিছুমাত্র বিব্রত না হয়ে বললেন, ‘কিরে ফয়েজ, চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে আছিস কেন?’ তারপর তার সেই চেনা গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘দেখ ফয়েজ, বাংলাদেশে থাকতে হলে মুজিবের দিকে তাকাতে হবে, কথাও বলতে হবে।’ ফয়েজ ভাই পরে আমাদের জানান তাদের সেই বিব্রতকর অবস্থা, কিন্তু আদালতে উপস্থিত প্রায় সব বাঙালিরই বোধহয় তখন গর্বে বুক ভরে উঠেছিল, আপনারাই বলুন, ঘটনার এত বছর পরও এই ঘটনায় কোন বাঙালির বুক গর্বে ফুলে উঠবে না, চোখ ভিজে যাবে না?

সাংবাদিকদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অনেক অন্তরঙ্গ ও মজার ঘটনা বা কাহিনি নিশ্চয়ই আরো অনেকের স্মৃতিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। একদিন হয়তো আমরা সেসব সংগ্রহ করে প্রকাশ করতে পারব। তবে মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে এ বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হবে যে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু যখন ব্রিটিশ সরকারের প্রদত্ত বিমানে লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসেন, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে একজন বিশিষ্ট বাঙালি সাংবাদিকও ছিলেন বিমানে। তাকে দিল্লি থেকে বিমানে তোলা হয় এবং বিমানে বসে সেই সাংবাদিকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বেশ কিছুক্ষণ আলাপ করেন। সেই সাংবাদিক আতাউস সামাদও এখন প্রয়াত, না হলে তাদের মধ্যে কী আলাপ হয়েছিল, তা হয়তো বিস্তারিত আমরা জানতে পারতাম।

 

লেখক :অনারারি অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়