বঙ্গবন্ধু নিয়ে কিছু স্মৃতি

মোহাম্মদ নাসিম

ছাত্রলীগ বা ছাত্র ইউনিয়ন অত ডিফারেন্ট বুঝতাম না। যা-ই হোক, ছাত্র ইউনিয়ন

করতাম। দেখেন, বঙ্গবন্ধু এত বড়ো নেতা তখন তিনি ছয় দফা ঘোষণা করেছেন। ছয় দফা ঘোষণার পরে প্রথমে তিনি একটা পর্যায়ে পাবনায় আসেন। পাবনায় এসে একটা বড়ো জনসভা হয় টাউন হলে, আমার মনে আছে। বিশাল জনসভা হয় ছয় দফা নিয়ে;

তখন তো একটা বিরাট গণজোয়ার সৃষ্টি হয় ছয় দফার পক্ষে

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যে কোনো বাঙালি বা যে কোনো মানুষের স্মৃতির কথা বলতে গেলে তো সবচেয়ে জীবনের বড়ো গৌরবের কথা বলতে হয়। একজন বাঙালির জীবনে বঙ্গবন্ধুর সাহচার্য পাওয়া। একজন মহান ব্যক্তিত্বের কাছে আসা যে কত বড়ো গৌরব-আনন্দের তা বলে শেষ করা যাবে না। আমার মতো সামান্য একজন রাজনৈতিক কর্মীর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অনেক স্মৃতি রয়েছে। আনন্দময় উজ্জ্বল স্মৃতিকথা রয়েছে। যদিও এখনো বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে গেলে চোখে পানি এসে যায়। বঙ্গবন্ধুকে আমরা হারিয়েছি। জাতির জনক এত কম সময়ের মধ্যে আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেছেন এর চেয়ে বড়ো বেদনার, দুঃখের আর কিছু হতে পারে না। আমরা একটি অকৃতজ্ঞ জাতি। যে মহান নেতার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, বাঙালি হাজার বছরের মুক্তির স্বাদ পেয়েছিল, সে বাঙালি কয়েকজন বিশ্বাস ঘাতকের হাতে তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রায় পুরো পরিবারকে জীবন দিতে হয়েছে। জাতীয় চার নেতাকে জীবন দিতে হয়েছে। এই কলঙ্ক এই কষ্ট আমাদের চিরজীবন বহন করতে হবে। যদিও এখন কিছুটা স্বস্তি পাই কারণ এই যে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তার দীর্ঘ সংগ্রাম-লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতে সমর্থ হয়েছেন। জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার করতে সমর্থ হয়েছেন। এ কারণে এক বিশাল বেদনার মধ্যেও এটুকু স্বস্তি আছে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আমরা বিচার করতে পেরেছি। অনেকের দণ্ড কার্যকর হয়েছে।

একটা স্মৃতির কথা আমি বলি, এটা আমি অনেক জায়গায় বলেছি এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে জাতীয় আমাদের আওয়ামী লীগের নেতারা সবাই জানেন। আমি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র তখন। তখন ছিল দুটি সংগঠন। ছাত্রলীগ আর ছাত্র ইউনিয়ন ছিল। আপনার সে সময় একটু পাবনায় যে পরিস্থি তি ছিল। কলেজের যে পরিস্থিতি ছিল তাতে ছাত্র ইউনিয়ন ছিল কিছুটা মানে বলতে গেলে মানুষের কাছে ছাত্রদের কাছে খুব গ্রহণযোগ্য ছিল। এজন্য আমি বুঝে না বুঝে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হই, সক্রিয় সদস্য হই।

ছাত্রলীগ বা ছাত্র ইউনিয়ন অত ডিফারেন্ট বুঝতাম না। যা-ই হোক ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। দেখেন বঙ্গবন্ধু এত বড়ো নেতা তখন তিনি ছয়দফা ঘোষণা করেছেন। ছয়দফা ঘোষণার পরে প্রথমে তিনি একটা পর্যায়ে পাবনায় আসেন। পাবনায় এসে একটা বড়ো জনসভা হয় টাউন হলে আমার মনে আছে। বিশাল জনসভা হয় ছয়দফা নিয়ে; তখন তো একটা বিরাট গণজোয়ার সৃষ্টি হয় ছয়দফার পক্ষে।

যেহেতু আব্বা তখন আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট কিন্তু তিনি পাবনায় প্রাকটিস করতেন। পাবনায় থাকতেন ম্যাক্সিমাম টাইম। যাই হোক মিটিংয়ের পরে আমরাও গেছি। সাধারণ মানুষ সবাই গেছে। বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা শোনার জন্য। তখন তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তখন সাধারণত আওয়ামী লীগের নেতারা বা বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে বড়ো বড়ো নেতারা যারা ছিলেন, তারা কিন্তু সার্কিট হাউজ বা ডাকবাংলোয় যেতেন না। ঐ সুযোগও তাদের ছিল না। তখন তারা আওয়ামী লীগের নেতাদের বাসায় থাকতেন অথবা খাওয়া-দাওয়া করতেন। সেদিন তিনি যেহেতু পাবনায় আসছেন। পাবনায় তিনি আমজাদ সাহেবের বাসায় আওয়ামী লীগের তখন তিনি সভাপতি ছিলেন। তার বাসায় গিয়ে রাতে থাকবেন কিন্তু সন্ধ্যার সময় মিটিংয়ের পরে আমাদের বাসায় পাবনায় খেতে আসছেন বঙ্গবন্ধু। সে বাসায় সবাই আসছে সোহরাওয়ার্দী সাহেব আসছিলেন একসময়। মওলানা ভাসানী গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তো একাধিক বার গিয়েছিলেন। সেদিনও তিনি আসছেন সন্ধ্যার সময় খাওয়ার জন্য। তো আমি তো তখন কেবল ছাত্ররাজনীতি করি। দেখেন বঙ্গবন্ধু কত বড়ো নেতা। তখন ছয়দফা তুঙ্গে প্রচারণায়। বঙ্গবন্ধু বড়ো নেতা হয়ে গেছেন তখন। তখন বঙ্গবন্ধু আসছেন রাতে খাওয়া-দাওয়া করবেন, খাওয়া-দাওয়া করার সময় তিনি হঠাত্ দেখলেন এই নাসিম কোথায়। তখন আমি তো বুঝতে পারছি না কীজন্য ডাকছেন; ভয় পেয়ে গেছি। বঙ্গবন্ধু ডাকছেন যাবো না কেন। সবাই আছে, আমার মনে আছে এখনো। কাছে গেছি। এই নাসিম, এদিকে আয়। যাওয়ার পর তিনি কান ধরেছেন আমার। আমার এখনো মনে আছে। তখন আমার বয়স ১৭/১৮ হবে। ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড বা ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। তখন প্রায় ৬৫/৬৬ সাল। আমার এখনো মনে আছে সেই কান টানা। এই এদিকে আয়। কান ধরে বলছেন, তুই মনসুরের ছেলে হয়ে ছাত্র ইউনিয়ন করিস। এই একটা কথাই বলেছেন আমাকে। মনসুরের ছেলে হয়ে তুই ছাত্র ইউনিয়ন করিস। আমি বঙ্গবন্ধুকে চাচা বলতাম, আমরা সবাই চাচা বলতাম। তখনই বলছি চাচা আর জীবনে করব না।

যা-ই হোক খাওয়া-দাওয়া করে চলে গেছেন। তার কয়েক দিন পরেই আসলে আমি মানে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে পদত্যাগ করে ছাত্রলীগে জয়েন করছি, একটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে করেছি। দেখেন, এত বড় নেতা তিনি, তিনি কিন্তু একটু উপেক্ষা করতে পারতেন তাই না? কিন্তু এত স্নেহ করতেন আমাদেরকে তিনি, কিন্তুু হাসি মুখে বলছেন, তুই ছাত্র ইউনিয়ন করিস। মানে ধমকের সুরে বলছেন, তুই মনসুরের ছেলে ছাত্র ইউনিয়ন করিস। অন্য কিছু বলেননি। ছাত্রলীগ করতে হবে তাও বলেননি কিন্তু  মনসুরের ছেলে ছাত্র ইউনিয়ন করিস। এই কথা আমি অনেক বার বলছি মিটিংয়ে, এখনো বলছি। ক্যাবিনেট মিটিংয়েও বলেছি। সবাই জানে এটা, নেত্রীও জানেন। আমাদের পরিবারের কথা বঙ্গবন্ধুর পরিবার জানত। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কথা নজরুল ইসলামের পরিবারের কথা সবাই জানত। পারিবারিক সম্পর্ক বা বন্ধন ছিল।

এই রকম একটা স্মৃতি। আমার এখনো মনে হয় বঙ্গবন্ধু আমার কানে হাত দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু চুল ধরে টানছেন, কান ধরে টানছেন, স্নেহ করছেন। কারণ, বঙ্গবন্ধুকে যে একবার দেখছেন, বঙ্গবন্ধুর কাছে যিনি গেছেন, তিনি কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে জীবনে আর ভুলতে পারবেন না। তার ঘোর শত্রুরাও কিন্তু তার কাছে যেতে পারত। সম্মোহনী শক্তি ছিল এবং বঙ্গবন্ধুর মতো সুদর্শন এত পারসোনালিটি মনে হয় বাংলাদেশ কেন, দুনিয়ায় অনেকেই দেখেনি। তারপর থেকে বঙ্গবন্ধু যতবার আমার খবর শুনেছেন বা আমার রাজনৈতিক জীবন সম্বন্ধে জেনেছেন, সবসময় মনে হয়েছে বঙ্গবন্ধু আমাকে স্নেহ করতেন, পছন্দ করতেন যে, না—এই ছেলেটা দিয়ে অনেক কাজ হবে।

তার একটাই কারণ হচ্ছে আমি বলি যে, যখন বাকশাল গড়েন সবচেয়ে ইয়াং গেস্ট সেক্রেটারি আমি ছিলাম বাংলাদেশের। তখন কেবল ছাত্র রাজনীতি শেষ করছি। তখন বঙ্গবন্ধু নিজে বলেছেন আব্বাকে পাবনার বাকশালের সেক্রেটারি যেন নাসিমকে বানানো হয়। উনি বানিয়েছেন।

আরেকটা দুঃখজনক একটা ঘটনার কথা বলি। আমি অনেক জায়গায় বলেছি ঘটনাটা। তখন ছাত্রলীগ করা শুরু করেছি। খুব সম্ভব সিক্সটি এইট। পাবনায় নকশালদের উপদ্রব ছিল। পাবনা ছিল নকশালদের ঘাঁটি। তখন ছাত্র ইউনিয়ন ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। একটা হলো মেনন গ্রুপ আরেকটা মতিয়া গ্রুপ। টিপু বিশ্বাস ছিল মেনন গ্রুপ থেকে নকশালের অংশ। তো পাবনায় একটা ঘটনা ঘটে। তখন আমি বোধহয় সেকেন্ড

 

 

ইয়ারের ছাত্র। তখন একটা ছাত্র ইউনিয়ন ছাত্র-ইউনিয়নের মধ্যে মারামারি হয় একটা জায়গায়। হওয়ার পরে আমি হাসপাতালে গেছি দেখতে। ঐ আমার কর্মী তো আহত হয়ে ভর্তি হয়েছে পাবনা সদর হাসপাতালে; ছোটো হাসপাতাল। ঐ হাসপাতালের মধ্যে আমাকে অ্যাটাক করে। তখন ঐ টিপু বিশ্বাসের লোকজন আমাকে ওপেন ফায়ার করে। হাসপাতাল চত্বরে। তখন বোধহয় দুপুরবেলা হবে আমার ধারণা এবং শুধু অ্যাটাক করে না, তখন তো বন্দুক-টন্দুক না চাকু দিয়ে অ্যাটাক করে আমাকে। চাকু দিয়ে অ্যাটাক করার পরে হাসপাতালের বারান্দার উপুড় হয়ে পড়ে গেছি। লাথি মারছে। পিঠে ছুরি মারছে—ছয়টা দাগ। এখনো কিন্তু ছয়টা দাগ আমার আছে। ঐ সময় নকশাল সিক্সটি এইট-এ বা লাস্টের দিকে।

যেহেতু হাসপাতালের বারান্দার মধ্যে আমাকে অ্যাটাকটা করেছে। ডাক্তাররা চলে গেছে। গফফার সাহেব নামে এক ভালো সিভিল সার্জন ছিলেন, আমার এখনো মনে আছে। তিনি দ্রুত আমাকে অপারেশন টেবিলে নিয়ে যান। আমি কিন্তু ওখানে মারা যাইতাম ছয়টা স্ট্যাম্প করেছে এবং আমার একদিন জ্ঞান ছিল না। আমি পরে জিজ্ঞেস করেছি, একটা দিন আমার কোথায় গেল।

আমার সবচেয়ে যেটা বলার কথা আরকি তখন কিন্তু পত্রিকা অত বেশি নেই, দুয়েকটা পত্রিকা। খবর পেয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু যে, আমি হাসপাতালে গুরুতর আহত। আব্বা তখন পাবনায় থাকেন। আব্বা তখন আমাকে মেসেজ দিলেন যে, বঙ্গবন্ধু তোকে ঢাকায় নিয়ে যাবেন চিকিত্সার জন্য। ব্লাড আনছেন রাজশাহী থেকে। ব্লাড দিয়ে আমাকে রক্ষা করেছেন।

তো মনে আছে, তখন তো যাতায়াত ব্যবস্থা অত ভালো না। ঈশ্বরদী থেকে তখন সপ্তাহে বোধ হয় এক দিন বা দুই দিন প্লেন যেত পাকিস্তানি এয়ারলাইন্সের।

একটা প্লেনের দুইটা টিকিট পাঠাইছেন বঙ্গবন্ধু। আব্বার আর আমার জন্য। অলরেডি তখন কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান হয়ে গেছে। ঈশ্বরদী আমরা গেছি, আব্বা আমাকে নিয়ে গেছেন মনে আছে আমার। তখন আমি চলতে পারি না। হাতেহাতে ধরে নিয়ে গেছেন। সমস্ত শরীরে ব্যান্ডেজ।

এয়ারপোর্টে আসছি তখন বঙ্গবন্ধু গাড়ি পাঠিয়েছেন। আসার পরে উনি সঙ্গে সঙ্গে মানে আমাকে এইখানে একটা, ধানমন্ডি ৬/৫ নম্বর ঐ মোড়ে, একটা বড়ো নার্সিং হোম ছিল—টিও সেল। মুক্তিযুদ্ধের সময় কিন্তু অংশগ্রহণ করেছে টিও সেল। হেলথ সেক্রেটারি ছিল স্বাধীনতার পরে। সেখানে আমাকে ভর্তি করেছেন। আমার মনে আছে, আব্বাসহ আমাকে নিয়ে গেলেন। এইটা গেল একটা ঘটনা। তারপর তো কতবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছে।

আরেকটা স্মৃতির কথা বলি, পাবনায় একজন ছাত্রনেতা ছিল আহমেদ রফিক নাম। পরবর্তীকালে তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা ছিল। সত্তুরে যখন নির্বাচন হয়, রফিককে সবাই চিনত। কিন্তু তখন তো বাংলাদেশটা এত বড়ো ছিল না, তো হাতেগোনা কর্মী ছিল তাই না। এখন তো এই লাখ লাখ কর্মীর মতো নয়। কারা ছাত্রলীগ করে, আওয়ামী লীগ করে, কারা বঙ্গবন্ধুর নির্বাচন করে, মুখস্থ বলে দিতে পারেন নেতারা। তো রফিক দুর্ধর্ষ কর্মী ছিল, ভালো কর্মী ছিল, তরুন।

তো সত্তুরে যখন নির্বাচন হয় তখন বঙ্গবন্ধুর গণজোয়ার, তাই না? বঙ্গবন্ধুর টিকিট পাওয়া মানেই হচ্ছে জিতা। তো আমাদের পাবনার ছেলেটা ভালো কর্মী ছিল, আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা ছিল। তখন বয়স কত হবে ২২/২৩ হবে, তার বেশি না। আমাদের চেয়ে দুই-তিন বছরের বড়ো হবে। আমরা তাকে ভালো বাসতাম, শ্রদ্ধা করতাম, সে খুব ডায়নামিক কর্মী ছিল। সত্তুরে যখন নির্বাচন হয় তখন তো দেখেশুনে বেছে বেছে দিচ্ছে নমিনেশন।

পূর্ব পাকিস্তান সংসদের নির্বাচন। তখন নির্বাচনে আব্বা আবার পূর্ব পাকিস্তানে দাঁড়ালেন যে, চিফ মিনিস্টার হবেন এই চিন্তা করে বঙ্গবন্ধু তাকে দিচ্ছেন। তখন এই পাবনায় ছিল সাঁথিয়া। একটি জায়গার নাম। সাঁথিয়া একটা এলাকা থানা নিয়ে একটা নির্বাচনী এলাকা ছিল; হয়তো দুই-একটা ইউনিয়ন ছিল আশপাশে। তখন ঐ রফিক ভাই উদীয়মান নেতা ছিলেন, তিনি বলেন আমাকে এখানে নমিনেশন দাও। আমি বলি, আপনি এখানে দাঁড়াবেন? আপনার তো এখানে বাড়িও না, আপনার বাড়ি তো পাবনা শহরে। বলেন, না আমার ওখানে নানাবাড়ি-মামাবাড়ি। কিন্তু তিনি খুব আমাদের এত প্রিয় ছিলেন, আমরা তরুণ যারা ছিলাম, আমরা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। মনে করতাম, তিনি আমাদের নেতা।

আমাকে খুব স্নেহ করতেন তিনি। কিন্তু তখন ঐ একটা ই ছিল যে, এখানে তো সত্তুরের নির্বাচন হয়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনে জেতা ছাড়া তো বিকল্প নাই, তাই না? তখন তো একটা ষড়যন্ত্র ছিল। তার পরেও আমরা চিন্তা করেছি, আমি বলেছি যে দেখো ন্যাশনাল এসেম্বলিতে তো আওয়ামী জেতার জন্য যাদেরকে নমিনেশন দিচ্ছে প্রভেশনাল এসেম্বলিতে তো আমরা একটা সিট পাইলেই কী বা হারলেই কী—এরকম একটা ভাব আরকী।

তো যা-ই হোক, তিনি তো খুব ই করছেন; পাবনার যারা নেতা ছিলেন, কেন্দ্রীয় নেতা, সবাই বলেন—না রফিককে দিয়ে হবে না, রফিককে দিলে সমস্যা আছে। কিন্তু আব্বা তখন পার্লামেন্ট বোর্ডের মেম্বার। পাকিস্তান পার্লামেন্ট বোর্ডের মেম্বার তিনি। তিনি নমিনেশন ঢাকায় বসে দেবেন। এই কথাটা আমি এজন্য বলছি যে, তখন তিনি একটা পর্যায়ে এসে আমাদের বলেছেন, দেখো, তোমরা যদি আমার কথা না বলো বঙ্গবন্ধুকে, তাহলে কিন্তু বাড়ির সামনে সুইসাইড করব। আমি বললাম, আব্বা তো ঢাকায় আছে, আমি কীভাবে বলব। আব্বা তো আমার কথা শুনবেন না, না শুনলেও তোমাকেই বলতে হবে। যা-ই হোক, এখনো স্মৃতিটা মনে আছে, তখন এই যে টেলিফোন—তো টেলিফোন টিঅ্যান্ডটিতে কথা বলত সবাই, এসব ফোন ছিল না। তো আমি সাহস করে একদিন, বানী সিনেমা হল আছে না মেইন রোডে, পেছনে টিঅ্যান্ডটি ছিল। টেলিফোন এক্সচেঞ্জে। তো টেলিফোন এক্সচেঞ্জে রফিক ভাই আমাকে নামিয়ে দিয়ে বলেন তুমি যাও ফোন করো। আমি বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে ফোন করব। যাই হোক আমার মনে আছে টিঅ্যান্ডটিতে গেছি। গিয়ে টেলিফোন অপারেটর যে তাকে আমি বলছি যে, বঙ্গবন্ধুকে লাগান টেলিফোন, সে বলছে বঙ্গবন্ধুকে টেলিফোন করব। আমি বলছি, হ্যাঁ বঙ্গবন্ধুকে। সে বলল, আপনার সঙ্গে কথা বলবে? আমি বললাম, হ্যাঁ বলবে। আমার ট্রাংক কল বুক করো।

নম্বর জানা ছিল আগেই বঙ্গবন্ধুর বাসার বত্রিশ-এর। তো আমি বলছি, টেলিফোন ও বুক করছে। যা-ই হোক, যেহেতু অপারেটর টেলিফোন বুক করছে বঙ্গবন্ধুর নামে। লাইন তারাতাড়ি দিয়ে দিচ্ছে। তখন তো পূর্ব পাকিস্তানে একটা জনজোয়ার যা ছয়দফার পক্ষে। তো টেলিফোন তারাতাড়ি দিয়ে দিচ্ছে। এ পাশ দিয়ে কেউ ধরছে তো

 

 

বলতেছে কে কথা বলবে তখন আমার কথা বলছে অপারেটর যে, উনি কথা বলবে। আমি বলছি আপনি খালি নাম বলবেন, যে মনসুর সাহেবের ছেলে নাসিম কথা বলবে। এ কথা বললে ধরবে উনি ফোন।

কিছুক্ষণ পরে, বঙ্গবন্ধু এত বড়ো নেতা দেখেন, সে সময়ে কী পজিশন তার! সে অবস্থায় একজন কর্মী আমি তার। সাধারণ ছাত্র লীগ কর্মী। মনসুর আলীর ছেলে হতে পারি, চেনে আমাকে এই পর্যন্ত আর কিছু না। বঙ্গবন্ধু টেলিফোন ধরছেন। কী নাসিম—এইভাবে কথা বলছেন। আমি তো পুরা চুপ হয়ে গেছি। চাচাই বলছি। বললেন কী হয়েছে? আমি বলছি, দেখেন আমার একটা আবদার আছে। উনি বললেন কীসের আবদার তোর। আমি আগে থেকে গুছাইয়া নিচ্ছি।

জাতীয় সংসদে তো প্রতিটি সিটই আপনার দরকার। কিন্তু প্রাদেশিক সিটে যে ইলেকশন হচ্ছে। নমিনেশন একসঙ্গে দিচ্ছেন ন্যাশনাল এবং প্রাদেশিক। ওখানে আমাদের সাঁথিয়াতে রফিক ভাইকে দিতে হবে। রফিক? রফিকের বাড়ি কোথায়?

আমি বললাম রফিকের বাড়ি যেখানেই হোক। ও তো জিততে পারবে না, ও জিততে পারবে না। আমি বলছি না না ও জেতা না জেতার কিছু না। চাচা আপনি দেন এটা যদি নষ্ট হয় আপনার তো ক্ষতি হচ্ছে না। ও হইতে পারবে? আমি বলছি না পারবে না। তোর আব্বা কী বলে? মনসুর কী বলে, সে নিজেই বলছে। আমি বলছি, না আব্বাকে দিয়ে হবে না আপনাকেই করতে হবে। না হলে কিন্তু রফিক ভাই যেভাবে কথাবার্তা শুরু করছেন। আত্মহত্যা করবেন, আপনি চেনেন তো।

তখন শুনলেন তিনি, আমি বলছি একটা সিট তো চাচা হয়ে যাবে। আপনার নামেই হবে তবুও আপনি রিস্ক যদি নেন অসুবিধা নেই। আমাদের পাবনার সমস্ত ইয়াং ছেলেরা চাচ্ছে রফিক ভাইকে। শুনলেন, বললেন ঠিক আছে, দেখব রাখ। আমি যখন এসে বললাম রফিক ভাই আপনার হবে, বঙ্গবন্ধু বলেছেন, তিনি কাঁদলেন জড়িয়ে ধরে আমাদের।

তিনি মনে করেছেন এটা একটা স্বীকৃতি দিলাম তার। ত্যাগের স্বীকৃতি এত দিন রাজনীতি করছেন।

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো সত্তুরের নির্বাচনে আমাদের নির্বাচনী এলাকা তখন কাজীপুর। সিরাজগঞ্জের কাজীপুর। তখন এই যাতায়াত এত সহজ ছিল না। তখন পাবনা থেকে সিরাজগঞ্জ যেতে যে অবস্থা ট্রেনে যেতে হতো। মানে এক দিন এক রাত লাগত। আব্বা তো সত্তুরের নির্বাচনে হয়ে গেছেন। আমরাও নামছি গিয়ে সেখানে।

তখন তো রাস্তা ঘাট নাই। বাজারের ওপর দিয়ে যেতে হতো কাজীপুরে। আমি আর আমার বড়ো ভাই সেলিম ভাই কাজ করছি এবং একসঙ্গে ১০ দিন পরে, আমার মনে আছে। ৭ই ডিসেম্বর হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর ১৬ই ডিসেম্বর ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন।

তার মানে আমরা একমাস আগে থেকে ইলেকশনের কাজ করছি। এক মাস/দুই মাস আগে থেকে। আর এর মধ্যে পাবনা আসি নাই। রফিক ভাই নমিনেশন পেয়ে গেছেন। তিনি কাজ করছেন শুনছি আমরা। তখন এমন অবস্থা যে, এত বিচ্ছিন্ন যে আসা-যাওয়া করতে গেলে দুইদিন লাগত। আমাদের কাজ আমরা করছি তখন। নির্বাচন হয়ে গেল সত্তুরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু হয়ে গেছেন। সমস্ত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ। আব্বার নির্বাচন কয়দিন পরে হলো ওটাও আমরা করলাম। জিতেছেন। কয়েকটা সিট ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানে সবগুলোয় আওয়ামী লীগ জিতল। আমার সবচেয়ে ই ছিল যে রফিক ভাই জিতেছেন। তা মনে আছে, ইলেকশন ন্যাশনাল এসেম্বলি হয়ে গেল। পূর্ব পাকিস্তানের ইলেকশন হয়ে গেল।

ইলেকশন হওয়ার দুই-তিন দিন পরে আমরা ফিরছি সব। তখন পাবনায় আব্বা থাকেন। বিল্ডিংয়ে থাকেন আব্বা। আমরা তো পাবনায় থাকি। পাবনায় প্রাকটিস করেন আব্বা। নির্বাচনের কারণে ওখানে বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন।

আমাদের পাবনায় এখন যে বাড়িটা আছে, বাড়ির সামনে এসে দেখি তখন শীতের রাত তো রাস্তায় লোকজন বেশি নাই। কিন্তু অন্য রকম একটা আমেজ আছে। আমরা বাসায় আসলাম। আব্বা আম্মা আমরা ফ্যামিলিসহ আসছি। অত রাত্রির তো আর কেউ লোকজন আসে নাই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও কি? আমরা যখন ঢুকলাম, ঢোকার বোধহয় আধা ঘণ্টা কি এক ঘণ্টা পরে কে যেন এসে দরজা ধাক্কাচ্ছে।

আমি ভাবলাম, হতে পারে লোকজন আসছে, হয়তো খবর পেয়ে গেছে বোধ হয় মনসুর আলী সাহেব আসছেন, ফিরে আসছেন পাবনায়, এখান থেকে ঢাকা চলে যাবো। তো পাবনায় আমরা থাকি কিন্তু আব্বার তো ঢাকায় আসা হয়। তো দরজা খুলছে তখন আমি আর মা মনে হয় শুয়ে আছি বা বসে আছি। কে যেন চিত্কার করে বলছে, ‘রফিক ভাইকে মাইরা ফেলছে।’ আমি ঘরের মধ্যে বসে আছি। সবাই তো পাথর হয়ে গেছে। রফিক ভাইকে মাইরা ফালাইছে! তো শুনছি কানে যাচ্ছে নকশালরা রফিক ভাইকে বাড়ির সামনে চাকু মারছে। রফিক ভাই তো মারাই গেছে এ কথা বলছে, আমরা তো সবাই হাউহাউ করে চিত্কার করছি সবাই। আব্বা তো ছুটে বের হয়ে গেলেন। আমি ঘরের মধ্যে বসে আছি। চিত্কার করে কাঁদছি। হয়েছে কি, সেদিনের ঘটনাটা আমরা যখন পৌঁছলাম তার আগে কয়েকদিন তো রফিক ভাই জিতছেন।

তার জীবনের লক্ষ্য যে তিনি এমপি হবেন, এমপির নমিনেশন পাবেন। চিন্তা করতে পারেন নাই। আর বয়স তো মাত্র খুব হার্ডলি ২১/২২/২৩ হবে। তিনি তখন ঐ পরিতোষ নামে আমাদের একজন ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। পরিতোষ নাম তার সঙ্গে তিনি ঘুরছিলেন আর কি। তিনি খবর নিচ্ছিলেন যে কখন আমরা ফিরব।

তিনি জানেন যে, আজকে ফিরব আমরা। তো আমরা ফিরছি ঐসময় তিনি আসেন নাই। কিছুক্ষণ পরে আসছেন, এসে দেখেন যে দরজা বন্ধ। লাইট বন্ধ দেখছেন। এত রাতে আর ঢুকব না। বাসায় আসছিলেন তিনি।

বাসায় গেটে এসে তিনি খবরটা দেবেন আমাদের। আমি জিতেছি, এমপি হয়েছি। আব্বা আমাদের সবাইকে আনন্দের খবরটা দেবেন তিনি। এ খবরটা তিনি বাসায় না দেখে, দেখছেন বাড়ির মধ্যে ঢুকছি আমরা আটকাইছি। তখন তিনি আর ভেতরে ঢোকেন নাই। না রাতে না সকালে আসব—এ কথা বলে তিনি চলে গেলেন। পরে প্রত্যক্ষদর্শীর কাছে শুনেছি।

তার বাসার কাছে যেতে দুই মিনিট বা তিন মিনিট লাগে। ওখানে তিনি বাসার মধ্যে ঢুকতে গেছেন যখন গেটে। ঐ টিপু বিশ্বাসের লোকই নকশাল। দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, যেই ঢুকছেন গেটের মধ্যেই চাকু মেরেছে। সঙ্গে সঙ্গে পড়ে গেছেন তিনি এবং ওটা প্রতিহিংসায়, এরা জিতল। তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিল। আমরা তো শুনলাম এই ঘটনা। শোনার পরে চিত্কার করে সঙ্গে সঙ্গে গেলাম পড়ে, হাসপাতালে নিচ্ছে পরে মারা গেছেন। যা হয় আর কি। রাতের মধ্যে খবর পেয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু। রাত কীভাবে গেছে জানি না, আমরা শহরের লোক নেমে গেছি। ওখানে আসছে। এই রকম একটা ছেলেকে মেরে ফেলল। তার পরের দিন সকালবেলা আমরা খবর পেলাম যে বঙ্গবন্ধু পাবনা আসছেন।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তোফায়েল ভাই ছিলেন, আরো অনেক নেতারা ছিলেন। তাজউদ্দীন সাহেব ছিলেন অনেকে ছিলেন। তাদের বিরাট একটা বহর নিয়ে। বঙ্গবন্ধু তখন তো ফিউচার প্রাইমিনিস্টার। পুরা সিকিউরিটি নিয়ে এসেছেন। বঙ্গবন্ধু প্রথমে গেছেন রফিক ভাইয়ের বাসায়। ওর ফ্যামিলির সঙ্গে দেখা করেছেন। তার পর আমাদের বাসায় এসেছেন।

বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন, রফিককে নমিনেশন দিলাম আর ওকে মেরে ফেলেছে। তার পর বিকালে একটা বিরাট জনসভা। বিশাল জনসভা। সে জনসভায় বঙ্গবন্ধু পাঁচ-ছয় মিনিট বক্তৃতা দিয়েছিলের। জ্বালাময়ী বক্তব্য দিলেন। এই কথাটা এজন্যই বললাম, একজন নেতা ছুটে এসেছেন কর্মী মারা গেছে তা শুনে; ঐদিন টুয়েন্টি ফোর আওয়ারের মধ্যে তিনি ছুটে এসেছেন পাবনায়। ফ্যামিলির সঙ্গে দেখা করেছেন, প্রতিবাদ সভা করেছেন। এই হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি আমার জীবনে অনেক আছে। কত স্মৃতি যে আছে বলে শেষ করা যাবে না। দু-একটা স্মৃতি এজন্যই বললাম বঙ্গবন্ধুর আমাদের প্রতি, কর্মীদের প্রতি তার যে ভালোবাসা স্নেহ, এটা অতুলনীয় ছিল। আর সবচেয়ে কষ্ট লাগে যে বঙ্গবন্ধুর যে বক্তব্য, বঙ্গবন্ধুর যে সংগঠনের প্রতি, কর্মীদের প্রতি তার যে দরদ, এটা কিন্তু কেউ ভুলতে পারে না।

সে বঙ্গবন্ধুর ১৭ই মার্চে তার শুভ জন্মদিনে আমি শুধু এটাই বলতে চাই। আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী পালন করতে পারছি। আরেকটা দুঃখ থাকবে চিরদিনই, বঙ্গবন্ধুকে আমরা হত্যা করেছি।

তবে আমাদের স্বস্তি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নেতৃত্বে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সাহস অর্জন করেছেন, ধারণ করেছেন। এটা হচ্ছে তার কৃতিত্ব। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আজকে বঙ্গবন্ধুর মতোই সাহস ধারণ করেছেন বলেই আজকে তিনি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করতে পারছেন।

অনুলিখন :কে এম মাহ্ফুজুর রহমান মিশু

 

লেখক : আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য

ও সাবেক মন্ত্রী