আলমগীর সাত্তার (বীরপ্রতীক)
পিআইএতে আমাদের দুজন পাইলটের নাম ছিল আলমগীর। আমি আলমগীর সাত্তার এবং অন্যজন আবু তারেক আলমগীর। আমাকে ডাকা হতো ক্যাপ্টেন সাত্তার বলে। আবু তারেক আলমগীরকে ডাকা হতো ক্যাপ্টেন আলমগীর নামে। তিনি আমার চেয়ে চাকরিতে সিনিয়র ছিলেন। কিন্তু বয়সে নিশ্চই না। কারণ আমি তার চেয়ে বেশি বয়সে চাকরিতে যোগদান করেছিলাম। ক্যাপ্টেন আলমগীর থাকতেন মহাম্মুদপুরের স্যার সৈয়দ আহমেদ রোডের একটি বাসায়। বাসাটা ছিল আমাদের বন্ধু ক্যাপ্টেন হালিমদের। বেশ বড়ো একটি বাসায় একাংশ ভাড়া নিয়ে ক্যাপ্টেন আলমগীর তার স্ত্রী এবং এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে ঐ বাসায় থাকতেন। ক্যাপ্টেন আলমগীরের বাবার নাম ছিল ক্যাপ্টেন (অব.) শাহাজাহান। পুরোনো ঢাকা শহরের জিন্দাবাহার লেনে তিন সাড়ে তিন বিঘা জমির ওপর খুব সুন্দর একটি দোতালা বাড়ি ছিল। ক্যাপ্টেন আলমগীর ছিলেন তার পিতামাতার একমাত্র পুত্র সন্তান। সম্পর্কের তিক্ততার কারণে আলমগীর পিতার বাসা ছেড়ে বসে সহান্নীদপুরে বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন আলমগীরের বাবা বঙ্গবন্ধুর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান হওয়ার পর যখন প্রথম ঢাকায় আসেন তখন তার অবস্থান করার মতো ঢাকা শহরে কোনো ভালো হোটেল ছিল না। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের থাকার মতো সুন্দর বাড়ির সংখ্যাও তখন ঢাকা শহরে খুব কমই ছিল। তাই ক্যাপ্টেন শাহজাহান অর্থাত্ আলমগীরদের বাসায়ই সোহরাওয়ার্দী সাহেবের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে সময় তথ্য বঙ্গবন্ধুই লিখে গেছেন।
সময়টা ১৯৬৯ সাল : আমরা পিআইএর কয়েকজন বঙ্গবন্ধু ভক্ত পাইলট তখনকার দিনে সন্ধ্যার পর ক্যাপ্টেন আলমগীরের মহাম্মদপুরের বাসার চিলেকোঠায় প্রতিদিন রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত আড্ডা দিতাম। এই আড্ডা দেয়া পাইলটের সংখ্যা ছিল আট-নয় জন। ঐ বাসায় চিলেকোঠে ছিল যথেষ্ট বড়। আট দশকের আড্ডা দেয়ার মতো পরিসর ছিল। ওখানে একখানা চৌকি ছিল যেটায় ক্যাপ্টেন মফিকুল ঘুমাত। ছিল একটি টেবিল। পানীর বোতলভর্তি একটি আলমারি। প্রতিদিন আমরা ঘণ্টাখানেক সময় অ্যারোপ্লেনের টেকনিক্যাল বিষয়ে আলোচনা করতাম। আমাদের প্রতিজ্ঞা ছিল কে পশ্চিম পাকিস্তানি পাইলটদের চেয়ে ফ্লাইং দক্ষতায় অনেক ভালো এবং টেকনিক্যাল বিষয়ে আমরা অধিকতর জ্ঞানসম্পন্ন। তারপর শুরু হতো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ। আমাদের বিচার-বিশ্লেষণ অনুযায়ী আমরা সিদ্ধান্ত পৌঁছাই সে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনশোষণের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে একটি সময় তাদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেই হবে। যুদ্ধ শুরু হলে আমরা যে ভারতের সাহায্য পাব এ বিষয়ে আমাদের সন্দেহ ছিল না। ভারত তার উত্তর পূর্বে রাজ্যগুলো রক্ষার্থে আমাদের সাহায্য করতে বাধ্য হবে। পাকিস্তান ভারতীয় নাগা খিজ্যে বিদ্রোহীদের পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয় এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসাররা ঐসব বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল সবতথ্য ভারতীয়দের জানা ছিল।
ক্যাপ্টেন আলমগীরের বাসার চিলেকোঠায় আমরা যে কজন পাইলট আড্ডা দিতাম তাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগ ছিল। আমাদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদ ছিল। ক্যাপ্টেন আলমগীর ক্যাপ্টেন রফিউল হক ক্যাপ্টেন শাহাবউদ্দিন ক্যাপ্টেন আকরাম আহমদ এবং আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে জানিয়ে এসেছিলাম আমরা তার নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করব। একথা জানিয়ে এসেছিলাম সেই ১৯৬৯ সালে। আমরা পিআইএর পাইলট অ্যাসোসিয়েশন থেকে আলাদা হয়ে বাঙালি পাইলটদের আলাদা অ্যাসোসিয়েশন সংগঠিত করেছিলাম। আমরা আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের আলাদা রেজিস্ট্রেশনও নিয়েছিলাম। তেজগাঁও আওলাদ হোসেন মার্কেটের নিকট তেজগাঁও রেস্টহাউজের পুরো দোতলা ভাড়া নিয়ে আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের অফিস ঘর করলাম। ঐ অফিস ঘর ছিল পিআইএর সব বাঙালি কর্মচারি কর্মকর্তাদের জন্য উন্মুক্ত। ঐ অফিসের মাধ্যমে আমরা পিআইএর সব কর্মচারীকে আমাদের দেশের স্বাধীনতার পক্ষে একত্রিত করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু মহাম্মদপুরের চিলেকোঠার বিষয়টা ছিল একান্ত গোপনীয়। পিআইএর সব পাইলটকে আমরা বিশ্বাস করতাম না। পিআইএর সিনিয়র পাইলটদের মধ্যে অনেকে ছিল পাকিস্তানের দালাল। এ জন্য চিলেকোঠার সদস্যপদে কাউকে গ্রহণ করা হতো না। তবে দুজন সিনিয়র পাইলট চিলেকোঠার সদস্য না হয়েও ছিলেন আমাদের উপদেষ্টা। আমাদের সে কি উদ্দেশ্য তা তারা জানতেন।
১৯৬৯ এর পর থেকে বঙ্গবন্ধু জনপ্রিয়তা এবং বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে জনমত ক্রমেই বেড়ে চলছিল। ১৯৬৯ এর পর সে সফরের গণআন্দোলন ৭০ সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস এবং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের এ বিষয়ে নির্লিপ্ততা বঙ্গবন্ধুর বজ কণ্ঠ সব মিলে আওয়ামী লীগ দলটির জনপ্রিয়তা আমাদের কল্পনা শক্তিকেও হার মানাল। ১৯৭০ এর পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে পূর্বপাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত সংসদ সদস্যের মধ্যে ৯৯ শতাংশ আসনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। প্রায় অসম্ভব এমন ঘটনা ঘটবে তা পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো রাজনীতিবিদ অথবা গোয়েন্দা সংস্থাও ভাবতে পারেনি। ৯৯ শতাংশ আসনে জয়লাভ! পাকিস্তানিরা কেন আমরাও ভাবতে পারিনি। আমেরিকার তখনকার কন্সাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের বইয়ে পড়েছি বিদেশি কূটনীতিবিদদের অনুমান ছিল আওয়ামী লীগ পূর্বপাকিস্তানে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ আসনে জয়লাভ করবে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের ঐ দিনের কথা আমি কোনো দিন ভুলব না। সন্ধ্যার পর আমি চট্টগ্রাম থেকে ফকার ফ্রেন্ডশিপ প্লেনের ফ্লাইট নিয়ে ঢাকায় আসছি লাম। ককপিটে বসে প্লেনের রেডিওর মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফলের খবর শুনছিললাম। খবর ছিল শুধু আওয়ামী লীগের জয় জয়কার। তখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কত আসনে জয়ী। বিরোধী দলগুলো একটি আসনেও জয়ী হয়নি। আমি ভাবছিলাম বিরোধী দলগুলো কি একটি আসনও পাবে না। রাত ১০টায় ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম এবং ক্যাপ্টেন আলমগীরের বাসার চিলেকোঠায় একটু ঢু মেরে যাওয়ার কথা চিন্তা করলাম। ওখানে গিয়ে দেখলাম ক্যাপ্টেন আলমগীর শাহাব আকরাম মফিদুল ইসলাম এনারা যথারীতি ওখানে আছেন। নির্বাচনের ফলাফল তখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ দেড়শ আসনে জয়ী। চিলেকোঠায় তখন আনন্দের জোয়ার এবং একই সঙ্গে পানীয়র জোয়ার বয়ে যাচ্ছিল। আমি ইউনিফর্ম থেকে অ্যাপুলেট খুলে পকেটে রেখে জয় বাংলা বলে একটি পানীয় ভর্তি গ্লাস হাতে তুলে নিলাম। ঐ সময় পানীয় ভর্তি গ্লাস হাতে তুলে চিয়ার্স না বলে আমরা জয়বাংলা বলতাম।
১৯৭২ সালের ১০ জানুযায়ী বঙ্গবন্ধু তারই সৃষ্ট স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এলেন। ৭২ সালের ১৬ জানুয়ারি ক্যাপ্টেন শাহাবউদ্দিন এবং আমি ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের একটা বাড়িতে দুপুর বেলা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমরা বঙ্গবন্ধুর বাসায় পৌঁছেছিলাম বেলা দেড়টার বা দুটোর সময়। বঙ্গবন্ধু তখন দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। তার খাওয়া তখন শেষ। শাহাব এবং আমাকে দেখে হাসিতে মুখ উদ্ভাসিত করে তিনি বললেন, ব্যাটা তোরা তবে বেঁচে আছিস। তার পরেই জিগ্যেস করলেন, আলমগীরের খবর। যদিও তিনি আমাকে আলমগীর বলেই ডাকতেন, তবু বুঝতে অসুবিধা হয়নি ওই দিন তিনি ক্যাপ্টেন আলমগীরের কথাই জিগ্যেস করেছিলেন। হয়তো তিনি মনে করলেন, শাহাব আর আমি তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি তবে আলমগীর সঙ্গে নেই কেন? বললাম, পাকিস্তানিরা ক্যাপ্টেন আলমগীরকে হত্যা করেছে। পাকবাহিনী আরো তিন জন বাঙালি পাইলটকে হত্যা করেছে। ক্যাপ্টেন সেকেন্দর আলী, ক্যাপ্টেন আমিরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন এন এস হায়দারকেও হত্যা করেছে। বঙ্গবন্ধু তাদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। বঙ্গবন্ধু শাহাব ও আমাকে প্রশ্ন করলেন ভাত খাবি। আমি বললাম যুদ্ধের নয় মাস আমরা তো যুদ্ধক্ষেত্রেই ছিলাম। আমি বাসায় না যাওয়া পর্যন্ত আমার বউ আমার জন্য না খেয়ে অপেক্ষা করে থাকবে। বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে বসতে বলে হাত ধোয়ার জন্য খাবার টেবিল ছেড়ে চলে গেলেন। আমি আর শাহাব খাবার টেবিলেই বসে রইলাম।
ওই সময় বঙ্গমাতা বেগম মুজিব খাবার ঘরে এলেন। দেখেই বুঝলাম তিনি এইমাত্র স্নান সেরে এসেছেন। তার হাতে নারকেল তেলের একটা বোতল ছিল। শীতের দিন বলে বোতলের তেল জমে গিয়েছিল। একটা কাঠি দিয়ে বেগম মুজিব ঠান্ডায় জমে যাওয়া তেল বের করার চেষ্টা করছিলেন। এরকম দৃশ্যের সঙ্গে ছোট্টবেলা থেকেই আমি পরিচিত। শীতকালে আমার মাও ঠান্ডায় জমে যাওয়া নারিকেল তেল কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বোতল থেকে বের করতেন। মাত্র কয়েক দিন আগে ১৯ ডিসেম্বর আমি কলকাতা থেকে কামালের খবর জানাতে ধানমন্ডির ২০ নম্বর রোডের বাসায় বেগম মুজিবের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। কলকাতার দমদম বিমানবন্দরে বসে কামালই আমাকে বলে দিয়েছিল ঢাকায় গিয়ে মাকে বলবেন যে আমি ভালো আছি। কামাল ছিল জেনারেল ওসমানীর এডিসি আর আমি ছিলাম ওসমানী সাহেবের প্লেনের পাইলট। ১৯ তারিখ দেখেছিলেন বলে বঙ্গমাতা বেগম মুজিব আমাকে সহজেই চিনতে পারলেন। আমাকে জিজ্ঞেসা করলেন, আমার মা-ভাই-বোন কেমন আছে। আমি দেখলাম তখন সময়ের সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর এবং তার সহধর্মিণী বঙ্গমাতার সহজ জীবনযাপনের ধারা। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু এসে গেলেন। তিনি শাহাব ও আমার কাছে অনেক কিছুই জানতে চাইলেন। আমরা বিনা সংকোচে যতটুকু জানতাম সবকিছু বললাম। তার অবতর্মানে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের এবং অন্যদের সম্পর্কেই জানতে বেশি আগ্রহী ছিলেন তিনি। আমি আমার লেখা দীর্ঘায়িত করতে চাই না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দেশে কী কী ঘটেছে তাতো তো সবারই জানা। ওইসব সামলে দিয়ে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে বঙ্গবন্ধু পুনর্গঠিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। তিনি যখন সফলতার দ্বারপ্রান্তে তখনই সপরিবারে তাকে হত্যা করা হলো। কারা হত্যা করল তারা তো বাঙালি।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে জিয়াউর রহমান এরশাদ সাহেব উনারা বাংলাদেশকে বারবার পাকিস্তান বানাবার চেষ্টা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অলৌকিকভাবে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বেঁচে যাওয়ায় সেটা আর তারা পারেননি। শেখ হাসিনাকেও আমি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তারই সুযোগ্য নেতৃত্ব এবং অদম্য মনোবলের জন্য ফিনিক্স পাখির মতো আওয়ামী লীগ দলটি জেগে উঠেছে। সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। শেখ হাসিনার বড়ো গুণ হলো, বঙ্গবন্ধুর মতোই তিনি অতি দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন এবং সংকটময় মুহূর্তে স্বচ্ছ দৃষ্টির কারণে সমস্যার সমাধানে করতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর মতোই বিপদের মাঝে মানের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন। আমি আমার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিশ্চিত হয়েছি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত বাংলাদেশ পৃথিবীতে একটি গৌরবময় দেশ বলে পরিচিত হবে। এদেশে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে যারা ধ্বংস করতে চেষ্টা করবে তারাই ধ্বংস হয়ে যাবে।
লেখক : সাবেক ক্যাপটেন