র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, এমপি
As a man, what concerns mankind concerns me. As a Bengalee, I am deeply involved in all that concerns Bengalees. This abiding involvement is born of and nourished by love, enduring love, which gives meaning to my politics and to my very being.
Sheikh Mujibur Rahman. 30.05.73
‘(একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উত্স ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।) (অসমাপ্ত আত্মজীবনী) ওপরে বঙ্গবন্ধুর লেখার যে উদ্বৃতি দেওয়া হলো তাতে তার জীবনাদর্শ ও রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি আপাদমস্তক একজন বাঙালি এবং একই সঙ্গে একজন মানবতাবাদী। তার বাঙালিত্ব তথা জাতীয়তাবাদ মানবতাবাদের দ্বারা পরিপুষ্ট। তিনি বাঙালির জাতিসত্তার ধারক-বাহক হলেও অন্যান্য জাতিসত্তার বা জাতিগোষ্ঠীর বিরোধী নন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকারকে তিনি যেমন স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন, তেমনি পৃথিবীর সকল জাতিসত্তা ও জাতিগোষ্ঠীর অধিকারের প্রতিও সমর্থন দিয়ে গেছেন। তার ঘোষিত বাঙালির বাঁচার দাবি ৬ দফা যেমন করে বাঙালির মুক্তির লক্ষ্যে পরিচালিত ছিল, তেমনি তিনি ৬ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে পাকিস্তানের অন্যান্য জাতিসত্তা সিন্ধী, বালুচ ও পাখতুনদের জন্যও স্বায়ত্তশাসন চেয়েছেন। তার জাতীয়তাবাদ তাই সদার্থক, নঞর্থক নয়। তার জাতীয়তাবাদ তাই মানবতাবাদী। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি বিশ্ব মানবতাবাদেও বিশ্বাসী ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে ১৯৭৪ সনে প্রদত্ত (জাতিসংঘে বাংলা ভাষার প্রথম ভাষণ) অভিভাষণেও বিশ্ব মানবতার প্রতি বাঙালির জাতি রাষ্ট্রের তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদে অঙ্গীকারের কথা সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন : ‘প্রিয় প্রেসিডেন্ট, সর্বশেষে আমি মানবের অসাধ্য সাধন ও দুরূহ বাধা অতিক্রমের অদম্য শক্তির প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থার কথা আবার ঘোষণা করতে চাই।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে প্রদত্ত তার এই অভিভাষণে মানবতার প্রতি তার এবং জনগণের আস্থার কথা এবং মানবের অপরিমেয় ক্ষমতার প্রতি বিশ্বাসের কথা ব্যক্ত করেছেন। এতে করে জাতীয়তাবাদ ও মানবতাবাদকে বঙ্গবন্ধু তার জীবন দর্শন হিসেবে বিশ্বসভায় উপস্থাপন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনে তাই সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মান্ধতার কোনো স্থান নেই। কিন্তু কালের পরিক্রমায় আজ বঙ্গবন্ধুর দর্শন আর আদর্শকে অনেকেই বিকৃত করে উপস্থাপন করার কাজ করে যাচ্ছেন। এক দল বঙ্গবন্ধুকে ডানপন্থি হিসেবে একদল বামপন্থি হিসেবে উপস্থাপনে ব্যতিব্যস্ত। অথচ বঙ্গবন্ধু ছিলেন নির্ভেজাল জাতীয়তাবাদী ও মানবতাবাদী। বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে তিনি যেমন ছিলেন আপসহীন ও দৃঢ়সংকল্প, মানুষের কল্যাণেও তিনি ছিলেন সুদৃঢ় লড়িয়ে। গণতন্ত্রের প্রশ্নেও তিনি ছিলেন আপসহীন লড়াকু। তবে সর্বোপরি মানুষের কল্যাণ কামনায়ই তিনি তার জীবন দর্শন গড়ে তুলেছিলেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আপাদমস্তক ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি অনুসরণ করেছেন। সাম্প্রদায়িকতার কালো হাত তাকে কখনো ছুঁয়নি। যেহেতু তিনি ছিলেন কট্টর মানবতাবাদী সেহেতু তিনি সাম্প্রদায়িকতাকে ঘৃণা করতেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের অপব্যবহার দেখে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কীভাবে ধর্মের নাম ব্যবহার করে শোষণ, নির্যাতন আর বিভেদ তৈরি করে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হতো তিনি তা পাকিস্তানের রাজনীতিতে দেখেছেন বলেই রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় ‘চিন্তা করবেন না, আমি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিষ্টান বলে কিছু নাই। সকলেই মানুষ।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, চন্দ্র ঘোষ প্রসঙ্গ। পৃষ্ঠা# ১৯১ দ্রষ্টব্য)। তিনি বলছেন ঃ ‘সাম্প্রদায়িক রাজনীতি.... ক্ষতিকর এ কথাও সে স্বীকার করল। (প্রসঙ্গ বরিশালের মহিউদ্দিন সাহেব, পৃষ্ঠা ১৯৩ দ্রষ্টব্য)।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনসংগ্রামই হচ্ছে তার আদর্শ। মানুষের জন্য, বাঙালির জন্য তার যে সংগ্রাম, যে সংগ্রামের চূড়ান্ত ফলাফল আমরা পাচ্ছি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায় এবং ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত, বিজ্ঞানমনস্ক এক আধুনিক সোনার বাংলার লক্ষ্য নির্ধারণের মধ্যে আমরা তার আদর্শের মূর্ত প্রতিফলন দেখতে পাই। জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্র এই নীতি চতুষ্টয়ের মধ্য দিয়ে তার দর্শন পরস্ফুিট হয়ে উঠেছে। আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী বলে নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরি, বঙ্গবন্ধুর চার নীতির বাইরে পথ চলার তাদের কোনো সুযোগ নেই। সাম্প্রদায়িকতাকে তিনি ঘৃণা করতেন। সে কারণে ধর্মান্ধদের কাছ থেকে, সাম্প্রদায়িকদের কাছ থেকে তাকে অনেক অপবাদই সহ্য করতে হয়েছে। ভাষার প্রশ্নে, সংস্কৃতির প্রশ্নে, রবীন্দ্রসংগীতের পক্ষে, বাঙালির অধিকারের পক্ষে যখনই তিনি সোচ্চার হয়েছেন, তখনই তাকে ইসলামের শত্রু, ধর্মের শত্রু, মুসলমানের তমুদ্দুনের শত্রু এবং সর্বোপরি দেশের শত্রু আখ্যা দিয়ে তার রাজনীতিকে ধ্বংস করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে বারবার। কিন্তু কোনো অপবাদই তাকে আদর্শ ও লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। তিনি অবিচল লক্ষ্য নিয়ে আদর্শের সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তার আদর্শ থেকে বিচ্যুতির অর্থই হচ্ছে বাংলাদেশের আদর্শকে গুঁড়িয়ে দিয়ে পাকিস্তানের নষ্ট আদর্শের রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া। আমাদের বুঝতে হবে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি সবাইকে বুঝতে হবে। পাকিস্তানি জাতীয়তার বিপরীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, স্বৈরশাসনের বিপরীতে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা, ধর্মান্ধতার বিপরীতে অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মরাষ্ট্রের বিপরীতে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র আর শোষণের বিপরীতে শোষণহীন এক সমাজ—এই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের দর্শন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তা তথা রাষ্ট্রদর্শন। যারা মুজিবাদর্শে বিশ্বাসী, তাদের এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার চিন্তা ও আদর্শ অনুসরণ করেই আমাদের এগোতে হবে। অন্য ভাবনায় যাওয়ার কোনো পথ নেই, সুযোগও নেই। আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে বড়ো পথ হচ্ছে তার আদর্শে পথ চলা। একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তার স্বপ্ন-সাধনা। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে তার আদর্শ অনুসরণই একমাত্র পথ। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখক : সংসদ সদস্য