রামেন্দু মজুমদার
বঙ্গবন্ধু আজ বেঁচে থাকলে তার বয়স ১০০ বছর হতো। কিন্তু আমাদের হূদয়ে আঁকা আছে তার পঞ্চান্ন বছর বয়সের সেই ছবি—সত্যিকার অর্থে যিনি ছিলেন সুপুরুষ। তেজোদীপ্ত, শালপ্রাংশু, প্রচণ্ড আস্থাশীল এক মহান পুরুষ। বাঙালির অনেক সুকৃতির ফলে তার মতো একজন নেতার জন্ম হয়েছিল আমাদের দেশে, যিনি আমাদের মাঝ থেকে উঠে এসে আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এবং লক্ষ্যে অবিচল থেকে ধীরে ধীরে বাঙালিকে পৌঁছে দিয়েছেন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে। পৃথিবীর খুব কম নেতাই তাদের সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয় দেখে যেতে পেরেছেন। সেদিক থেকে বঙ্গবন্ধু ভাগ্যবান, আবার চরম দুর্ভাগ্য ছিল তার—আপন দেশের মানুষের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছিল তাকে। নেতৃত্বের অসাধারণ গুণাবলির বাইরে ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু ছিলেন উদার, অসাম্প্রদায়িক, সংস্কৃতিমনা ও গরিবের প্রতি সহানুভূতিশীল। আমরা মুখে অনেকেই অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলি, কিন্তু জীবনাচরণে তার উলটোটা লক্ষ করি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য তার নির্ভীক ভূমিকা আমার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে রয়েছে।
১৯৭১ সালের ২৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান সংগীতশিল্পী সমাজের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘দেশের গণমুখী সংস্কৃতিকে বিকশিত করার উদ্দেশ্যে সাহিত্য-সংগীতে কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখকে প্রতিফলিত করতে হবে। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। তাই মাটি ও মানুষকে কেন্দ্র করে গণমানুষের সুপ্ত শক্তি ও স্বপ্ন এবং আশা-আকাঙ্ক্ষাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠবে বাংলার নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতি। আপনারা ভালোবাসা ও শান্তির অনেক গান গেয়েছেন। আজ বস্তির নিঃস্ব সর্বহারা মানুষের জন্য গান রচনার দিন এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মতো বিপ্লবী গান গাইতে হবে। মানুষের মনে প্রেরণা জোগাতে হবে। যদি এতে বাধা আসে, সেই বাধা মুক্তির জন্য ৭ কোটি বাঙালি এগিয়ে আসবে।’
সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য তার সহমর্মিতার দুটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করতে চাই। ১৯৭৪ সালে বন্যার সময় আমরা থিয়েটার থেকে ‘এখন দুঃসময়’ অভিনয় করে যত দূর মনে পড়ে ২ বা ৩ হাজার টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দিতে গেছি। বঙ্গবন্ধু খুব খুশি হয়ে আমাদের এ সামান্য দান গ্রহণ করে আমাদের অফিস প্রয়োজন কি না, জানতে চাইলেন। আমরা ভাবলাম, এখন নতুন দেশে সরকারের কত কিছুর প্রয়োজন, এই সময়ে আমাদের অফিসের জন্য বাড়ি না হলেও চলবে। তাই তাকে আপাতত প্রয়োজন নেই বললাম। তার কত দূরদৃষ্টি ছিল আর আমাদের তার অভাবের কথা ভেবে এখন আফসোস করি। এখন দলের জন্য বা থিয়েটার স্কুলের জন্য একটা স্থায়ী ঠিকানার সন্ধানে দ্বারে দ্বারে ঘুরছি।
দ্বিতীয় ঘটনাটি আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু গেছেন রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের নতুন ভবন পরিদর্শনে। অভ্যর্থনাকারীদের সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন তরুণ প্রযোজক আবদুল্লাহ আল-মামুন। তাকে দেখে বঙ্গবন্ধু দুই হাত মামুনের গালে ধরে আদর করে জিগ্যেস করলেন, ‘কি, তোমাদের নাটক কেমন চলছে?’ সে সময় কিন্তু প্রমোদ কর ও সেন্সরশিপের আইন কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ করার কারণে ঢাকায় নিয়মিত নাট্যচর্চা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মামুন জবাব দিলেন, ‘আপনি তো নাটক বন্ধ করে দিয়েছেন।’ বঙ্গবন্ধু কারণ জানতে চাইলে মামুন এ দুটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করলেন। পাশে দাঁড়ানো ছিলেন অর্থমন্ত্রী ড. এ আর মল্লিক। তাকে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘কি মল্লিক সাহেব, নাটকের লোকেদের কাছ থেকে টাকা না নিলে কি আমার সরকার চলবে না?’ বঙ্গবন্ধু পরদিনই মামুনকে তার সঙ্গে দেখা করতে বললেন। আমি আর মামুন সে অনুযায়ী গণভবনে গিয়ে হাজির হলাম। আমাদের বন্ধু ড. ফরাসউদ্দীন ছিলেন তখন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব। ফরাসভাইকে ডেকে বঙ্গবন্ধু বললেন, আজই রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করে দাও যে এখন থেকে শৌখিন নাট্যদলগুলোকে কোনো প্রমোদ কর দিতে হবে না। আর সেনসর পুলিশের বদলে শিল্পকলা একাডেমিতে একটি নাটক সেন্সর কমিটির মাধ্যমে হবে। মন্ত্রণালয়ে পাঠালে জটিলতা হতে পারে উল্লেখ করে সরাসরি রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির কথা বললেন। তারপরই নাট্যচর্চার ওপর থেকে প্রমোদ কর উঠে গেল এবং নাটকের সেন্সর পদ্ধতি সহজতর হলো। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০০ সালে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা নাটকের সেন্সর আইন পুরোপুরি বাতিল করেন।
যারা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সাহচর্য পেয়েছেন, তারা নিশ্চয়ই বাংলা ভাষার জন্য, বাঙালি সংস্কৃতির জন্য বঙ্গবন্ধুর গভীর অনুরাগের অনেক কথা বলতে পারবেন। আজ বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে দেশের তো বটেই, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির যে প্রভূত অগ্রগতি হতো, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য বিশ্ব স্বীকৃতি অর্জন করেছিল আর জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় প্রদত্ত ভাষণের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সুখের কথা, বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরাধিকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ভাষা-সংস্কৃতির বিকাশে সমভাবে আগ্রহী। দেশে-বিদেশে আজ মর্যাদার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি এটা আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব