নূহ-আলম লেনিন
অরণ্যের আদিম অন্ধকার থেকে
সূর্যোদয়ের পথে চলতে চলতে চলতে
এই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে পদ্মা মেঘনা যমুনা করতোয়া মধুমতী কপোতাক্ষ
ব্রহ্মপুত্র ময়ূরাক্ষী ধানসিঁড়ি দামোদর ভাগীরথী কর্ণফুলীর কূলে-উপকূলে
সাগর সংগমে খুঁজেছি তোমাকে আমরা অনুক্ষণ
স্বপ্নে-জাগরণে হাজার বছর।
অঙ্গ বঙ্গ সমতট হরিকেল বরেন্দ্র রাঢ় গঙ্গা-ঋদ্ধির পথে প্রান্তরে
তোমাকে খুঁজেছি আমরা উয়ারী বটেশ্বর চন্দ্রকেতু গড় রাজমহল লালমাই গৌড়
আর পুণ্ড্রনগরে। স্বাধীনতা, আমাদের আত্মপরিচয়, আমাদের নিজস্ব ঠিকানা
আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বরাজ।
চলতে চলতে চলতে, খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে
কেটে গেছে সত্য দ্বাপর কলি যুগ।
এরপর আমরা ব্রাত্য নিষাদ জাতি
পাখির ভাষায় কথা বলি, গান গাই স্বপ্ন দেখি
মাতৃভাষা জ্ঞানে ভুসুকু ‘বঙালি ভইলি’। চর্যাপদ, ব্রজবুলি
সান্ধ্য ভাষার ছাঁচ ভেঙে খুঁজে পাই নিজস্ব ঠিকুজি—আমরা বাঙালি।
আমাদের এই দেশ এই মাটি আকাশের ছাদের সমান পাহাড়-পর্বত
শিরা-উপশিরার মতো অগণন নদী, দক্ষিণে সাগরের বিশাল বিস্তার
যেদিকে দুচোখ যায় আদিগন্ত সবুজ শস্যের ক্ষেত সমভূমি হাওর
বাঁওড় বিল অরণ্য-সুষমা মাছ পাখি হরিণ আর বাঘেদের অভয় অরণ্য
সব ছিল প্রকৃতির শোভা। ছিল বটে শ্রমের বৈভবে ঋদ্ধ শালপ্রাংশু
কিষান-কিষানি, কামার-কুমার-তাঁতি—সৃজনের নিপুণ কারিগর।
ছিল চাঁদবেনে, বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী, বাণিজ্যবহর, ছিল সরস্বতী
সোমপুর, বিক্রমপুর, ময়নামতি, চন্দ্রদ্বীপ, ...।
চর্যার গান ছিল, গীতগোবিন্দ ছিল, ভক্তির প্রাবল্য ছিল, ছিল প্রেমগীতি,
ছিল বৈষ্ণব শাক্তেরও সুর ছিল আউলবাউল ছিল, ছিল ভাটিয়ালি,
কবির লড়াই আর মারেফতি গম্ভীরার সুরের মূর্ছনা।
ছিল লোকগীতি, লালনের কথা-সুরে মানব বন্দনা।
ছিল পঞ্চকবির দলে রবীন্দ্র-নজরুল।
তবুও পাইনি খুঁজে সহস্র বছর আমাদের মানচিত্র আমাদের আপন স্বরাজ
আমাদের আত্মপরিচয়ের চিহ্ন আমাদের নিজস্ব পতাকা। বৈদিক কি আর্যতের
পাল সেন পাঠান মোগল আর শ্বেতাঙ্গ ইংরাজ বেনিয়া—সবাই বহিরাগত,
ছিল তারা যবন বিভাষী। একমাত্র দিব্যক, সহস্র বছরের ইতিহাসে ভূমিপুত্র,
ব্রাত্যজন আমরা নিষাদ জাতি, গর্বিত উত্তরাধিকার।
তারপর হাঁটতে হাঁটতে চলতে চলতে জঙ্গম ইতিহাস, গড়তে গড়তে গড়তে
ভাঙতে গড়তে ভাঙতে গড়তে ভাসতে ভাসতে রক্তের বন্যায়;
লড়তে লড়তে লড়তে ভাসতে ভাসতে খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে যাই
নতুন উপকূলে। নতুন সে মানচিত্র, নতুন পতাকা, রবীন্দ্রনাথের গানে নতুন ব্যঞ্জনা
আমাদের নিজস্ব ঠিকানা বাংলাদেশ; নিষাদ জাতির দেশ ইতিহাসে প্রথম স্বাধীনতা
প্রথম স্বরাজ আমাদের আত্মপরিচয়, আমরা বাঙালি।
আমাদের জাতি-রাষ্ট্র ব্রাত্যের সম্মান এনে দেন ভূমিপুত্র প্রথম বাঙালি,
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ অভিধায় আমাদের পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
দাস্যের লজ্জা ঘুচিয়ে এনে দেন প্রিয় স্বাধীনতা, মহিমান্বিত মনুষ্যত্ব,
ব্রাত্য নই, নই পরপদানত নিষাদ-নিন্দিত। এই তো বাংলাদেশ!
অভেদমন্ত্রে ঋদ্ধ আমরা বাঙালি মানুষের জয়গান গাই
‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’