ছোটোবেলা থেকে মেয়েটির কার্টুন পছন্দ। কার্টুন দেখতে দেখতে কাগজ-কলম হাতে নেওয়া। কার্টুন আঁকার চেষ্টা। বাবা-মা বলত, চেষ্টা কর। একদিন হবে। মেয়েটিও লেগে থাকত। একদিন সত্যিই ছবি হয়ে গেল। রাজ্যের মানুষের প্রশংসা। এই সফলতার গল্প কার্টুন আঁকিয়ে ফাতেমা আক্তার শান্তার। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী শান্তা। ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থাকলেও গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর। তিন ভাইবোন। সবার ছোটো সে। শান্তার প্রথম আঁকা ছবি ছিল একটা এনিম (Anime-জাপানিজ এনিমিশন কার্টুন)। এনিম বেশি আঁকেন। তবে পোর্ট্রেট (Portrait-মানুষের ছবি) ছবি কাগজে এবং ল্যান্ডস্কেপ ও ক্যালিগ্রাফি ছবি (পেন্টিং) ক্যানভাসে তার আঁকাআঁকি বেশ জনপ্রিয়। ফেসবুকে শান্তার পেইজের নাম ফেসবুক পেইজ ‘Kawai neko Artist’। এ পর্যন্ত তিনি তিনটি চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। তার মধ্যে অবস্কিউর আর্টিস্ট অব বাংলাদেশ, Alluring International Art Festival 2019, Anime Art Exhibition উল্লেখযোগ্য। ছবি আঁকার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দেন তিনি মাত্র চার বছর। এরই মধ্যে তার ঝুলিতে জুটেছে অসংখ্য পুরস্কার। ২০১৭ সালে প্রথম এনিমিক্যাস বাংলাদেশ এনিম কমিউনিটি আয়োজিত এনিম আর্ট কম্পিটিশনে পুরস্কার পান। ২০১৮ সালে এসিডি আয়োজিত কম্পিটিশনে প্রথম পুরস্কার পান। ২০১৯ সালে ঢাকা এমিনকন আর্ট কম্পিটিশনে অংশ নেন। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। একই বছরে এনিম আর্ট ফেস্ট অ্যান্ড এ্যাক্সিবিশনে তৃতীয় স্থান লাভ করেন তিনি। অবস্কিউর আর্টিস্ট অব বাংলাদেশ তাকে ছবি আঁকার জন্য পুরস্কৃত করে। এছাড়া Alluring International Winter Art Festival 2019, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকেও পুরস্কৃত হন। শান্তার ছবি দেশ-বিদেশে প্রশংসিত। ইনস্টাগ্রামে তার আঁকা ছবি দেখে বিখ্যাত Artist-Marie Santos মন্তব্য করেন, ‘I really like this, so creative’। আরেক বিখ্যাত আর্টিস্ট Musician Milla Sunde লিখেন, সত্যিই তোমার ছবি খুব সুন্দর। ছবি আঁকার ক্ষেত্রে শান্তা জল রং, পেন্সিল রং এবং এক্রিলিক রং ব্যবহার করেন। একটা ছবি আঁকতে শিল্পী যে পরিমাণ শ্রম দেন। তার সঠিক মূল্য পাওয়া যায় না। এটাই শান্তার আক্ষেপ। তিনি বলেন, মাঝে মাঝে ছবি বিক্রয়ের সঠিক দাম পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ সময় সঠিক দাম পাওয়া যায় না। ছবি আঁকার জন্য যে যে জিনিস লাগে এবং যে পরিমাণ শ্রম দিতে হয় সেটা অনেক ক্রেতাদের কাছে তুচ্ছ মনে হয়। আর্টিসদের ভালোবাসা দিয়ে আঁকা ছবি যখন দাম কষাকষি করে তুচ্ছ করে দেখায় তখন অনেক খারাপ লাগে।
শান্তা যে কেবল ছবি আঁকেন তা নয়। তিনি সমাজসেবামূলক কাজও করেন। বিবেক ফাউন্ডেশন, পথশিশু কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে তিনি গরিব, অসহায়, দুস্থদের জন্য কাজ করেছেন। ব্যক্তি উদ্যোগে ইফতার, ঈদের সময় কাপড় বিতরণ করেন বলে জানান। রাস্তার অবলা কুকুর, বিড়ালের প্রতি তার খুব মায়া। অসুস্থ কুকুর, বিড়াল দেখলেই নিয়ে আসেন। নিজ খরচে চিকিত্সা করান। এ পর্যন্ত প্রায় ৩৪টি অসহায় বিড়াল উদ্ধার করেছেন বলে জানান। নিজের আঁকা ছবি দিয়ে তিনি মানুষকে সচেতন করারও চেষ্টা করেন। সে রকমই একটি ছবি হলো, একটি মেয়ে কাচের বোতলে বন্দি। শান্তা বলেন, এই ছবির মূল বার্তা হলো যে, একটা মেয়ে কাচের বোতলে বন্দি। মেয়েটি নিজ থেকে কিছু করতে চায় কিন্তু সমাজের বাধাবিপত্তি মেয়েটিকে এমনভাবে বন্দি করে রেখেছে যেন তার জীবন একটি সীমাবদ্ধতায় আটকে আছে। সে তার নিজের ভেতরে দম বন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে। সবটুকু যত্ন, ভালোবাসা দিয়ে শান্তা ছবি আঁকেন। একবার ছবি আঁকা প্রায় শেষ। তখন অসাবধানতাবশত ছবিটি নষ্ট হয়ে যায়। এটিই শান্তার সবচেয়ে দুঃখের স্মৃতি বলে জানান। পরিবার তার বড়ো অনুপ্রেরণা। শান্তা জানান, বাবা-মাসহ সবাই উত্সাহ দেয়। তাদের কথা আরো শ্রম দাও এবং ছবি আঁকাকে পেশা হিসেবে নাও। ‘ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে শান্তা জানান, পড়াশোনা শেষ করে ছবি আঁকাটাকে পেশা হিসেবে নেওয়া তার ইচ্ছা। সে পথে তিনি বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছেন।