যানজটে হাঁসফাঁস রাজধানীবাসীর জীবন। জনাকীর্ণ সড়কে লম্বা গাড়ির লাইনের ফাঁকে থমকে যেতে চায় যেন সময়; সেই সময়গুলো অনেক সময় হয়ে দাঁড়ায় দুঃসহ। নগরীর এই যানজট কিছুটা হলেও নিরসনের উপায় হিসেবে তিনি শুরু করেন পার্কিং শেয়ারিং প্লাটফর্ম এপ্লিকেশন ‘নেক্সপার্ক’। আর সেই তিনি হলেন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পার্কিং শেয়ারিং প্লাটফর্মে প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ শাহরিয়ার খান। নেক্সপার্ক হলো এমন একটি এ্যাপ্লিকেশন, যার মাধ্যমে গাড়ি এবং মোটরবাইক ব্যবহারকারীরা খুব সহজেই পছন্দমতো সময়ে ও স্থানে নিজের গাড়িটি পার্ক করতে পারবেন।
শাহরিয়ার খানের জন্ম ঢাকার আজিমপুরে। সেখানেই কেটেছে তার শৈশব-কৈশোর। কম্পিউটার প্রকৌশলী হিসাবে স্নাতক শেষ করে শিক্ষকতা শুরু করেন প্রাইম ইউনিভার্সিটিতে। পরবর্তী সময়ে বাংলালিংক মেটাফোর সফটওয়্যার ও আইসিবি আইবিএল’র মতো করপোরেটে চাকরির অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নিজে সফটওয়্যার ফ্রিল্যান্সিং করতেন। একসময় দুই বন্ধু মিলে শুরু করেন লোকাল ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ। রায়ের বাজারের ছোট্ট একটি বাসায় কাজ শুরু করেন তারা। সেখানে গড়ে তোলেন আইটি টিম ‘নেক্স ক্রাফট লিমিটেড’। নেক্সপার্কের শুরুর দিকের কথা জানতে চাইলে শাহরিয়ার খান বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক আইডিয়া ছিল রাস্তার পাশের গাড়িগুলো যদি না থাকে তাহলে যানজট অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে মাথায় আসে ফাঁকা গ্যারেজের আইডিয়া। অনেকেরই তো গ্যারেজ সারাদিন ফাঁকা পড়ে থাকে। সকালে গাড়ি নিয়ে বের হলে অফিস বা কাজ থেকে না আসা পর্যন্ত খালি পড়ে থাকে সেই গ্যারেজগুলো। সেই গ্যারেজগুলোকে কাজে লাগিয়ে যানজট কমানোর প্রচেষ্টার ফল নেক্সপার্ক।’ নেক্সপার্কের কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যে সময়টুকু গ্যারেজগুলো খালি থাকে তখন সেগুলো নেক্সপার্কের মাধ্যমে ঘণ্টা, দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক হিসেবে ভাড়া দেওয়া যায়। এতে অতিরিক্ত কিছু আয়ও হতে পারে।’
নেক্সপার্ক মোবাইল অ্যাপটি সহজেই ডাউনলোড করে ইনস্টল করে নেয়া যায়। অথবা নেক্সপার্কের ওয়েবসাইট www.nexparc.com-এ গিয়েও ডাউনলোড করে নেওয়া যায়। যে কোনো জায়গায় এই অ্যাপ কাজে লাগিয়ে নিকটবর্তী কোথায় খালি গ্যারেজ আছে, সেটা জানা যায়। নিরাপত্তার জন্য গাড়ি ও গ্যারেজের প্রয়োজনীয় তথ্য নেক্সপার্কের ডাটাবেজে আছে। নেক্সপার্কে বিকাশ ও যে কোনো ব্যাংকের ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে পার্কিং চার্জ পরিশোধ করার সুযোগ আছে। তিনি বলেন, ‘শুধু ঢাকা নয়, দেশের বড় বড় শহরগুলোতে নেক্সপার্ক প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি। আমরা চাই যানজটমুক্ত সবুজ শহর।’
সমষ্টিগত কর্মপরিকল্পনার ব্যক্তিগত উদ্যোগ শাহরিয়ার খান এন্ট্রেপ্রেনিউরস ক্লাব অফ বাংলাদেশ নামে খুব ছোট আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত সংগঠন ‘ই-ক্লাব’(এন্ট্রেপ্রেনিউরস ক্লাব অব বাংলাদেশ)। যেখানে বর্তমানে ৩৫০’র অধিক উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি সামাজিক লক্ষ্যকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। বাবা শিক্ষক হবার কারণে বই পড়ার ও লেখার অভ্যাস তার ছোটবেলা থেকেই। উদোক্তা হিসাবে কাজ করতে যেয়ে শাহরিয়ার দেখলেন বইয়ের বাজারে বাংলা ভাষায় উদ্যোক্তা সহায়ক বইয়ের সংখ্যা কম। ২০১৯ সালে একুশে বইমেলায় অধ্যায়ন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় তার প্রথম বই ‘উদ্যোক্তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা’। বইটিতে তিনি একজন উদ্যোক্তার উদ্যোগী মনোভাবের গুণাবলি বিশ্লেষণ করেছেন। এবছরের বইমেলায় কলি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে শাহরিয়ারের দ্বিতীয় বই ‘বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেম ও ভবিষ্যত্’। বইটি উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেম নিয়ে প্রথম লেখা হলেও এখানে রয়েছে তার অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার সমাহার। সেইসঙ্গে রয়েছে সার্কভুক্ত দেশগুলোর ইকোসিস্টেম সম্পর্কে কিছু ধারণা।
শাহরিয়ার খান মনে করেন, একজন উদ্যোক্তা শুধু নিজে সফল হলে হবে না ,তার ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য ইকোসিস্টেম ডেভেলপমেন্টে নিজের কার্যকর ভূমিকা রাখা উচিত। আর সেই লক্ষ্যেই তার পথচলা।