তালেবান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি
তালেব রানা
গত দেড় যুগ ধরে চলছে আফগান যুদ্ধ। যে তালেবানদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বাহিনীর এই যুদ্ধ, সেই তালেবানরা একটু একটু করে আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। যদিও দেশটির শহর অঞ্চলগুলোতে এখনো নিয়ন্ত্রণ নেই তালেবানদের। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবান নেতৃত্ব এখন বুঝতে পারছে যে—এই যুদ্ধে কোনো পক্ষই নিরঙ্কুশ সামরিক বিজয় লাভ করতে পারবে না।
এই বোঝাপড়া থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়ে ছিলেন যে, তিনি আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে চান। তার এই নতুন নীতির কারণে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তালেবানের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে। দীর্ঘ ১৮ মাসের আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত গত ২৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তিতে পৌঁছেছে দুই পক্ষ।
চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো সহযোগীরা আফগানিস্তান থেকে আগামী ১৪ মাসের মধ্যে সব সেনা সরিয়ে নেবে। তবে এক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী তালেবানকে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। তালেবানরা সম্মত হয়েছে যে, সন্ত্রাসবাদের পথ থেকে তারা সরে আসবে। রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আফগান সরকার এবং তালেবানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তির পর তালেবানদের সঙ্গে আফগান রাজনীতিক, বিশেষ করে সরকারের আলোচনার পথ উন্মুক্ত হলো। তবে সেই আলোচনা কতটা সহজ হবে সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।
এই চুক্তিতে খুশি হয়েছে আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান। এই চুক্তিকে তারা স্বাগত জানিয়েছে। কাতারে এই চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মুহাম্মদ কোরেশি। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনার সময় এই শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতীকী ও ভাবার্থে আফগানিস্তান ও এর আশপাশের অঞ্চলের জন্য এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। তার মতে, আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও একত্রীকরণে এই শান্তি চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আশা করি, আফগানিস্তান এই ঐতিহাসিক সুযোগ গ্রহণ করবে এবং আশপাশের অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই শান্তি আনতে সমঝোতায় আসবে।
পাকিস্তানে আফগান শরণার্থীদের বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আফগান সরকারকে এই শরণার্থীদের পূর্ণ সম্মানের সঙ্গে দেশে ফিরে নেওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে সহযোগিতা করার ব্যাপারেও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, এই শান্তি চুক্তি করার ক্ষেত্রে পাকিস্তান তার দায়িত্বের অংশটি পূর্ণভাবে পালন করেছে। পাকিস্তান একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল, ঐক্যবদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ আফগানিস্তান গঠনে নিজেদের ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি স্থাপনে সমর্থন অব্যাহত রাখবে।
আলজাজিরার এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, তালেবান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়ার কথা পাকিস্তানের। এই চুক্তি দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য একটি বড়ো সুযোগ। নিবন্ধে বলা হয়, গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে তালেবান সন্ত্রাসীদের নির্মূল ও বহিষ্কারে পাকিস্তানের ওপর চাপ ছিল ওয়াশিংটন থেকে। কিন্তু পাকিস্তান এই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসানের জন্য। ট্রাম্প প্রশাসন যখন তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা জানিয়েছে, পাকিস্তান সরকার সেই সুযোগকে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে। দুই পক্ষের আলোচনায় তারা সহায়তা করেছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগামী নির্বাচনের প্রচারণাকে শক্তিশালী করেছে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর প্রথমবারের মতো পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মধ্যেকার দুই কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত এলাকায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ এসেছে। এ সীমান্তে নিরাপত্তা ও তেহরিক-ই-তালেবান জঙ্গিদের পরাজিত করছে পাকিস্তান তাদের সেনাবাহিনীর এক-তৃতীয়াংশ সেনা মোতায়েন করে রেখেছে। আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা ফিরলে পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও সেনা রাখার চাপ কমে আসবে। তবে সেক্ষেত্রে আন্তঃআফগানিস্তান আলোচনায় পাকিস্তানের সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রাখা উচিত।