এম এ আলআমিন
করোনা ভাইরাসের এপিসেন্টার মার্চের প্রথমদিকে চীন থেকে ইউরোপে সরে গেছে। প্রথমে ইতালি, তারপর একের পর এক ইউরোপের দেশগুলো ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইতালি। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা উভয়ই সেখানে সর্বোচ্চ। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ‘আমরা যুদ্ধাবস্থায় আছি।’ ব্রিটেনে সব স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন প্রতিদিন করোনা সম্পর্কে নিয়মিত সরকারি আপডেটের ব্যবস্থা করেছেন। জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মার্কেল একে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বলে অভিহিত করেছেন। একের পর এক লকডাউন হচ্ছে ইউরোপের সীমান্তগুলো।
বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর কারণ কি শুধুই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়া, না অন্যকিছু। সন্দেহ নেই ইউরোপে এবং সারা দুনিয়াতেই থেমে গেছে অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য। কিন্তু এটি ইউরোপের জন্য এর চেয়েও বাড়তি সমস্যা তৈরি করেছে। মানুষ ও পণ্যের অবাধ চলাচল ইইউর অন্যতম মূলনীতি। বলা যায় এটি ২৭ জাতি জোটের অন্যতম স্তম্ভ। করোনা প্রাদুর্ভাবের ফলে স্তম্ভটি প্রায় ধসে গেছে। প্রত্যেক দেশ নিজ সীমান্ত করে দিয়েছে বা দিতে যাচ্ছে। চিকিত্সা পণ্যসামগ্রী প্রত্যেক দেশ ইচ্ছামতো সংগ্রহ করলেও প্রতিবেশী দেশের জন্য সরবরাহ আটকে দিচ্ছে। ইইউ কমিশন প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন ১৭ মার্চ ঘোষণা করেন, ইইউর বহিঃসীমান্ত আগামী ৩০ দিনের জন্য বন্ধ থাকবে। ইইউ এই মুহূর্তে এমন কোনো অভ্যন্তরীণ সংকটে ছিল না যে, সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।
প্রায় ৪৫ কোটি জন অধ্যুষিত অঞ্চলটিতে নানা জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। আঞ্চলিক স্থিতি ও অগ্রগতির জন্য ঐক্য ধরে রাখতে অভিন্ন কিছু মূল্যবোধ বা মূলনীতি অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। অভিন্ন মূলনীতিগুলো ইইউর মধ্যে এতদিন পর্যন্ত মোটামুটি বজায় ছিল। মূল কথা হলো, জোট সদস্য সবাই মিলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে প্রয়োজনের সময় সবাই একসঙ্গে এগিয়ে আসবে। নিজ স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে সবার যৌথস্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং ‘দ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন: এ সিটিজেন্স গাইড’ বইয়ের লেখক ক্রিস বিকারটন মনে করেন, ‘করোনা পরিস্থিতি ইউরোপীয় মূল্যবোধকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে যে সদস্য দেশগুলোর সরকার এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নিজ নিজ জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। অভিন্ন ইউরোপীয় পরিচয়টি ক্রমাম্বয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।’
ইউরোপীয় মূল্যবোধ বা দৃষ্টিভঙ্গি যে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ঘটনা থেকে তা স্পষ্টত প্রতিভাত হচ্ছিল। করোনা ভাইরাসের বিস্তার এরই সর্বশেষ নজীর। ২০০৮ সালে ইউরোজোন সংকটের কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। সর্ব ইউরোপীয় সংহতি তখন বড়ো ধরনের হোঁচট খেয়েছিল। ধনী দেশগুলো তখন আর্থিক সংকটে থাকা দেশগুলোর ওপর নানারকম শর্ত আরোপ করছিল। ২০১৫ সালের অভিবাসী সংকট আরেকটি উদাহরণ যখন ইইউ দেশগুলোর পারস্পরিক অনৈক্য প্রকাশ্যে চলে এসেছিল। জার্মানি অভিবাসীদের একটি বড়ো অংশকে আশ্রয় দিলেও অন্য দেশগুলোকে এনিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি করতে দেখা যায়। যে ইতালি ও গ্রিস অভিবাসীর ঢল সামাল দেয় ইইউর অন্য দেশগুলোকে তাদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি।
ইউরোপের দেশগুলো এমন সময় করোনা ভাইরাসের মুখোমুখি হলো যখন জোট নতুন করে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ব্রিটেন বেরিয়ে যাওয়ার পর রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিল জোট। একদিকে বৈষ্ণিক পটভূমি যুক্তরাষ্ট্রের নিজেকে গুটিয়ে আনার প্রবণতা, অন্যদিক বিশ্বশক্তি হিসেবে চীনের উত্থান ইইউকে নতুন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়েছিল। এ অবস্থায় সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক ঐক্য ও সংহতি জোরদার করাই ছিল বাঞ্ছনীয় কিন্তু করোনার প্রভাবে ঘটল উলটাটা। ইইউ দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি করোনার ধকল সইতে হয়েছে ইতালিকে। ২১ মার্চ এক দিনেই সেখানে এর প্রকোপে ৮০০ জনের প্রাণহানি ঘটে। রোম চিকিত্সাসামগ্রী ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর সহযোগিতা চেয়েছিল। কোনো দেশই এর জন্য স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসেনি। বরং প্রতিটি সরকারই চিকিত্সা সরঞ্জামাদি মজুতের দিকে মনোযোগী। এর মধ্যে জার্মানি চিকিত্সাসামগ্রী রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যা পণ্যের অবাধ প্রবাহের ইউরোপীয় নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।