আগামী ১০ দিনের মধ্যেই করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নিউইয়র্কের সিটি মেয়র বিল ডি ব্লাসিও স্বয়ং। তিনি বলেছেন হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও করোনার নতুন সংক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না। এভাবে জ্যামিতিক হারে যদি সংক্রমণ বাড়তে থাকে তবে এই ভাইরাস শনাক্তের কিট সংকট শুরু হবে। ভেন্টিলেশনের যন্ত্রপাতি সংকট সৃষ্টি হবে। সার্জিক্যাল মাস্ক উধাও হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চিকিত্সাপণ্যের সংকট চলতে থাকলে হাসপাতালগুলোর কার্যক্রম চালানো কঠিন হবে। ইতিমধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট যেভাবে নিউইয়র্কে শুরু হয়েছে কয়েকদিনের মধ্যেই তা আরো প্রকট হয়ে উঠতে পারে। কারণ করোনা ভাইরাসের এপিসেন্টারে পরিণত হয়েছে নিউইয়র্ক। সেদিন বেশি দূরে নয়, এমন লোকজনদের এই ভাইরাসে প্রাণ হারাতে হবে যারা অসময়ে মরতে চায় না।
এদিকে, নিউইয়র্ক স্টেট গভর্নর এন্ডো কুমোর ঘোষণা অনুযায়ী রোববার রাত থেকে স্টেট লকডাউনে যাচ্ছে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় গত শুক্রবার জরুরি পরিষেবাকে আওতামুক্ত রেখে এ লকডাউনের ঘোষণা দেন গভর্নর। লকডাউনের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন সিটি মেয়র ডি ব্লাসিও। গভর্নরের লকডাউনের ঘোষণা সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছেন। ভয়, আতঙ্কের মধ্যেই যতটা পারা যায় সচেতনভাবে চলার চেষ্টা করছেন সবাই।
যুক্তরাষ্ট্রে এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত হয়েছে ৩৮ হাজার ১৬৭ জন। গতকাল নতুন করে প্রায় ১৪ হাজার জনের শরীরে এই ভাইরাস ধরা পড়েছে। দেশটিতে মোট মারা গেছে ৩৯৬ জন। এদের মধ্যে ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে রবিবার। সবচে বেশি (২২ হাজার ৭১৭) জন রোগী শনাক্ত হয়েছে নিউইয়র্কে। সেখানে মারা গেছে ১১৪ জন যার ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে গতকাল। ওয়াশিংটন ডিসিতে ১ হাজার ৭৯৩ জন আক্রান্ত হয় যাদের মধ্যে ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরের অবস্থানে আছে ক্যালিফোর্নিয়া (১৫৫০) যেখানে মারা গেছে ২৮ জন।
প্রস্তুতি: করোনাভাইরাসে গোটা আমেরিকা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে লোকজন ঘরের বাইরে তেমন বের হচ্ছে না। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যে বন্ধ হওয়ায় বেকার নাগরিকেরা কেন্দ্রীয় সরকার থেকে পূর্ণ মজুরি পাবেন। নিয়মিত বেকার ভাতার চেয়ে এই ভাতা বেশি। ফুল টাইম, পার্ট টাইম কর্মজীবী ছাড়াও যারা স্বাধীন পেশায় আছেন, তাদেরও ফেডারেল সরকারের পক্ষ থেকে অন্তত চার মাসের ভাতা দেওয়া হবে। নিউইয়র্কের সব বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্কের পাশের রাজ্য নিউজার্সিসহ বড় বড় নগরে লক ডাউনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়া যাবে না। মোট কথা আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নাগরিক সহযোগিতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই করদাতা সব নাগরিক এক হাজার ডলার করে চেক পাবেন। এ ছাড়া পরিবার প্রতি আরও কিছু নগদ অর্থ সহযোগিতা নিয়ে আইন প্রণেতারা একমত হওয়ার চেষ্টা করছেন।
আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখে: এদিকে বিশ্বজুড়ে করোনা রোগী আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখ ৩৮ হাজার ২৫৯ জনে পৌছেছে। এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৪ হাজার ৫৫৭ জন। বর্তমানে এই ভাইরাসে অসুস্থ লোকের সংখ্যা ২ লাখ ২৬ হাজার ৮৪৪ জন। সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে গেছেন ৯৬ হাজার ৯৫৮ জন। আর সংকটজনক অবস্থায় আছে ১০ হাজার ১৫৪ জন। স্পেনের পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে। দেশটিতে গতকাল নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ৭০৩ জন এবং মারা গেছে ৩৭৫ জন। আর ইতালিতে রবিবার এক দিনে মারা গেছে ৬৫১ জন এবং নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ৪শ জন। চীনে গতকাল নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৪৬ জন এবং মারা গেছে ৬ জন।
অস্ট্রেলিয়া শাটডাউন:অস্ট্রেলিয়ায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় এর বিস্তার ঠেকাতে পাব, ক্লাব, জিম, ক্যাফে, সিনেমাহল ও উপাসনালয়ের মতো সব প্রতিষ্ঠান সোমবার দুপুর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন জাতীয় মন্ত্রিসভার এক বৈঠকের পর এ পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন। বিবিসি একে দেশজুড়ে ‘শাটডাউন’ বলে মন্তব্য করেছে। সমপ্রতি অস্ট্রেলিয়ায় করোনাভাইরাস আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৫ জনে। শাটডাউনের নতুন পদক্ষেপের ফলে অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে। তবে সুপারমার্কেট, পেট্রোল স্টেশন, ফার্মেসি এবং হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালু থাকবে।
এঙ্গেলা মার্কেল কোয়ারেন্টাইনে: এদিকে একজন করোনা আক্রান্ত ডাক্তারের সংস্পর্শে আসার খবর জানতে পেরে স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনে গেছেন জার্মান চ্যাঞ্চেলর এঙ্গেলা মার্কেল। সরকারের একজন মুখপাত্র গতকাল এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, এঙ্গেলাকে একটি নিউমোনিয়ার টিকা দিতে এসেছিলেন ওই চিকিত্সক। কিন্তু পরে জানা গেছে ওই চিকিত্সকের করোনা পজিটিভ রেজাল্ট এসেছে। মার্কেলকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে বলে তিনি জানান। দেশটিতে এ পর্যন্ত ২৪ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছে ৯৩ জন। সেখানে গতকালই প্রায় আড়াই হাজার লোক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।