চেন্নাইয়ে শাস্ত্রীয় নৃত্য মন্দির কলাক্ষেত্রে একদিন

ভরতনাট্যম একক নৃত্যকলা। কিন্তু শান বাঁধানো খোলা চত্বরে দলীয়ভাবে কি অনবদ্য পরিবেশনাই না ফুটিয়ে তুলল শিল্পীরা। দর্শকরা গোল হয়ে ঘিরে রয়েছে পুরো চত্বর। যারা শিল্পী তাদের ছন্দোবদ্ধ পরিবেশনা মুগ্ধতা ছড়াল সবার মনে। খানিক দূরে শান বাঁধানো পুকুরপাড়ে বসেছে শাস্ত্রীয় সংগীতের ক্লাস। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের চেন্নাইয়ে ভরতনাট্যম নৃত্যশিক্ষার সবচেয়ে প্রাচীন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকলেই মন ভালো হয়ে যায়। শাস্ত্রীয় সংগীত শিক্ষার এই উন্মুক্ত ক্ষেত্র শিক্ষার চাপ তৈরি করে না বরং বিষয়ের প্রতি আরও আগ্রহী করে তোলে। ভারতে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় ‘হার্ভার্ড অফ ডান্স’। বিশ্বের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছে।

ক্লাসরুমে বসে প্রথাগত শিক্ষার যে চল রয়েছে তা ভেঙে দিয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে গড়ে তুলেছিলেন উন্মুক্ত পরিবেশে শিক্ষার এক ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। সেই আদলেই ১৯৩৬ সালে রুকমিনী দেবী অরুনদালে ও তার স্বামী জর্জ অরুনদালে গড়ে তোলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষার প্রতিষ্ঠান কলাক্ষেত্র ফাউন্ডেশন। দীর্ঘকাল এ প্রতিষ্ঠানটি শুধুই ভরতনাট্যম নৃত্য শিক্ষার প্রতিষ্ঠান ছিল। পরে সংগীতের আরও বিভিন্ন বিষয় খোলা হলেও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মাঝেই তা সীমাবদ্ধ। তবে, সাধারণ শিক্ষা বন্ধ করা হয়নি। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীরা কলাক্ষেত্রের স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করতে পারবে।

ছায়া সুনিবিড় বলতে যা বোঝায় পরিবেশটা ঠিক তাই। পিচঢালা পথ, সারি সারি গাছ। নগর জীবনের ব্যস্ততা নেই, নেই অন্য কোনো নাগরিক প্রয়োজন। বনের নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে পুরো কলাক্ষেত্র ফাউন্ডেশনে। এর মাঝেই চলে সংগীত শিক্ষা। নৃত্য, শাস্ত্রীয় কণ্ঠ সংগীত, যন্ত্র সংগীতের ক্লাস। শিক্ষার্থীদের থাকতে হয় হোস্টেলেই। ক্লাস শুরু হয়ে যায় ভোর থেকেই।

ভারত সরকারের আমন্ত্রণে ‘ফ্যামিলিয়ারাইজেশন প্রোগ্রাম’র অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ২০ জনের একটি সাংবাদিক দল সম্প্রতি ভারত সফর করেছে। এ সফরের অংশ হিসেবে সাংবাদিকদের সামনে ভারতের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসা ও সংস্কৃতি খাতের সঙ্গে পরিচিত করানো এবং এসব খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। এরই অংশ হিসেবে সাংবাদিক দলটি কলাক্ষেত্র ফাউন্ডেশন ঘুরে দেখে। পরিচিত হয় তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে।

চেন্নাই দক্ষিণ ভারতের প্রবেশদ্বার। তামিলনাড়ুর রাজধানী। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অনুচ্চ পাহাড় আর সমতল ভূমি ঘিরে বেশ ব্যস্ত শহর এটি। সাগরের তীর ঘেঁষা বেলাভূমির ১০০ একর বনাঞ্চল নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় এ প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন এই কলাক্ষেত্র ফাউন্ডেশন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৯৩ সালে কলাক্ষেত্র ভারতের লোকসভায় ‘কলাক্ষেত্র ফাউন্ডেশন অ্যাক্টের’ মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে। বর্তমানে এটি একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান।

কলাক্ষেত্র ফাউন্ডেশনের পরিচালক রেবতি দেবী জানালেন, এখানে চার বছরের ডিপ্লোমা কোর্স পরািলিত হয়। ভরতনাট্যম নৃত্যের পাশাপাশি কণ্ঠ সংগীত, যন্ত্র সংগীত এবং মাল্টিমিডয়ার চার বছর মেয়াদী কোর্স পরিচালিত হয়। এছাড়াও বিভিন্ন মেয়াদের কোর্স পরিচালিত হয়। তবে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে থেকেই পড়াশোনা করতে হয়। কারণ, ক্লাস শুরু হয় ভোরবেলা থেকে। ক্যাম্পাসের একই আঙ্গিনায় ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকা থাকেন। কলাক্ষেত্রের সবুজ পরিবেশে গড়ে উঠেছে সব শ্রেণিকক্ষ, অফিস কক্ষ, ছাত্রাবাস, বসবাসের ঘর। প্রতিবছর ২২০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া হয়। প্রতি ৯ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছে। প্রতিবছর একজন শিক্ষার্থীর এখানে নৃত্য শিক্ষার পোস্ট ডিপ্লোমা কোর্সে লেখাপড়া করতে এক লাখ টাকা খরচ পড়ে বলে জানান রেবতি দেবী।