মালকোষ গড়িয়ে ভৈরবী পাখনা মেলে দেয় দীর্ঘদিনের দিকে। বাতাসে ভেসে বেড়ায় আমাদের সাজানো শব্দ অক্ষর দিয়ে কল্পনার নৌকো। আমরা তাতে চেপে ‘অনন্ত গোধূলিবেলা, থেকে জ্যোত্স্নায় একেলা, ভালোবাসা মন্দবাসা, মায়াবি বন্ধনে’ নিষাদ ছুঁয়ে আসি।
—তুমি বলেছিলে, ক্ষমা নেই, ক্ষমা নেই।
অথচ ক্ষমাই আছে।
...
তুমি বলেছিলে, বিচ্ছেদই শেষ কথা।
শেষ কথা কেউ জানে?
তিরতির কাঁপন তোলা জলের ওপর দিয়ে বাতাস খেলাকরে যাচ্ছিলো বেশ আনন্দে, গড়িয়ে চলা দুপুরের পীঠে নীল আকাশ উদাসীন রোদ্দুর বিছিয়ে রেখেছিল পৃথিবীর এ প্রান্তটার দিকে। হয়তো সত্যিই লালবাতির নিষেধ ছিলো না কলকাতা শহরের রাস্তায়। ঝড় একটা উঠবে জেনেও আমরা অনেক মানুষ মনে মনে লালবাতিটাই জ্বেলে রেখেছিলাম ভিতরে ভিতরে। তবু অতর্কিতে থেমে গেল। টাল সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা। কবি হাঁটছেন ‘একপার থেকে অন্যপারে’। ‘স্তব্ধ হয়ে সবাই দেখছে’। ‘মায়াবী আলোয় ভাসছে কলকাতা শহর’। কবি ‘পৃথিবীর কিনার থেকে অন্য কিনারে চলেছে’।
কার্তিকের ২রা ১৩৩১ সন (১৯ অক্টোবর ১৯২৪) ফরিদপুরের চান্দ্রাগ্রামে কবি এসেছিলেন নবজাতকের সাড়ায়। প্রথম পাঠ গ্রামের পাঠশালায়, তারপর কলকাতায় সেন্ট পলস্ স্কুলে এবং বঙ্গবাসী কলেজে পড়াশোনা। একটি দৈনিক পত্রিকা ‘প্রত্যহ’, তাতে সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু তাঁর কর্মজীবন, পরে আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগ দেন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। পরে তিনি আনন্দমেলা পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৭৪ সালে সাহিত্য আকাদেমি ১৯৭৬ সালে আনন্দ পুরষ্কার। এছাড়া বহু উল্লেখযোগ্য পুরস্কার— তাঁকে উল্লাস জানিয়েছেন মানুষের ভালোবাসা দিয়ে।
কবি তাঁর ৯৪ বছর বয়সে কবিতাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন আমৃত্যু। বার্ধক্য তাঁর কলমকে স্থবির করে রাখতে পারেনি, তিনি বার্ধক্যকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন রুমালে বেঁধে। তাঁর কবিতায় ফুটেছে নতুন নতুন ফুল, ফুলে ভেসেছে সৌরভ, তৃষ্ণার্ত ঠোঁটের সামনে যেন ধরেছেন শান্তির বারি। রোদ্দুর রঙে ভিজিয়ে দিয়েছেন অমলকান্তির স্বপ্ন।
জীবনের ফাঁকে ফাঁকে অসম্ভব রাত্রি আসে, তেমন ভোরও। হাসি থাকে, কান্না, আনন্দ গানও। তবু অদ্ভুত এক নৈশব্দ কাঁপিয়ে ‘নীল নির্জন’ ছিঁড়ে ‘শিওড়ে মৃত্যুর হাত’, পা টিপেটিপে, পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া রোদ্দুরের মতো একটি শিশু, চিনচিনে ব্যথা নিয়ে বুকের কাছে এসে দাঁড়ায়, তখনি অন্ধকার থেকে রঙগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে একটা মোচড় দেওয়া সেতার-ঝংকারে। আর আমাদের বিস্তৃত আকাশে তখন পৃথিবী থেকে উড়ে যাওয়া সু-ঘ্রাণে ভিজে যাচ্ছিল পৌষালি চাঁদ। চাঁদ কি জানত একটা নক্ষত্র নামছে জলের অনেক গভীরে! যে গভীরে বিশ্রাম নেয় আমাদের সকল জড়ো করা জন্মগুলো।
‘এখন আকাশ ফের সুন্দর সুনীল।
এখন মেঘের রঙ সাদা।
এখন ফুলের রঙ সাদা
এখন রৌদ্রের রঙ সাদা
এখন হূদয় ফের মেঘ ফুল রৌদ্রের মতন সাদা হয়ে যাবে।
চলো আমি ঘরে ফিরে যাব।’
হ্যাঁ কবি, আমরা সকলেই যাবো ঘরে ফিরে, প্রত্যকেই। তাই তো ‘রজনীগন্ধার সাদা যেন আজ দ্বিগুণ প্রকট। গোলাপ দ্বিগুণ লাল। সন্ধ্যার আকাশ অধিক নিবিড়।’
ভালোবাসা দিয়ে যেমন ভালোবাসা, কবিতা দিয়ে কেমন এক-একটা রক্তাক্ত ফাল্গুন যেন চৌচির হাওয়াই বাজছে বসন্তবাহার।
চির আপন করে নেওয়া কবি নীরেন্দ্রনাথ বলেছেন, —‘তর্জনী দেখিয়ে কেনো কথা
বলো...কখনো বলবে না...
কাকে... তুমি ভয় দেখাও কাকে...
আমি অনায়াসে সবভেঙে ফেলতে পারি...’
ভাঙো সাজানো ঝড়, সাজানো কালো মেঘ, কবি ভাঙো আমাদের অহং।
স্বচ্ছতার ভিতর দিয়ে প্রতিবাদ বেজে উঠুক, বেজে উঠুক আপনার মতো এক অন্ধকার দেওয়াল
চিরে লেখা কবিতা ‘বাতাসী’...
কবি তবু আজ পাখি কেমন থাকে, ভালো কি! আজ বৃক্ষ পাতারা কেঁপে উঠেছে বারবার, আজ রোদ্দুরে হলুদ উত্তাপ, আলো কমতে থাকার দিন মানুষ মেঘ হতে গিয়ে সোনালি মেঘে স্থির ছায়া হয়ে গেল কিনা, আপনার কি হয়েছিল জানা?
কবি আপনি তো ভুলতে চেয়েছিলেন, তার ডাক, তার আসা, তার ফিরে যাওয়া। আপনি চেয়েছিলেন বৃষ্টির মধ্যে ঘুরতে, সূর্যের মধ্যে পুড়তে!
আসলে কোনো যাওয়া যাওয়া নয়।
তেমনি কোনো মৃত্যুও মৃত্যু নয়। শুধু একটা কাহিনি, আর একটা কাহিনির সাথে নতুন করে শুরু করে পথ চলতে। এক বন্ধু দরজা বন্ধ করে, আর এক বন্ধুর কাছে যাবার জন্য, পুরোনো প্রেম ফিরে যাবে শৈশব দিনে, তারা সকলে একসাথে আছড়ে পড়বে হূদয়ে হূদয়ে মিলিত হয়ে।
কোনো গান সেল্যুট দিয়ে নয়, এক মৃত্যু দুই মৃত্যু পেরিয়ে সীমাহীন পারাবারে ভাসবে তারা —‘ভয় করলেই ভয়, নইলে কিছু না’।
আমরা প্রবল কবিতার জ্বর গায়ে মেখে, পৃথিবী থেকে মাথা উঁচু করে বলবো ‘ভাঙো আমার দেওয়াল, আমার দেওয়াল।’
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
১৯ অক্টোবর ১৯২৪
২৫ ডিসেম্বর ২০১৮