বিশ্ব অর্থনীতিতে রীতিমতো তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে কোভিড-১৯। অভূতপূর্ব এক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বৈশ্বিক শিল্পোত্পাদন খাত। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোসহ বৈশ্বিক অর্থনীতির রথী-মহারথী সব দেশেরই উত্পাদন খাত এখন পুরোপুরি ধরাশায়ী। ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে পুঁজি, মুদ্রা ও পণ্যবাজার। অর্থনৈতিক এ মহাদুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি থেকে নিজ নিজ দেশের আর্থিক খাত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সর্বোপরি নিজ জনগণকে সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে প্রণোদনামূলক নানা পদক্ষেপ। মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস বিশ্বকে অর্থনৈতিক মন্দার দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে এক বিশ্বমন্দা, যার মাত্রা হয়তো অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। এই ভাইরাসের মোকাবিলায় দেশে দেশে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তা এই জটিল বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট নয় বলেও বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানিতে ধস নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মজুরি পরিশোধ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। রপ্তানির সঙ্গে বিদেশ থেকে কাঁচামালসহ নিত্যপণ্য আমদানিও প্রায় বন্ধের পথে। কোভিড-১৯ বিস্তৃতির প্রভাব হিসেবে আগামী দিনগুলোয় বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সংকট ও দারিদ্র্যের সম্মুখীন হবে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)।
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে ব্যাংকের মাধ্যমে। ব্যবসা-বাণিজ্য সংকটে পড়লে ব্যাংক খাতও সংকটে পড়বে। ব্যাংকগুলো আমানত ও ঋণের সুদহার যথাক্রমে ৬ ও ৯ শতাংশ কার্যকর করতে যাচ্ছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ব্যাংকগুলো ৬ শতাংশ হারে আমানতের সুদহার কার্যকর হয়েছে। আগামী ১ এপ্রিল থেকে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকর করার কথা। কিন্তু দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামায় ঋণের সুদহার কার্যকর নিয়ে ব্যাংকারদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ এঁকেছে। সরকারের ঋণ অবলোপন ও পুনঃতপশিলে ব্যাপক ছাড় দিয়েছে। আগামী জুন পর্যন্ত কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধ না করলেও ঋণের শ্রেণিমানে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। বৈদেশিক বাণিজ্যেও নীতিমালায় ছাড় দেওয়া হয়েছে। রপ্তানির অর্থ দেশে আনা ও আমদানি দায় পরিশোধের মেয়াদ ৬০ দিন করে বাড়ানো হয়েছে। ১৮০ দিন বাড়ানো হয়েছে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির আওতায় স্বল্পমেয়াদি সাপ্লায়ার্স ও বায়ারস ক্রেডিটের মেয়াদ। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে ৯০ দিন। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব সুযোগ-সুবিধা কার্যকর থাকবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়া ব্যাংকগুলো রপ্তানি বিলে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ডিসকাউন্ট দিতে পারত। এখন থেকে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই ১০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্ট দিতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য নীতিমালা শিথিল করেছে। বাংলাদেশের সব তপশিলি ব্যাংক (শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকসহ)-কে তাদের মোট তলবি ও মেয়াদি দায়ের ৬ শতাংশ থেকে ৫ (পাঁচ) শতাংশ দ্বি-সাপ্তাহিক গড় ভিত্তিতে এবং ন্যূনতম ৫ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ দৈনিক ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে নগদ জমা হিসেবে সংরক্ষণ কমানো হয়েছে। রেপোর সুদহার শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ কমিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থাত্ বর্তমানে ৬ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
ব্যাংকার বলছেন, সাময়িক বিপর্যয় সামাল দেওয়ার জন্য এসব ছাড় সাময়িকভাবে মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু করোনা ভাইরাসের এ দুর্যোগ কতদিন দীর্ঘায়িত হবে তা কেউ জানে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনের প্রভাবে ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। পরিস্থিতি খারাপ হলে অনেক ব্যাংকের পক্ষে নতুন ঋণ দেওয়ার পরিস্থিতি থাকবে না। এতে ব্যাংকগুলোর মুনাফাও কমবে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মন্দায় পড়লে ব্যাংকের জন্য আমানত সংগ্রহ করাও কঠিন হতে পারে। আমানত সংগ্রহ করতে না পারলে অনেক ব্যাংকের নতুন করে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা থাকবে না। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ব্যাহত হলে ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের অর্থ ফেরত পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে নগদ অর্থসহ সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।