শ্রীলঙ্কায় কর হ্রাসের সিরিজ!

দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকের রাশিগুলোর দিকে চোখ বোলানোর পর একই প্রেক্ষিতে শ্রীলঙ্কার দিকে চাইলে না মেনে উপায় নেই যে, দ্বীপরাষ্ট্রটির অর্থনৈতিক অবস্থা অতোটা রোগা নয়। এ অঞ্চলের মধ্যে সবার আগে তারাই নাম লিখিয়েছে উচ্চ মধ্য আয়ের দেশের তালিকায়। নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্য আয়ের দেশে রূপ নিতে তাদের সময় লেগে গেছে অবশ্য একটু বেশিই, প্রায় ২০ বছর। তবে স্বনির্ভরতার বিচারে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাটা কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ। ঘাটতিবিহীন বাজেট তারা শেষবারের মতো পেশ করতে পেরেছিল ১৯৫৫ সালে। ২০১৮ সালে দেশটির বাজেট ঘাটতি ছিল যেখানে মোট দেশজ উত্পাদনের ৫.৫ শতাংশ, সে জায়গায় গত বছর তা দাঁড়ায় ৭ শতাংশে। রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ অনেক কমে যাওয়ার পর চরম অস্থিতিশীল মুদ্রা বিনিময় হারে বড়ো রকমের পতন যুক্ত হওয়াতেই নাকি এই পরিণতি। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও নতুন রেকর্ডের সৃষ্টি হয়েছে, প্রাক্কলনের চেয়েও কমে গিয়ে তা দাঁড়িয়েছে ২ শতাংশেরও কম। এ অবস্থায় থেকেও নবনির্বাচিত সরকার কর কর্তনের সিরিজ ঘোষণা করেছে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে চাঙ্গা করার যুক্তি দেখিয়ে। মূল্য সংযোজন করকে ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ৮ শতাংশ। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়করকে ঠিক অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে (২৮ থেকে ১৪ শতাংশ)। ব্যক্তিগত আয়করের জন্যে করমুক্ত মাসিক আয়ের সীমা ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ধার্য করা হবে আড়াই লাখ রুপি! সমালোচকের দৃষ্টিতে ২১ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশ শ্রীলঙ্কা ধীরগতিতে হলেও উত্পাদনভিত্তিক অর্থনীতি থেকে দৃঢ়ভাবেই সরে গিয়ে খাদ্যসহ কিছু অতিজরুরি সামগ্রীর জন্য গুটিকয়েক দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যে কারণে তাদের টেকসই উন্নয়ন আজ যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ।

 ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক স্থানে অবস্থান করায় শ্রীলঙ্কায় বৃহত্ সব প্রকল্প গ্রহণের ব্যাপারে ভারত ও চীন রীতিমতো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। সাম্প্রতিক বিভিন্ন দৃষ্টান্ত জানান দিচ্ছে, অধিক সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে চীনের সম্পর্কটা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। তবে একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই দেখা যায় যে, এখন পর্যন্ত চীনা এফডিআই অবকাঠামো ও মিশ্র অর্থনৈতিক প্রকল্পসমূহের কম উত্পাদনশীল খাতসমূহেই বেশি কেন্দ্রিভূত। সেই সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রবাহ প্রবলভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে চীনের দিকে। সমালোচকরা বলছেন, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি প্রকৃতপক্ষে এগোনোর বদলে পেছাচ্ছে। অতি দক্ষ লোকেরা চলে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা ছেড়ে। মাত্র ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষুদ্র অর্থনীতির এ দেশটির অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বাজার মূল্য মাত্র ২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে শ্রীলঙ্কার পণ্যের বহির্চাহিদা দেশটির মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য খুবই জরুরি।

২০১৮ সালেও শ্রীলঙ্কার বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রবল। এর কারণ ঘাটতে গিয়ে অনেকে সুশাসনের ঘাটতিকে দায়ী করেছেন। ক্রমবর্ধিষ্ণু আমদানি ব্যয় গত বছর গিয়ে ঠেকেছিল ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। শ্রীলঙ্কার মাথাপিছু আয় গত ৪ বছর ধরে ঘুরছে ৪ হাজার মার্কিন ডলারের আশপাশে। তবে এই রাশির মাধ্যমে আয়ের অসমতা ও জনপিরামিডের নিচের দিকে থাকা গ্রামীণ লোকজনের সঙ্গে বিশাল বৈষম্যও উঠে আসে না।

 উচ্চ-মধ্য আয়ের গৌরবের আসনে বসা সত্ত্বেও বিশ্ব ব্যাংক নির্দেশিত বিভিন্ন সূচক অনুসারে শ্রীলঙ্কার মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশই দরিদ্র। গত বছর মাথাপিছু জিডিপি ছিল ২২ হাজার ১৯৫ মার্কিন ডলার, যেটি সিঙ্গাপুরের ছিল ৮৭ হাজার ৮৩২ মার্কিন ডলার (ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুসারে)। ২০১৮ সালের শেষনাগাদ শ্রীলঙ্কার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছিল ৬.৯ বিলিয়ন ডলার, সে জায়গায় আগামী ৫ বছরে ঋণ ফেরত দেওয়া বাবদই গুনতে হবে ১৫.৫ বিলিয়ন ডলার।

—নিউ ইয়র্ক টাইমস অনুসরণে