শিফারুল শেখ
বিশ্ব জুড়ে করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি অর্থনীতি ও রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে। পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত দেশে করোনা সরকারের জন্য ঝুঁকি তৈরি না করলেও উন্নয়নশীল দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এমনকি সরকার পতনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ এসব দেশে ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক দুর্যোগ তৈরি হয়েছে।
গত ২৭ মার্চ ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানান। এরপর তার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক এবং জনসনের প্রধান উপদেষ্টা ডোমিনিক কামিংসও আইসোলেশনে যান। এই সংবাদ রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা কাঁপুনির সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক নেতারা সাধারণত সম্পদ এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসুবিধা পাওয়ায় স্বাস্থ্যসংকট থেকে রক্ষা পান। তবে করোনা ভাইরাস যে কাউকে ছাড় দিচ্ছে না, তা ইতিমধ্যে প্রমাণ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডার দিকে তাকালে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। কানাডায় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর স্ত্রী সোফি ট্রুডো করোনায় আক্রান্ত। ইতালিতে সরকারের অংশীদার ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রধান নিকোলা জিনগারেতি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আর ভার্সে প্রদেশের মেডিক্যাল গিল্ডের প্রধান রবার্তো স্টিলা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ফ্রান্সে সংস্কৃতিমন্ত্রী ফ্র্যাঙ্ক রিয়েস্টার আক্রান্ত, সঙ্গে পার্লামেন্টের পাঁচ সদস্যও।
যুক্তরাষ্ট্রে গুজব ছড়িয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা যায় তিনি আক্রান্ত হননি, সিনেটর র্যান্ড পল আক্রান্ত। নিউ ইয়র্ক রাজ্যে দুই পার্লামেন্ট সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। মিয়ামির মেয়র ফ্রান্সিসের একই দশা। এছাড়া সেলফ আইসোলেশনে আছেন সিনেটর রিক স্কট ও টেড ক্রুজ। এসব দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় ব্যক্তির আইসোলেশন, আক্রান্ত এবং মৃত্যুতে তেমন কিছু নির্ভর করে না। এসব দেশের পরিস্থিতি আরো খারাপ হলেও তারা নতুন প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রিপরিষদ গঠনের চেষ্টা চালাবেন।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের মৃত্যু হলে শূন্যস্থান পূরণের জন্য প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা, বিরোধী দল, সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এসব সমস্যা নির্দিষ্ট কিছু দেশে, যেখানে রাজনীতিতে ভারসাম্যের ঘাটতি আছে কিংবা সেগুলো দুর্বল। তারা খুব দ্রুত শক্তিশালী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা এবং কমিউনিস্ট-পরবর্তী ইউরোপের দেশগুলোতে এই কথাগুলো অনেক ক্ষেত্রে সত্যিই মনে হয়।
গবেষক রডজার গোভিয়া ও জন হলমের মতে, আফ্রিকার দেশগুলোতে ক্ষমতার পালাবদলের ক্ষেত্রে ৬১ ভাগই নিয়ম মেনে হয় না। রাজনৈতিক দৃশ্যের অনেক কিছুই এখানে ঘটে রাজনৈতিক সংকটের সুযোগে। যেসব দেশে এক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে সরকার গঠিত কিংবা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল, সেখানে ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে যুদ্ধ শুরু হতে পারে। ক্ষমতাসীন দলেও ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে। পরিস্থিতি খারাপ হলে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটতে পারে। এসব দেশে সরকারপ্রধান কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্ব আক্রান্ত হলে ক্ষমতার মোড় পালটাতে পারে। ইতিমধ্যে বুরকিনা ফাসো, ইরান, নাইজেরিয়া ও কসোভোতে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বড়ো সংকট সৃষ্টি হতে পারে ভেনিজুয়েলায়। সেখানে ছয় বছর ধরে চলা রাজনৈতিক সংকটে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকার সংকটে আছে। দেশটির প্রতি তিন জনে এক জন পর্যাপ্ত খাবার পান না। অর্থনীতির ৬৫ ভাগই ধ্বংসের পথে। দেশটিতেও করোনা ভাইরাস হানা দিয়েছে। অর্থনীতির চাপ আরো বেড়েছে।
বাস্তবে একটা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে করোনা ভাইরাস রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে কতটা ছড়ায়। কারণ অনেক দেশেই রাজনীতিকদের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি। তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বুরকিনা ফাসোতে করোনায় নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। এমনিতে ক্ষমতা নিয়ে সেখানে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। এরই মধ্যে দেশটিতে পররাষ্ট্র, শিক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত।
নাইজেরিয়া আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির ৭৭ বছর বয়সি প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদু বুহারির চিফ অব স্টাফ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু বুহারি আক্রান্ত হননি। গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে বুহারিও আক্রান্ত। ইরানের বিষয় মিডিয়ায় তেমন একটা আসে না। তবে এরই মধ্যে জানা গেছে, দুই ভাইস প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রিপরিষদের তিন কর্মকর্তা করোনায় সংক্রমিত। এটাও জানা যায় যে পার্লামেন্টের ১০ ভাগ সদস্য এবং ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ডের ক্ষমতাশালী ব্যক্তি আক্রান্ত। এমনকি ৮০ বছর বয়সি শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সিনিয়র উপদেষ্টাও আক্রান্ত। খামেনির স্বাস্থ্য নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদি তার কিছু হয়, তাহলে ইরানে বড়ো ধরনের একটা ঝুঁকি তৈরি হবে। কেবল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আক্রান্ত হলেই যে ঝুঁকি তৈরি হবে তা নয়, ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বেকারত্ব বেড়েছে। এতে বৈদেশিক ঋণ কিংবা সরকারের বাজেটে টান পড়তে পারে। ফলে ঋণগ্রস্ত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনও দানা বাঁধতে পারে। এতে এসব দেশ অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং সরকারে পালাবদল ঘটাতে পারে।
সূত্র : ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন, টাইম ম্যাগাজিন ও বিবিসি