l নাজমা সুলতানা মেন্ডিজ
আজ আমরা সমগ্র বিশ্ব একটি অত্যন্ত দুঃসময়ের ভিতরে দিয়ে যাচ্ছি। কোভিড-১৯ নামক সংক্রামক ব্যাধি আমাদের চলমান জীবনকে হঠাত্ করে থমকে দিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লিউএইচও মন্তব্য করেছে— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরেকটি দুঃসময় সারাবিশ্ব পার করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কেভিড-১৯ সংক্রামক ব্যাধিটি মোকাবেলা করতে এবং দ্রুত বিস্তার রোধ করতে কিছু জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে যা ব্যক্তি, রাষ্ট্র তথা বিশ্বব্যাপী সকলে সেটি পালনে সদা সতর্ক অবস্থায় আছে।
n সাবান পানি দিয়ে ঘন ঘন হাত পরিষ্কার করা।
n সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা।
n চোখ, নাক, মুখ স্পর্শ করা এড়িয়ে চলা।
n হাঁচি, কাশি শিষ্টাচার মেনে চলা। এর অর্থ কাশি বা হাঁচির সময় কুনুই বাঁকা করে বা টিস্যু দিয়ে মুখ এবং নাক ঢেকে রাখা। এবং পরে ব্যবহূত টিস্যুটি নিরাপদ জায়গায় ফেলা।
n সরকারের বিধান অনুযায়ী ১৪ দিন বা তার অধিক সময় বাড়িতে অবস্থান করা।
n কোভিড-১৯ দ্রুত বিস্তার রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
হাজার বছর ধরে মানুষ অসুস্থতার নিরাময়ের উপায় হিসাবে বসবাসের জায়গার নকশা নিয়ে পুনরায় ভেবেছিল। সংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য শহরগুলোর পরিকাঠামো, আর্কিটেকচার এবং ইন্টেরিয়র ডিজাইনে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ডিজাইন জগতে ‘মিনিমারিস্ট স্টাইল’ অত্যন্ত জনপ্রিয়। যার মূল মন্ত্র ‘লেস ইজ মোর’।
সাজানো নকশা করা একটি সুন্দর ঘর শুধু আপনার অতিথিকে মুগ্ধ করার জন্য নয়। এটি হতে হবে স্বাস্থ্যকর, গোছানো, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ যা আপনার এবং আপনার পরিবারের সুস্থতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে সহায়তা করে।
ঘর এবং কাজের জায়গা ডিজাইনে আমি সবসময় গুরুত্ব দেই একটি পরিকল্পিত নকশাকে যা একটি মানুষের জীবনের মান উন্নত করে এবং সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি পরিকল্পিত ডিজাইন করা বসবাসের জায়গা সংক্রামক ব্যাধি এবং মানসিক অসুস্থতা থেকে অনেকটাই রক্ষা করে। সহজে পরিষ্কার করা যায় এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় এমন ঘর ডিজাইন করার সময় পরিকল্পনায় প্রথম থেকেই কিছু ব্যাপার গুরুত্ব দেয়া উচিত। যেমন,
n খুব বেশি কাঠের খোদাই করা এবং জটিল কাজ না করে সরল সাধারণ লাইন অনুসরণ করে ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা উচিত। সরল লাইনে আলমারি, কেবিনেট, টেবিল, চেয়ার, বেড, কিচেন, বাথরুম এবং স্টোরেজ ডিজাইন করা উচিত।
n ফ্লোর এবং ওয়াল সারফেস টাইল কার সময় গ্রাউট লাইনগুলো কম করার জন্য ছোট টাইল স্ল্যাবের জায়গায় বড় টাইল স্ল্যাব ব্যবহার করা ভালো। টাইলসের গ্রাউট লাইনগুলোর ভিতরে ময়লা-জীবাণুু থাকতে পারে যদি সেটি গভীরভাবে পরিষ্কার না করা হয়।
n স্পেস পরিকল্পনার সময় একটি ওয়াশরুম প্রধান দরজার কাছাকাছি রাখা উচিত; যাতে যে কেউ ঘরে ঢুকেই আগে নিজের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজটি সহজভাবে করতে পারে। এতে ঘরে জীবণুু সহজে ছড়ায় না।
n ঘরের দেয়ালগুলি আশ্চর্যভাবে ধুলিকণা সংগ্রহের জায়গা। তাই খুব বেশি কারুকার্যেও ওয়াল কভারিং এবং সিলিং ডিজাইন না করে সাধারণ সরল লাইনের ডিজাইন রাখাই ভালো। রং নির্বাচনে একটু কৌশলি হয়ে সহজে যে কোনো দাগ, ধুলো-ময়লা, পরিষ্কার করা যায় সেই ধরনের রংকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কিছু রং অনেকের এলার্জি প্রতিক্রিয়া বাড়িয়ে দেয়—সেইদিকেও মনযোগী থাকা দরকার।
n রঙের মতো ফার্নিচারের এবং গৃহশৈলীর অন্যান্য কাপড় নির্বাচনেও গুরুত্ব দিতে হয়। গৃহশৈলীতে ব্যবহূত কাপড় থেকে মারাত্মক এলার্জি হতে পারে। তাই পর্দা, কুশন- সোফার কভার, কার্পেট এমন উপাদানের হওয়া উচিত যা সাবান-পানি বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে সহজে ধুলো-ময়লা পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত করা যায়।
n বিল্ট-ইন ফার্নিচার ডিজাইন করার সময় খেয়াল রাখা উচিত যাতে এমন কোনো লুকানো কোনা না থাকে যেখানে ধুলো-ময়লা এবং জীবাণু থাকতে পারে। বিল্ট-ইন ফার্নিচার ডিজাইনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ধুলো-বালি, জীবণুু থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রকে রক্ষা করা।
n ঘরের সৌন্দর্য বর্ধনে এবং আলোর প্রয়োজনে লাইটিং একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। লাইটিং ডিজাইন করতে লক্ষ্য করা উচিত এটি কি সহজে পরিষ্কার করা যায় কি-না। অতিরিক্ত কারুকার্যের ঝাড়বাতি না নিয়ে সাধারণ আধুনিক সরল লাইনের ঝাড়বাতি লাগালে ঘর অনেক বড় এবং খোলামেলা দেখায়।
n ঘরের সবরকম সারফেস বা উপরিতল/উপরিভাগ যেমন টেলিব টপ, সেল্ফ টপ, কিচেন টপ, সারভিং টপ, বাথরুম টপ, ফ্লোর ইত্যাদি তৈরি করার সময় এমনসব উপাদান ব্যবহার করা উচিত যাতে সহজেই দাগমুক্ত, ধুলামুক্ত এবং জীবাণুমুক্ত করা যায়। যেমন—গ্রানাইট, সিট ভিনাইল ফ্লোর, হাই-প্রোফাইল লেমিনেটিং, স্টিল ইত্যাদি।
n বাথরুম এবং কিচেন ডিজাইনের সময় সবচেয়ে বেশি মনোযোগী হতে হয়। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এখান থেকেই রোগ-জীবণুু হতে পারে। তাই বাথরুম এবং কিচেন ডিজাইন আধুনিক এবং সহজে যেন পরিষ্কার রাখা যায় তেমনটি হওয়া উচিত।
n ঘরে এবং ওপেন টেরাস বা বারান্দায় কিছু গাছ রাখা যেতে পারে। গাছ ঘরের বাতাসকে বিশুদ্ধ করে এবং অক্সিজেন দেয়। তবে অবশ্যই এগুলোর ধারাবাহিকভাবে যত্ন এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা উচিত যাতে এখানে ফাঙ্গাস, জীবাণু বা পোকা-মাকড় জন্মাতে না পারে।
n যে ঘরটিতে সূর্যের আলো এবং বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে সেই ঘরটি সবচেয়ে সুন্দর ডিজাইনের এবং স্বাস্থ্যকর বলে মনে করা হয়। আধুনিক ইন্টেরিয়র ডিজাইন লে-আউট এমনভাবে পরিকল্পনা করা উচিত যাতে এটি কম সময়ে পরিষ্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়। পরিকল্পিত ইন্টেরিয়র ডিজাইন সমসাময়িক জীবন যাত্রাকে সহজ এবং দুশ্চিন্তামুক্ত করে এবং আপনার ঘরের কাজের পর অবসর সময়টি উপভোগ করতে পারেন নিজের সঙ্গে এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে।
n এই দুঃসময়ে আতঙ্কিত না হয়ে সদা সতর্ক থেকে নিরাপদ থাকা উচিত।
লেখক ইন্টেরিয়র ডিজাইনার