বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় ইউরোপের বাজার

বাংলাদেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপ। মোট রপ্তানির ৫৮ শতাংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৮টি দেশে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত গার্মেন্টস পণ্যের মধ্যে ইউরোপেই যায় ৬২ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান থেকে  স্পষ্ট যে, ইউরোপের বাজার আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৮ সাল থেকে ২০১৭ সাল  পর্যন্ত ইউরোপের দেশগুলোতে গার্মেন্টস পণ্য আমদানি ২ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বাড়লেও সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ১২ শতাংশ হারে। এমনকি, বৈশ্বিক মন্দায়ও সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি না কমে বরং বেড়েছে।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি হয় জার্মানিতে। এর পরে রয়েছে যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, সুইডেন,  নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, বেলজিয়ামসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ছিল ২ হাজার ১শ’ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৬০ কোটি ডলারই ছিল গার্মেন্টস পণ্য। অর্থাত্ ওই বাজারে মোট রপ্তানির পণ্যের মধ্যে গার্মেন্টস পণ্যের অবদান ৯২ শতাংশ।

ইউরোপের ২৮টি দেশ মিলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ। অবশ্য সম্প্রতি এ জোট থেকে বেরিয়ে এসেছে যুক্তরাজ্য। বাদবাকী দেশগুলো এখনো এ জোটের মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ জোট বড় ভূমিকা রাখে। দীর্ঘদিন থেকেই স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে সেখানে বাংলাদেশের সব ধরনের রপ্তানি পণ্য (অস্ত্র বাদে) শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। বাংলাদেশের অন্য প্রতিযোগী দেশগুলো থেকে পণ্য নেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপ নির্দিষ্ট হারে শুল্ক রেখেছে। এই সুবিধা থাকায় বাংলাদেশ প্রতিযোগীদের চাইতে এগিয়ে গেছে। এছাড়া একসময় রুলস অব অরিজিনের শর্ত পরিপালন করতে হতো। এক সময় এই শর্তও শিথিল হলো। ফলে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরো বাড়ল। এসব কারণেই সেখানে বাংলাদেশের  পোশাক রপ্তানিকারকরা আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন।

সম্প্রতি পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিটিউট (পিআরআই)  পোশাকের রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়ে একটি গবেষণা চালিয়েছে। তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশের সামনে আরো প্রায় ১ হাজার ৭৪০ কোটি ডলারের পোশাকের রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ইউরোপের বাজারেই রয়েছে আরো ১ হাজার ১৩০ কোটি ডলার বাড়ানোর সুযোগ। বৈশ্বিক পোশাকের বাজারের ৪৫ শতাংশই ইউরোপের দেশগুলোতে। ২০১৭ সালে ইউরোপ ১৭ হাজার ৮শ’ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৬শ’কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে ইউরোপের বাইরে অন্য দেশগুলো থেকে। এককভাবে চীন থেকে আমদানি করেছে ২৩ শতাংশ। যদিও সম্প্রতি বেশকিছু কারণে চীন থেকে পোশাক রপ্তানি কমতির দিকে। ফলে চীনের ছেড়ে দেওয়া এ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের সামনে।

এতসব সম্ভাবনার মধ্যেও বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বাংলাদেশের সামনে। বাংলাদেশ এখনো সাধারণত স্বল্পমূল্যের সাধারণ মানের পোশাক রপ্তানি করে বলে বিশ্বব্যাপী প্রচারণা রয়েছে। যদিও সম্প্রতি উচ্চমূল্যের পোশাকে ঝুঁকছে- তবে তা সীমিত। ফলে রপ্তানিকারকের হাতে খুব বেশি অর্থ আসে না। এছাড়া উত্পাদনকারীদের দরাদরির দক্ষতা খুবই দুর্বল। এই দুর্বলতার কারণে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো কমপক্ষে গড়ে স্বাভাবিকের চাইতে পাঁচ শতাংশ মূল্য কম পায়। এছাড়া শ্রম অধিকার ও কারখানার কর্মপরিবেশগত দুর্বলতার সুযোগে আন্তর্জাতিকভাবে নেতিবাচক প্রচারণার শিকার হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জর মুখে পড়তে হবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ অফিসিয়ালি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। সেক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পাবে না। সেজন্য জিএসপি প্লাসের আওতায় বেশকিছু শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা আসবে। ওই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে প্রমিতহারে শুল্ক পরিশোধ করে (৮ থেকে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ) পণ্য প্রবেশ করতে হবে। বাড়তি এ শুল্ক পরিশোধ করতে হলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাবে। পিআরআই বলছে, এতে করে বছরে প্রায় ১৬০ কোটি ডলারের রপ্তানি কমে যেতে পারে ইউরোপে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এখনই মনোযোগ দেওয়া দরকার। বিশেষত ইউরোপের বাজারে আমাদের  পোশাকের রপ্তানির এ ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখতে জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে গুরুত্বের সঙ্গে কার্যক্রম চালাতে হবে। এ জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পরিপালন করতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক ২৭টি নীতিমালায় স্বাক্ষর করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে শ্রম অধিকার, মানবাধিকার, পরিবেশ ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া আমদানির ক্ষেত্রেও কিছু শর্ত পরিপালন করতে হবে। এসব শর্তেও কতটুকু পূরণ করা যাবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা রয়েছে। তবে  বিকল্প কৌশল নির্ধারণ, ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করা, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে পোশাকের বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের উন্নয়ন,  বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, গার্মেন্টস খাতের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহজ করা গেলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।