নির্বাচন ঘিরে অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত, বহুল আলোচিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামীকাল ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে উত্সবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ উদ্দীপনা উত্সাহ কোতূহল দানা বেঁধে উঠেছে। এর পাশাপাশি নানা শংকা, ভয়, অনিশ্চয়তাভাবও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন এলেও এরকম অবস্থা কম বেশি সৃষ্টি হয়-এটাও সত্যি। নির্বাচন এলে দেশে আর্থসামাজিক রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের প্রভাব পড়ে। এবারও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে আমাদের অর্থনীতিতে নানা প্রভাব পড়েছে, যা ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। গত কয়েক মাসে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা নতুন কোনো বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসা শুরুতে তেমন তত্পর হননি। বলা যায়, অনেকটা হাত গুটিয়ে বসেছিলেন। নির্বাচন হয়ে গেলে তারা পরিস্থিতি বুঝে এগোবেন, তেমন মনোভাব পোষণ করে অপেক্ষায় আছেন। তবে নির্বাচনী উত্সবের কারণে স্বাভাবিকভাবে অর্থনীতিতে অন্যরকম দোলা লেগেছে। বিভিন্ন প্রার্থীর নির্বাচনী পোস্টার ছেপে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের মুদ্রণ শিল্পখাত। এমনিতেই সারা বছর বিভিন্ন ধরনের মুদ্রণ কাজে ব্যস্ত থাকে প্রেসগুলো। সরকারি পাঠ্যপুস্তকের মুদ্রণ, গার্মেন্টস এর প্যাকেজিংয়ের কাজ, ব্যাংক বীমার কাগজপত্র, নতুন বছরের ক্যালেন্ডার ছাপানোর কাজে মোটামুটি ব্যস্ত থাকলেও এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের পোস্টার মুদ্রণের কাজটি ছাপাখানা শিল্পে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছিল বৈকি। গতানুগতিক নিয়মিত মুদ্রণ কাজের মাধ্যমে প্রতিবছর মুদ্রণ শিল্পে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। এবার বাড়তি পাওয়া হিসেবে যুক্ত হয়েছিল নির্বাচনী পোস্টার ছাপার কাজ। ফলে প্রিন্টিং প্রেস কেন্দ্রিক অর্থনীতিতে সুবাতাস বয়ে গেছে। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রার্থী অংশগ্রহণ করায় প্রচারণার কাজে ব্যবহারের জন্য পোস্টার, লিফলেট, ব্যানার মুদ্রণের পরিমাণও ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। ছাপাখানা বা প্রেসগুলোর পাশাপাশি কাগজ ও কালির চাহিদা ছিল তুঙ্গে। ফলে এতদসংশ্লিষ্ট ব্যবসা বাণিজ্যে দারুণ চাঙ্গাভাব সৃষ্টি হয়েছিল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।

নির্বাচন এলে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণ গ্রহীতাদের ঋণ হিসাব নিয়মিত করণের ধুম পড়ে যায়। বকেয়া বিদ্যুত্ বিল, টেলিফোন বিল, গ্যাস বিল পরিশোধেও ব্যন্ত হয়ে পড়েন নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রার্থীরা। কারণ ঋণ খেলাপি, বিল খেলাপিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য বলে বিবেচিত হন। এবারও নির্বাচনে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক বিভিন্ন ঋণ খেলাপি ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি বিধি মোতাবেক ঋণের টাকা আংশিকভাবে জমা দিয়ে তাদের খেলাপি ঋণ হিসাবটিকে নিয়মিত করে নিয়েছেন। অনেকেই তাদের জমে থাকা বকেয়া গ্যাস, বিদ্যুত্, টেলিফোন ও পানির বিল জমা দিয়ে গ্রাহক হিসেবে নিয়মিত হয়েছেন। নির্বাচনের সুবাদে বিভিন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের একটা অংশ নিয়মিত হয়েছে।

জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন শুরু হয়। যেমন-২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতি ছিল তিন হাজার ২৭২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। সেখানে চলতি ২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বরে এই রিজার্ভের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ১৩৫ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভের পরিমাণ এক হাজার কোটি ডলারেরও বেশি কমে গেছে। নির্বাচনী বছরের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে। ঋণ প্রবৃদ্ধির হারও কমে যায়। কিন্তু তারপরও নির্বাচন এলে রিজার্ভের পরিমাণ কমতে থাকে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে নির্বাচনের আগে দেশের রাজনীতিতে যে অনিশ্চয়তা দেখা দেয় তাতে করে অনেকে বিদেশে টাকা পাচার করে দেন। আমদানি রপ্তানির আড়ালে বা হুন্ডির মাধ্যমে এসব টাকা পাচার হয়। যে কারণে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়ে।

বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উত্থান পতন হয়েছে। নির্বাচনের বছরের শুরুর দিকে রিজার্ভ বেড়ে রেকর্ড পরিমাণ উচ্চতা ছুঁয়েছে। এরপর নির্বাচনের কমপক্ষে ছয় মাস আগে থেকে রিজার্ভ কমতে শুরু করে। কোনো কোনো মাসে বাড়লেও পরিমাণে তা খুব কম। নির্বাচনী বা তার আগের মাসে রিজার্ভ কমে যায় বেশ। নির্বাচনের পর আবার বাড়তে শুরু করে। চলতি বছরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচনের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছিল। তারপরও আমদানি ব্যয় কমেনি। বরং আরো বেড়েছে। শুধু, সেপ্টেম্বরেই আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২৪ শতাংশের বেশি। আমদানি ব্যয়সহ অন্যান্য খাতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বাড়ার কারণে রিজার্ভে গিয়ে চাপ পড়ছে। সব মিলিয়ে এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।