বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ

বিশ্বে অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ১০ ভাগে নেমে এসেছে

সারাবিশ্বে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যেও অগ্রগতি হয়েছে। গত তিনদশকে বিশ্বে একশ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠে এসেছে। বিশ্বের অর্ধেক দেশে এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা তিন শতাংশের নিচে। গত তিন দশকে বিশ্বে এটা অনেক বড় অর্জন। কিন্তু এরপরেও বর্তমান বিশ্বে ৭৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দরিদ্র রয়ে গেছে। দরিদ্র হ্রাসের হার শ্লথ হয়েছে। দরিদ্রপীড়িত এই অঞ্চলেই দন্দ্ব, সংঘাত, সহিংসতা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৮ সালের বিদায় উপলক্ষে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক একটি পর্যালোচনা প্রকাশ করেছে। এতে মোটা দাগে বিশ্বের অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি উদ্বাস্তু বেড়ে যাওয়া, পরিবেশ দূষণ, শিশু পুষ্টিসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। দারিদ্র্য হার কমে আসা বিশ্বের জন্য বড় অর্জন হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই হ্রাসের গতি কমেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা রেকর্ড সাড়ে ৬ কোটি ছাড়িয়েছে। শিক্ষার হার বাড়লেও এর অর্ধেকও মানে নেই বলে উঠে এসেছে।

 

অতিদরিদ্র ১০ শতাংশে নেমেছে

পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯০ সালে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অতিদরিদ্র ছিল। তাদের আয় দৈনিক ১ দশমিক ৯ ডলারের নিচে ছিল। ২০১৫ সালে এসে বিশ্বে অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ১০ ভাগে নেমে এসেছে। বিশ্বে অন্য অঞ্চলে দারিদ্র্য কমলেও আফ্রিকার সাব সাহারা অঞ্চলে বাড়ছে। ১৯৯০ সালে সাব সাহারান অঞ্চলে ২৭ কোটি ৮০ লাখ হতদরিদ্র ছিল। ২০১৫ সালে তা বেড়ে ৪১ কোটি ৩০ লাখে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র ২৮টি দেশের মধ্যে ২৭টিই সাব সাহারা এলাকায়।

 

বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা রেকর্ড

ছাড়িয়েছে

এবছর বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী বিভিন্ন দেশ থেকে দেশের অভ্যন্তরে বা দেশের বাইরে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এখন ৬ লাখ ৮৫ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ৪ লাখ মানুষ দেশের অভ্যন্তরে এবং বাকিরা দেশের বাইরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। নির্যাতন, দ্বন্দ্ব বা সহিংসতার কারণে এসব মানুষ বস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০১৭ সালে ৮৫ ভাগ উদ্বাস্তু রয়েছে উন্নয়নশীল বিশ্বে। ধনী দেশগুলোতে মাত্র ১৫ ভাগ উদ্বাস্তুর স্থান হয়েছে। এরমধ্যে শুধু জার্মানীতে রয়েছে ৯ লাখ ৭০ হাজার। মাথাপ্রতি হিসাব করলে বর্তমান বিশ্বে লেবাননে সবচেয়ে বেশি উদ্বাস্তু রয়েছে। দেশটির প্রতি চার জনের একজন সিরিয়ান উদ্বাস্তু। তাদের ৭৯ ভাগই দারিদ্র্য সীমার নিচে। উগান্ডায় দক্ষিণ সুদানের ১০ লাখ শরণার্থী রয়েছে। ২০১৭ সালে মাত্র একশ দিনের মধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমারের ৬ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। ১০ লাখ রোহিঙ্গা শুধু কক্সবাজার জেলার ক্যাম্পেই আশ্রয় নিয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটে ভেনেজুয়েলা ছেড়েছে ৩০ লাখ মানুষ। যদিও কাগজে কলমে তাদের উদ্বাস্তু বলা হয়নি।

৩৩ শতাংশ বর্জ্য খোলা জায়গায়

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বেহাল চিত্রও তুলে ধরে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক বলছে, বিশ্বের ৩৩ শতাংশ বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলা হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অপ্রতুলতার কারণে খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলা হয়। নিম্ন আয়ের দেশের ৯৩ শতাংশ বর্জ্য রাস্তার পাশে, খোলা জায়গায় কিংবা পানিতে ফেলা হয় কিংবা পোড়ানো হয়। অন্যদিকে উচ্চ আয়ের দেশের মাত্র ২ শতাংশ বর্জ্য এমন জায়গায় থাকে। ২০১৬ সালের হিসাবে সারা বিশ্বে ২৪ কোটি ২০ লাখ টন শুধু প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়েছে। অপরিকল্পিত উন্নয়নে শহরগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ক্রমেই কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। সরকারিভাবে যে খরচ করা হচ্ছে তাতে অর্ধেক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। এজন্য বেসরকারি খাত ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদ্যোগী হতে হবে।

 

নির্মল বায়ু সীমার বাইরে ৯১ ভাগ মানুষ

বর্তমান বিশ্বে প্রতি দশ জনের একজন দূষিত বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে। ১০৮টি দেশের ৪৩০০ শহরের তথ্য নিয়ে করা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বায়ু তুলনামূলক বেশি দূষিত। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী বছরে ৭০ লাখ মানুষ বায়ু দূষণের কারণে মৃত্যুবরণ করছে। এর মধ্যে ৪২ লাখ মানুষ উচ্চ কার্বন দূষণজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করছে।

 

বিশ্বে বর্তমানে ১৫ কোটি শিশু খর্বাকায়

বর্তমান বিশ্বে ২৬০ কোটি মানুষের যথাযথ মানের টয়লেট ও সুপেয় পানি সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে। অপর্যাপ্ত স্যানিটেশনের কারণে বছরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেইসঙ্গে পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে শিশুরা খর্বাকায় হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বে বর্তমানে ১৫ কোটি শিশু খর্বাকায়। এসব শিশু মায়েদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত যত্ন পাচ্ছে না। পুষ্টিহীনতা এবং অসুখের কারণে তাদের স্বাভাবিক বািকশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অর্ধেকের শিক্ষার্থী ন্যূনতম মানের শিক্ষা পাচ্ছে না

আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমান বিশ্বে শিক্ষার হার বেশি। অনেকটা নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে শিক্ষায়। তবে এখন সময় এসেছে শিক্ষাকে যথাযথমানে উন্নীত করার। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ১৬০টি দেশের তথ্য নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল বিশ্বে অর্ধেকের মতো শিক্ষার্থী ন্যূনতম মানের শিক্ষা পাচ্ছে না। এর কারণ নিম্ন আয়ের দেশের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির অভাব। ২৬ কোটি শিশু ও তরুণ কখনোই স্কুলে যায়নি।