প্রত্যন্ত এলাকায় মিলছে না ১০ টাকার চাল!

করোনার কালে সহায়তা হিসেবে সরকার খোলাবাজারে চালের দাম কমিয়ে ১০ টাকা করলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই সুবিধা পাচ্ছেন না প্রত্যন্ত এলাকার নিম্ন আয়ের লোকজন। গত ৫ এপ্রিল থেকে সরকারি উদ্যোগে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি শুরু হলেও বাস্তবে এই সুবিধা জেলা সদর ও বড়োজোর পৌর এলাকা পর্যন্ত যাচ্ছে। কিন্তু প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি এবং কোথাও কোথাও লকডাউনের কারণে প্রান্তিক কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমজীবী, দিন এনে দিন খাওয়া ও নিম্ন আয়ের মানুষ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও গ্রাম পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।

অন্যদিকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারাদেশে দুস্থ ও হতদরিদ্রদের মধ্যে চলমান ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমেও সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকারিভাবে ত্রাণের পাশাপাশি অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও ত্রাণ বিতরণ করছেন। রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি এলাকায় খবর নিয়ে জানা গেছে, ঘটনা এমন ঘটছে যে সরকারিভাবে যেখানে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একই স্থানে ব্যক্তি উদ্যোগেও ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে ঘুরেফিরে একই ব্যক্তি সরকারের ত্রাণও পাচ্ছেন, আবার ব্যক্তি উদ্যোগে দেওয়া ত্রাণও পাচ্ছেন। এতে বৃহত্ সংখ্যার দুস্থ মানুষ কোনো ধরনের ত্রাণই পাচ্ছে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আকাশ কুমার ভৌমিক ইত্তেফাককে বলেন, সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগের ত্রাণের মধ্যে সমন্বয় থাকাটা জরুরি। যারা ব্যক্তি উদ্যোগে ত্রাণ দেবেন, তারা যদি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আগে থেকে অবহিত করেন, তাহলে সমন্বয়ের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করা যেতে পারে। তার মতে, যে এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ ত্রাণ দেবেন, সেখানে আর সরকারি ত্রাণ না দিলেও চলবে। সেক্ষেত্রে সরকারি ত্রাণ আরেক এলাকায় দেওয়া যেতে পারে। এভাবে সমন্বয় করা সম্ভব হলে হতদরিদ্র, দুস্থ কিংবা ত্রাণ প্রয়োজন এমন সবাইকে ত্রাণের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। তাহলে খুব বেশি দুস্থ ত্রাণপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবেন না।

একাধিক সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকারের কয়েক জন জনপ্রতিনিধি ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রকৃত দুস্থ মানুষের সংখ্যার বিপরীতে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ত্রাণের পরিমাণও অপ্রতুল। কোনো কোনো ইউনিয়নে ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষের বসবাস, তাদের মধ্যে দুস্থ রয়েছে কয়েক হাজার। কিন্তু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে উপজেলায় যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তা ভাগ করলে একটি ইউনিয়নের জন্য যে পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী বরাদ্দ পড়ে, তা বড়োজোর ১০০ থেকে ১৫০ জন দুস্থের মাঝে বিতরণ করা সম্ভব হয়। এতে বৃহত্ সংখ্যার দুস্থ মানুষ ত্রাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে কয়েক জন জনপ্রতিনিধি জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে যে বরাদ্ধ দেওয়া হচ্ছে, তাতে প্রতি পরিবারকে ১০ কেজি চাল, ৫ কেজি আটা, ২ কেজি লবণ, ১ কেজি চিনি, ১ লিটার তেল ও নুডল্স দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এই খাদ্যসামগ্রী দিয়ে একটি পরিবার হয়তো সপ্তাহখানেক চলতে পারে। এরপর তাদের নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সেই চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ খুবই কম।

এই জনপ্রতিনিধিরা জানান, গ্রামাঞ্চলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী, মসজিদের ইমাম-মোয়াজ্জিন এবং নিম্ন-মধ্যবিত্তদের অনেকে প্রয়োজন থাকলেও লজ্জায় ত্রাণ নিতে আসেন না। সেক্ষেত্রে ওএমএসের ১০ টাকার চালের জন্য তাদের কার্ড করে দেওয়া যেতে পারে। তখন তারা কার্ড দিয়ে যে কোনো প্রতিনিধিকে পাঠিয়ে চাল সংগ্রহ করতে পারেন। একইভাবে তারা সরকারি ত্রাণও পেতে পারেন। কিন্তু এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।