করোনায় কাজকর্ম বন্ধ, অপ্রতুল ত্রাণ

মধুপুরে খেতমজুরদের উনুনে উঠছে না হাঁড়ি

চতুর্দিকে আনারস আর কলাবাগান। মাঝখানে গ্রাম জাঙ্গালিয়া। পাকা রাস্তা ছেড়ে মেঠোপথে ২০ মিনিট হাঁটলেই সামনে পড়ে মাটির ঘরের ভাঙাচোরা চৌচালা। বাড়ির মালিক আমীর হোসেন। বয়স ৬৮। পেশায় বাঁশ শিল্পী। একমাত্র মেয়ে শ্বশুরবাড়ি। একমাত্র পুত্র আট বছর ধরে নিরুদ্দেশ। জমি বলতে পাঁচ কাঠা ভিটে। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত স্ত্রী রোকেয়া বেগমকে নিয়ে সংসার। দিন ভালোই যাচ্ছিল। এ গ্রাম সে গ্রাম থেকে বাঁশ কিনে এনে বানাতো ঝুড়ি, টোপা, ডোল, ঝাটাসহ দরকারি জিনিস। হাটবাজারে বিক্রি করে তা দিয়েই চলত দুই জনের সংসার। কিন্তু সর্বনাশা করোনা আমীর হোসেনের কপাল ভেঙেছে। আশপাশের সব গ্রাম এখন লকডাউনে। বাঁশ কেনার উপায় নেই। কষ্ট করে বাঁশ কিনে দিনমান খেটে পণ্য তৈরি করলেও হাটবাজার বন্ধ থাকায় বিক্রি হচ্ছে না। আয়রোজগার একদম বন্ধ হওয়ার পর পাড়াপড়শিদের ধারদেনায় কয়েক দিন চলেছে। 

পড়শিদের প্রায় সবাই আবার দিনমজুর বা স্বল্প আয়ের মানুষ। পাঁচ দিন আগে ধারদেনা বন্ধ হয়ে যায়। টানা দুই দিন না খেয়ে থাকার খবর পেয়ে গ্রামের যুবক জাহাঙ্গীর কবীর এগিয়ে আসেন। কিছু চাল ডাল তুলে দেয় তার হাতে। তা দিয়েই চলেছে চার দিন। আজ বাদে কাল থেকে আবার অনাহারের পালা শুরু হবে। শুধু আমীর হোসেন নয়, ঐ গ্রামের মৃত কাশেম আলীর স্ত্রী কুলসুম বেগম, আজিজুল ইসলামের স্ত্রী জনফা বেগম, লাল মিয়ার স্ত্রী শাহানা বেগমসহ ৪০০ দরিদ্র পরিবারের একই দশা। তাদের কারো বাড়িতে দিনে একবেলা, কারো বাড়িতে এক দিন পর পর চুলা জ্বলে।

ঐ গ্রামের সংবাদকর্মী লিটন জানান, গ্রামে প্রায় ৩ হাজার একরে আনারস, কলা ও পেয়ারা চাষ হয়। বাগানের সব মালিক বহিরাগত মহাজন। করোনার ভয়ে তারা এলাকায় আসছেন না। এমতাবস্থায়, ফলবাগানে দিনমজুরি বন্ধ। শ্রমিকরা তাই হাতগুটিয়ে বসে আছে।

জাঙ্গালিয়া দক্ষিণ গ্রামের শামসুল হক জানান, গ্রামের চায়ের দোকান বন্ধ। লকডাউনের দরুন যান চলাচল বন্ধ। এসবের সঙ্গে জড়িতরাও বেকার। গ্রামের অতি দরিদ্ররা সরকারি ত্রাণ পায়নি। অনেকের অনাহারে দিন যাচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা শেডের জরিপে দেখা যায়, মধুপুর বনাঞ্চলের চারটি ইউনিয়নে কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা ৭ হাজার ৬১ জন। এর মধ্যে ফলবাগানে কাজ করেন প্রায় ২ হাজার ৫০০। এর সিংহভাগ আবার নারী ও গারো।

রবিবার সরেজমিন খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, শুধুমাত্র জাঙ্গালিয়া ও মাগন্তিনগর গ্রামে দিনমজুরের সংখ্যা প্রায় ৫৫০। এদের মধ্যে তিন দফায় সরকারি খাদ্য সহায়তা পেয়েছে মাত্র ৫০টি পরিবার।

বেড়িবাইদ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার তুষার রেমা জানান, করোনায় ঘরে বসে থাকা দিনমজুরসহ খেটে খাওয়া অসহায় মানুষের ঘরে এখন খাবার নেই। ত্রাণের জন্য এরা প্রতিদিনই তার বাড়িতে ছুটে আসছে। কিন্তু সরকারি ত্রাণ এতটাই অপ্রতুল যে তা নিয়ে কাড়াকাড়ি ও ঝগড়াবিবাদ হচ্ছে। দরিদ্র গারোদের জন্য তিনি আলাদা বরাদ্দের দাবি জানান।

বেড়িবাইদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জুলহাস উদ্দীন জানান, ঐ ইউনিয়নে এ পর্যন্ত ৫০০ দুস্থ পরিবারকে সরকারি ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। জাঙ্গালিয়া গ্রাম দিনমজুরের গ্রাম। ঐ গ্রামের স্বল্পসংখ্যক পরিবারকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। ৩১০ জনের তালিকা করা হয়েছে। সরকারি ত্রাণ আগামীতে এলে এদের মধ্যে একটু বেশি বিতরণ করা হবে।

মধুপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফা জহুরা জানান, এ পর্যন্ত পাঁচ ধাপে বরাদ্দ পাওয়া ৫৫ টন চাল এবং নগদ ১ লক্ষ টাকা দরিদ্রদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বন্টন করা হয়েছে। জাঙ্গালিয়ার মতো অতিদরিদ্র এলাকায় প্রয়োজনে বাড়তি ত্রাণ বিতরণ করা হবে।

ইত্তেফাক/বিএএফ