কোয়ারেন্টাইনে রামাদানের প্রস্তুতি

সারা বিশ্বব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছে মহামারি করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯। গত শতাব্দীর শত চেষ্টায় গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সীমানায় নির্ধারিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনীতি, সমাজনীতি ও বিশ্ব চরাচরের সরবরাহ ব্যবস্থা হুমকির সম্মুখীন। বিভিন্ন নামে আমরা পৃথিবী নামক গ্রহটিকে বিভক্ত করে ফেললেও প্রকৃতিকে ভাগ করতে পারিনি। পারা সম্ভবও নয়। জলে স্থলে যে বিপর্যয় একের পর এক আসছে তা তো মানুষের হাতের অর্জন। আমরা মনে করি, এ অর্জনের একটি রূপ এই মহামারি। এ থেকে আমাদের নিষ্কৃতির জন্য আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। সতর্কতার সব প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে আমাদের কৃতকর্মের জন্য পানাহ চাইতে হবে। এর একটি মোক্ষম সুযোগ রামাদান। রামাদানে শয়তান শৃঙ্খলিত থাকে, আল্লাহ তার রহমতের ভান্ডার উজাড় করে দেন, প্রত্যেকটি নেকির অনেক গুণ বৃদ্ধির ব্যাপারে হাদিসে এসেছে। মুত্তাফাকুন আলাইহের হাদিস, ‘রামাদানের সওম কেবল আল্লাহর জন্য আর আমি এর প্রতিদান দেব।’ 

কোরআন ও হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, রমজানের সাওম মানুষের আত্মিক উন্নতিকে একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। ইসলামের সব ফরযের বাহ্যিক কিছুটা রূপ আছে। সাওমেরও আছে। কিন্তু এ সওমের যে শর্তগুলো আছে তা একান্তই ব্যক্তি ও তার রবের মধ্যে নির্ধারিত। খাওয়া, পান করা ও জৈবিক-কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার বিষয়টি একান্তই গোপনীয়, যা আল্লাহ ও ব্যক্তি ছাড়া কেউ জানার উপায় নেই। সুতরাং এ বিশেষ তাকওয়ার মাসে মুসলমানদের নিজেদের প্রস্তুত করে নেওয়ার এক বিশেষ সুযোগ। এ সুযোগকে অবশ্যই আমাদের কাজে লাগাতে হবে।

করোনার ন্যায় এরূপ বিশ্বগ্রাসী হুমকির মুখোমুখি পৃথিবী এরূপ আর হয়নি। অনেক মহামারি এসেছে কিন্তু একত্রে সারা বিশ্বকে এরূপ স্তম্ভিত করেনি। এটাও বর্তমান টেকনলজিক্যাল উন্নত বিশ্বের অসহায়ত্বের এক প্রমাণ। এ মহামারির কারণে বায়তুল্লাহ-এ নামাযে মুসল্লি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, তারাবিহ খুবই সংক্ষিপ্ত ও অল্প মুসল্লিসহ হবে। সারা বিশ্বের সব উলামা, ফতওয়া কাউন্সিল বিশেষ করে সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি, আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় ও দেওবন্দ মসজিদের মুসল্লি নিয়ন্ত্রণ এবং যে কয় জন যাবেন তারা মিনিমাম তিন ফিট দূরত্বে দাঁড়িয়ে তারাবিহ ও অন্যান্য সালাত আদায়ের ব্যাপারে ফতোওয়া জারি করেছেন। বাংলাদেশেও সরকার আলেম ওলামার সঙ্গে আলোচনা করে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে পাঁচ জনের বেশি মসজিদে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। কোনো আবেগ দিয়ে নয়, বিষয়টি বাস্তবতার আলোকে ধর্মীয় রেফারেন্সের আলোকে বিবেচনা করে মেনে নিতে হবে।

আমার এক বন্ধু সৌদি আরব থেকে প্রায় তিনশ পৃষ্ঠার সারা বিশ্বের আলেমদের ফতোওয়া-সংবলিত পিডিএফ বই পাঠিয়েছে যাতে সবাই উল্লিখিত ফতোয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন। হোম কোয়ারেন্টাইনে আমাদের পরিবারের সঙ্গে সময় দেওয়া, তাবারিহসহ সব নফল ইবাদত এক সঙ্গে করার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে—তা আমাদের গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে আমাদের সন্তানদের এ সুযোগে ধর্মীয় বিষয়গুলো শিক্ষা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন নামাযের আগে সবার সঙ্গে কোনো একটি ধর্মীয় ও নৈতিক বিষয়ে ছোটো আলোচনা করা যেতে পারে। এখন প্রচুর বাংলা বই মার্কেটে বা ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। এ সুযোগে কোনো একটি মাসআলা বা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার বই নির্ধারণ করে আমরা প্রতিদিন নামাযের আগে পাঠের ব্যবস্থা করতে পারি। সন্তানদের এরূপ কাজে উত্সাহিত করার জন্য তাদের ভালোভাবে রামাদান পালন শেষে পুরস্কারের ঘোষণা দিতে পারি। এতে বাচ্চাদের মধ্যে সাওম যথাযথভাবে পালনের প্রতিযোগিতা বাড়বে। আমাদের সমাজে ধর্মীয় দিক থেকে নারীরা অনেকটাই অবহেলিত। তাদের ধর্মীয় শিক্ষা, চলাচল ও সামাজিক অবদানের ব্যাপারে অনেক সময় একশ্রেণির ধর্মপ্রচারকের মধ্যে নেগেটিভ প্রচারণা লক্ষ করা যায়। অনেকের দ্বান্দ্বিক প্রচারণার কারণেই নারীরা ইসলাম পালনে আগ্রহী হন না। এ সুযোগে আমাদের নারী সমাজে ইসলাম সম্পর্কে ভ্রান্তি দূর করার কাজ করা যেতে পারে। রসুল (স) নারীদের যে মর্যাদা দিয়েছেন, ইসলাম নারীদের ধর্মীয় সীমার মধ্য থেকে সব কার্যক্রম করার অনুমতি দিয়েছে। বিষয়টি কোরআন, হাদিসের আলোকে বোঝালে সমাজে ইসলাম প্রতিপালন আরো অনেক সহজ হয়ে যাবে। আর বেশি করে নফল নামায ও দানের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। আমরা সমর্থবানেরা নিজেদের খরচ আর অতিরিক্ত বাজারঘাট না করে সমাজের যারা অনাহারী আছে তাদের কাছে আমাদের খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়াটা বর্তমান সময়ে অন্যতম সওয়াবের কাজ হবে বলে আমরা মনে করি। মনে রাখতে হবে একজন মানুষ না খেয়ে থাকলে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে আমাদের মর্যাদা প্রশ্নের সম্মুখীন হবে।

l লেখক :অধ্যাপক, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া