শি'র 'কথামত চলা' কূটনীতিবিদরা কী চীনের ভালোর চেয়ে বেশি ক্ষতি করছেন?

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে যখন পুরো বিশ্ব বিপর্যস্ত, নিজ দেশকে বাঁচাতে বেশির ভাগ রাষ্ট্রই মরিয়া তখন চীন ব্যস্ত অন্য এক 'যুদ্ধে'। দেশটি ইতিমধ্যে করোনার লড়াইয়ে জয়ী হলেও এখন নামতে হয়েছে অন্য লড়াইয়ে। চীনের কূটনীতিবিদরা বর্তমানে করোনা নিয়ে দেশের সমালোচনা বিরুদ্ধে ও এই ভাইরাসের আবির্ভাব নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে 'হিমশিম' খাছে। 

দেশটির সমালোচক ও বিরোধীরা চীনের বিরুদ্ধে করোনা নিয়ে ন্যায়বিচার এবং ক্ষতিপূরণ পেতে কিংবা কোনভাবে 'বলির পাঠা' বানাতে মরিয়া।  

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে চীনের বিজ্ঞ বিজ্ঞ কূটনীতিবিদদের স্বাগতিক দেশগুলোর বিরুদ্ধে কথার লড়াইয়ে জড়িত হতে দেখা গেছে।  

গত সপ্তাহেই ফ্রান্স, কাজাখস্তান, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা, ঘানা এবং আফ্রিকান ইউনিয়নে নিযুক্ত চীনা কূটনীতিবিদদের তলবের মুখে পড়তে হয় দেশটির গুয়াংজুতে বসবাসরত আফ্রিকানদের বর্ণবাদ আচরণের শিকার হচ্ছেন এই অভিযোগে।  

এর সঙ্গে করোনা নিয়ে আসল তথ্য লুকানো ও ভুল পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগে দেশটির বিরুদ্ধে  লড়াইয়ে আছে জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি রাজ্য তো চীনের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছে। 

সেইসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন করোনা ভাইরাস নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে 'গুরুতর' তদন্ত হবে। 

নিজেদের দেশের  মধ্যে করোনার বিস্তার আটকাতে পারেনি চীন এজন্য ১৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করার পর গত সপ্তাহে  জার্মান পত্রিকা 'বিল্ডের' সঙ্গে প্রকাশ্যে  তর্কে জড়িয়ে পরে বার্লিনে চীনা দূতাবাস। 

একই সময়ে কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় চীনের দূতাবাসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়,  স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের প্রপাগান্ডা প্রচার করছে। এসব দেশও  চীনের কাছে বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করেছে। 

এর আগে সুইডেন, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ড , জাপান, সিঙ্গাপুর এবং পেরুতে চীনের সিনিয়র কূটনৈতিকরা বিতর্কে জড়িয়ে আন্তর্জাতিক খবরের শিরোনামে আসেন। 

লন্ডনে এসওএএস চীনা ইন্সটিইউটের পরিচালক স্টিভ সাং বলেন, চীনের এমন আগ্রাসী  প্রচার ও কূটনীতি অন্যান্য দেশকে বৈরী করে তুলবে যা করোনা সংকট চলে যাওয়ার পর প্রভাব ফেলবে। 

তিনি আরও বলেন, এটি অবশ্যই অবশ্যই চীন এবং দেশটির নাগরিকদের সর্বোত্তম স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে, কেননা তারা বিশ্বায়নের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলিতে চীনের কূটনীতিতে রাষ্ট্রদূত এবং প্রবীণ কূটনীতিকদের পরিবর্তনকে 'উল্ফ ওয়ারিয়র' হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।  এটি ২০১৫ সালের দেশপ্রেম নিয়ে যুদ্ধের  চলচ্চিত্রের নাম অনুসারে করা হয়েছে। 

ফ্রান্সে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লু সায়ে বিতর্কের জন্য আগে থেকেই পরিচিত। কানাডায় রাষ্ট্রদূত হিসাবে দু'বছর থাকাকালীন  তিনি অটোয়ার সমালোচনামূলক সমালোচনার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। 

গত সপ্তাহেই ফরাসী পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিন-ইয়ভেস লে ড্রিয়ান লু'কে তলব করেন। অভিযোগ, চীনা দূতাবাসের ওবেবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন নিয়ে যেখানে বলা হয়, ফ্রান্সের নার্সিংহোমের কর্মীরা চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন এবং এতে 'বাসিন্দারা ক্ষুধা ও অসুস্থতায় মারা যাচ্ছে'।  

চীনের নীতির এই পরিবর্তন দেশটির উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের নেতৃত্বে মাধ্যমে হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্টিমসন সেন্টারের ( ওয়াশিংটন ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক) সিনিয়র ফেলো ইয়ান সান। তিনি বলেন, এসব নেতাদের মধ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং আছেন।  

সান আরও বলেন, কূটনীতিবিদরা শুধু শি'র সিন্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেন, কোন সিদান্ত পরিবর্তন করতে পারেন না। শি সকল কৌশল ঠিক করেন এবং কূটনীতিবিদরা তা অনুসরণ করেন। 

স্টিভ সাং বলেন শি'র আমলে চীনের কূটনৈতিক নীতির পরিবর্তন ঘটেছে। 

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিকালের গবেষণায় দেখা গেছে চীনের এমন নীতিতে বিশ্বব্যাপী তাদের  ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে।   

মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আমেরিকানদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জনগণ চীন সম্পর্কে প্রতিকূল ধারণা পোষণ করেছে।

এছাড়া ডিসেম্বরে আরেক গবেষণায় দেখা যায়, ছয়টি মহাদেশের ৩৪ টি ২৪ টি দেশের অংশগ্রহণকারীরা চীন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে। 

স্ট্রাটেজিক অ্যাডভাইজরি ফার্ম ব্রান্সউইকের ভূ-রাজনৈতিক অধ্যক্ষ এবং সিঙ্গাপুরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ ইয়ো বলেন সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পশ্চিমা দেশগুলিতে চীনবিরোধী মনোভাব খারাপ থেকে আরও খারাপ হয়েছে।

গত সপ্তাহে ব্রান্সউইকের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ইয়ো বলেন, করোনাকে কাটিয়ে উঠতে চীনের সাফল্যের প্রশংসা করা ব্যক্তিদের মধ্যেও চীনের কর্তৃত্ববাদী পন্থার প্রতি বিরোধিতা রয়েছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। 

ইত্তেফাক/এসআর