নাগরিকমত

কেন নতুন আবিষ্কৃত র‍্যাপিড টেস্টিং কিটের বৈজ্ঞানিক বৈধতা প্রয়োজন?

করোনাভাইরাস মহামারিতে বাংলাদেশ আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন এবং আজ আমাদের অনেক বেশি টেস্টিং কিট এর প্রয়োজন তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই প্রেক্ষিতে গণস্বাস্থ্যের আবিষ্কৃত র‍্যাপিড টেস্টিং কিট আমদেরকে আসার আলো দেখাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এই কিটের বৈজ্ঞানিক বৈধতা প্রমাণ করা খুব বেশি প্রয়োজন। কিন্তু কেনো তা প্রয়োজন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে আমাদের আরো কিছু বিষয় সম্পর্কে ধারনা থাকতে হবে।

টেস্টিং কিট এর বৈজ্ঞানিক বৈধতার এপিডেমিওলজিকাল কনসেপ্ট: করোনাভাইরাসের যেকোনো র‍্যাপিড টেস্টিং কিট বৈজ্ঞানিক বৈধতার জন্য যে দুটি কনসেপ্ট জানা দরকার তা হল: সেন্সিটিভিটি এবং স্পেফিসিটি। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে টেস্টিং কিট দ্বারা সঠিকভাবে শনাক্ত করার (True-positive) যে পার্সেনটেজ তাকে আমরা সেন্সিটিভিটি বলে থাকি। আর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নয় এমন ব্যক্তিকে টেস্টিং কিট দ্বারা সঠিকভাবে শনাক্ত করা যে তার দেহে করোনাভাইরাস নেই (true-negative) তার পার্সেনটেজকে আমরা স্পেফিসিটি বলি। যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির ভুল করে নেগেটিভ রেজাল্ট আসে তাকে false-negative বলা হয়। একইভাবে আক্রান্ত নয় এমন ব্যক্তির ভুল করে পজিটিভ রেজাল্ট আসলে তাকে false-positive বলা হয়।

সকলের বোঝার সুবিধার জন্য আমি কেবল সেন্সিটিভিটি এবং false-negative নিয়ে আলোচনা করবো। কারণ করোনাভাইরাসের মত সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে এগুলি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, আপনি ১০০ জন RT-PCR করোনাভাইরাস পজিটিভ রোগীর মধ্যে র‍্যাপিড টেস্টিং কিট ব্যবহার করে ৭০ জনকে পজিটিভ রেজাল্ট দিয়েছেন। তার মানে এই কিটের সেন্সিটিভিটি ৭০% এবং false-negative রেজাল্ট দেবার হার ৩০%।

কিন্তু RT-PCR-ও false-negative রেজাল্ট দেয়। তাহলে র‍্যাপিড টেস্টিং কিট এর false-negative এ সমস্যা কোথায়?

কথাটি সত্য। RT-PCR এর অনুমোদন দেবার জন্য সেন্সিটিভিটি কমপক্ষে ৯০% হতে হয়, অর্থাৎ ১০% বা তার কম false-negative হতে হবে। কিন্তু ক্লিনিক্যাল সেটিং এ বুকের সিটি স্ক্যান (main chest CT findings were ground-glass opacities, local patchy shadowing, bilateral patchy shadowing, or interstitial abnormalities) এর সাথে তুলনা করে দেখা গিয়েছে যে RT-PCR এর সেন্সিটিভিটি কম: ৬৬% থেকে ৮০%।

কিন্তু যারা এই উদাহরণ টেনে র‍্যাপিড টেস্টিং কিটের পক্ষে সাফাই দিচ্ছেন তারা মারাত্মক একটি ভুল করছেন। কিভাবে? আসুন তার একটু বর্ণনা দেখে নেই।

RT-PCR এর তুলনা করা হয়েছে বুকের সিটি স্ক্যান এর সাথে আর সেরোলজিকাল টেস্টিং কিটের তুলনা করা হচ্ছে RT-PCR এর সাথে। RT-PCR এর নিজের সেন্সিটিভিটিই যদি কম থাকে (যাকে আমরা Alloyed Gold Standard বলে থাকি), তাহলে তার সাথে তুলনা করে পাওয়া টেস্টিং কিট এর সেন্সিটিভিটি আরো কমে যাবে।

কি কঠিন লাগছে বিষয়টি? আসুন, উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। আলোচনার সুবিধার জন্য ধরে নেই RT-PCR এবং র‍্যাপিড টেস্টিং কিট উভয়েরই সেন্সিটিভিটি ৭০%। আপনাকে হাসপাতাল থেকে ১০০ জন বুকের সিটি স্ক্যান করে কনফার্মড করোনা ভাইরাস পজিটিভ রুগী দেয়া হল। আপনি RT-PCR করে তাদের মধ্যে ৭০ জনকে শনাক্ত করেছেন। যেহেতু র‍্যাপিড টেস্টিং কিট এর বৈজ্ঞানিক বৈধতা RT-PCR এর সাথে তুলনা করে করা হচ্ছে, সেহেতু আপনি সেই ৭০ জনকেই পরবর্তী ধাপে পজিটিভ কেস হিসেবে চিন্তা করবেন, ১০০ জনকে নয়। যেহেতু আমরা র‍্যাপিড টেস্টিং কিট এর সেন্সিটিভিটি ৭০% ধরেছি, সেহেতু আপনি সেই ৭০ জনের ৭০% অর্থাৎ ৪৯ জনকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারবেন। অর্থাৎ, অরিজিনাল ১০০ জন কনফার্মড করোনাভাইরাস পজিটিভ রুগীর মধ্যে আপনি মাত্র ৪৯ জনকে শনাক্ত করবেন।

তবে এর মধ্যে একটি শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। RT-PCR যেই ৩০ জনকে নেগেটিভ বলেছে, র‍্যাপিড টেস্টিং কিট হয়ত তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে পজিটিভ শনাক্ত করতে পারতো। কিন্তু সেটি জানার জন্য আমাদেরকে বুকের সিটি স্ক্যান করে কনফার্মড করোনাভাইরাস পজিটিভ রোগীর রক্তের সাথে তুলনা করতে হবে, RT-PCR এর সাথে নয়। RT-PCR যদি খারাপ হয়ে থাকে, গণিতের প্রবাবিলিটির রুল ফলো করে তার সাথে তুলনা করে পাওয়া রেজাল্ট আরো খারাপ হবে। আর বুকের সিটি স্ক্যান করে কনফার্মড করোনাভাইরাস পজিটিভ রুগীর রক্তের সাথে সেন্সিটিভিটি তুলনা করাটা অনেক কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ একটি বিষয়। তাই এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সব দেশে RT-PCR এর সাথেই তুলনা করে র‍্যাপিড টেস্ট এর বৈজ্ঞানিক বৈধতা হিসেব করা হচ্ছে।

মোটকথা, RT-PCR এবং র‍্যাপিড টেস্টিং কিট উভয়েরই সেন্সিটিভিটি ৭০% যদি হয়েও থাকে, তাদের হিসেব কিন্তু এক নয়।

আরেকটি বিষয় হলো, র‍্যাপিড টেস্ট এর সেন্সিটিভিটি রোগের উপসর্গ আসার কতদিন পর টেস্ট করা হচ্ছে তার উপর নির্ভরশীল। র‍্যাপিড টেস্ট যেহেতু রক্তে অ্যান্টিবডির মাত্রার উপর নির্ভর করে, তাই রোগের উপসর্গ আসার কতদিন পর টেস্ট করা হচ্ছে তার সাথে সেন্সিটিভিটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমেরিকার UCSF এবং UC Berkeley এর গবেষকরা ১২ টি র‍্যাপিড টেস্ট কিট এর সেন্সিটিভিটি তুলনা করেছেন সময়ের সাথে (সংযুক্ত উপরের ছবিটি দেখুন অথবা এই লিংকে গিয়ে দেখুন https://covidtestingproject.org)। এখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে রোগের উপসর্গের প্রথম ৫ দিনে সবগুলি র‍্যাপিড টেস্ট এর সেন্সিটিভিটি ৩০% বা তার আশেপাশে। আবার উপসর্গ আসার দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সেন্সিটিভিটি অনেক বেশি - প্রায় ৮০% বা তারও বেশি। অর্থাৎ, অ্যান্টিবডি ভিত্তিক র‍্যাপিড টেস্টগুলি past infection শনাক্ত করতে বেশি সহায়তা করবে।

আমি জানি অনেকে এখন বলবেন গণস্বাস্থ্যের কিট এন্টিজেন এবং অ্যান্টিবডি দুটিই দেখবে। তাই তাদের কিট আরো ভাল কাজ করবে। কিন্তু এখানে জানা প্রয়োজন যে, মাত্র ১% থেকে ৩% ভাইরাস রক্তে আসে, তাই রক্তে এন্টিজেন শনাক্ত করে খুব ভাল রেজাল্ট পাওয়া কঠিন। এমন কোন সায়েন্টিফিক এভিডেন্স এখনও পাওয়া যায়নি, তাই এই দাবিরও বৈজ্ঞানিক বৈধতা দরকার।

আর যেসব ডাক্তাররা আশা করছেন যে রোগী আসা মাত্রই র‍্যাপিড টেস্ট করে আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবেন যে রোগী করোনা আক্রান্ত কিনা, তারাও একটু ভেবে দেখুন। আপনার রোগীর উপসর্গ যদি ৫ দিনের কম হয়, তাহলে আপনি মাত্র ৩০% ক্ষেত্রে জানতে পারবেন যে তার করোনা রয়েছে। আবার আপনার রোগীর যদি past infection (দুই সপ্তাহের বেশি সময় আগে) থেকে থাকে, তাহলে র‍্যাপিড টেস্ট ৮০% বা তার বেশি ক্ষেত্রে পজিটিভ হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে সেই রোগী কিন্তু সংক্রামক নয়। আপনি তাকে RT-PCR করে কনফার্ম না করা পর্যন্ত কোনভাবেই শিওর হতে পারছেন না যে তার active infection আছে কিনা। তাই পয়েন্ট অফ কেয়ার এ triage system এবং ক্লিনিক্যাল ডিসিশন আরও বেশি উপকারী হতে পারে।

আবার ল্যাবে সেন্সিটিভিটি অনেক বেশি পাওয়া মানেই কিন্তু সব সমস্যার সমাধান নয়। Shenzhen Bioeasy ল্যাবে তাদের র‍্যাপিড কিটের সেন্সিটিভিটি দেখিয়ে ইউরোপিয়ান লাইসেন্স পেয়েছিল। কিন্তু স্পেন সেটি ব্যবহার করে মাত্র ৩০% সেন্সিটিভিটি পেয়েছে এবং আমদানিকৃত কিট ফেরত পাঠিয়েছে। তার কারণ হতে পারে ল্যাবে যেসব রক্তের উপর পরীক্ষা করা হয়, সেগুলি অপেক্ষাকৃত সিরিয়াস রোগীর থেকে আসা। যাদের উপসর্গ কম তাদের ক্ষেত্রে সেন্সিটিভিটি অনেক কম হচ্ছে অ্যান্টিবডির মাত্রা কম বলে হয়ত।

তাহলে কি র‍্যাপিড টেস্ট কিটের কোন প্রয়োজন নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটি করোনাভাইরাস এর active রোগ শনাক্তের জন্য নয়। যেহেতু এইসব কিটের সেন্সিটিভিটি অ্যান্টিবডির মাত্রার উপর ভিত্তি করে, তাই জনসংখ্যার কত পারসেন্ট পূর্বে আক্রান্ত হয়েছে তা জানার জন্য Serological surveillance গবেষণার জন্য র‍্যাপিড টেস্ট প্রয়োজন। সেটি করার জন্য কিন্তু RT-PCR আর কাজে আসবে না, কারণ RT-PCR পূর্বের ইনফেকশন শনাক্ত করতে পারে না। আবার লকডাউন খুলে দেবার জন্য 'immunity passport' এর যে আইডিয়াটি রয়েছে, সরকার যদি সেটি বাস্তবায়ন করতে চায়, সেক্ষেত্রেও র‍্যাপিড টেস্ট প্রয়োজন।

তাহলে এই মুহূর্তে সরকারের করনীয় কি?

প্রথমত, দেশে RT-PCR টেস্ট কিটের সংখ্যা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। কারণ, একটিভ কেস কনফার্মডভাবে ডিটেকশন করার জন্য RT-PCR এর বিকল্প নেই। WHO বার বার যে টেস্ট করার কথা বলছে, সেটি RT-PCR-এর মাধ্যমে, র‍্যাপিড টেস্টে নয়।

দ্বিতীয়ত, যেহেতু উপরে বর্ণিত কারণগুলির জন্য র‍্যাপিড টেস্ট আমাদের একসময় লাগবেই, তাই গণস্বাস্থ্য সহ সকল র‍্যাপিড টেস্ট কিটের বৈজ্ঞানিক বৈধতা কিভাবে দ্রুততম সময়ে নিশ্চিত করা যায়, সেই ব্যাপারে একটি দিক-নির্দেশনা দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। প্রয়োজন হলে এই বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, র‍্যাপিড টেস্ট কিটের বৈজ্ঞানিক বৈধতা নিয়ে দ্রুত এথিকাল আপ্রুভাল নিশ্চিত করতে একটি আলাদা এথিকাল রিভিউ কমিটি করা যেতে পারে।

পরিশেষে, যারা ভাবছেন বৈজ্ঞানিক বৈধতা করতে বহু সময় ক্ষেপণ হবে তাদেরকে বলতে চাই, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সরকার দুপক্ষেরই যদি সদিচ্ছা থাকে তাহলে অনেক দ্রুত এটি করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, অক্সফোর্ডের Sara Gilbert এবং UK সরকার ভেকসিন এর ট্রায়াল খুব কম সময়ে শুরু করতে পেরেছে। তবে, করোনার মত ভয়াল শত্রু মোকাবিলা করার জন্য কিট, ভেকসিন আর ড্রাগ সবকিছুরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি শক্ত হতে হবে।

লেখক: পোস্টডক্টরাল গবেষক, দি ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস।

ইত্তেফাক/আরএ