এক হাতে লাগাম, অন্য হাতে চাবুক

বাল্যবিবাহ ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার চিত্র ফুটিয়ে তোলা বাংলাদেশি প্রামান্যচিত্র ‘অশ্বরোহী তাসমিনা’ ঘুরে আসে বিশ্বের বিভিন্ন নামীদামি উত্সবের আঙ্গিনা। প্রদর্শিত হবে অলিম্পাস পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত পিরগোস শহরে অনুষ্ঠিত অলিম্পিয়া ফিল্ম ফেস্টিভাল ফর চিল্ড্রেন অ্যান্ড ইয়ং পিপল-এ। প্রায় আঠারো মিনিট দৈর্ঘ্যের প্রামাণ্যচিত্রটিতে উঠে এসেছে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে নওগাঁ জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামের এগার বছর বয়সী এক বালিকা তাসমিনার গল্প। ১৪ বছরের কিশোরী তাসমিনা। এক হাতে থাকে লাগাম, অন্য হাতে চাবুক আর দু চোখজুড়ে স্বপ্ন প্রথম হওয়ার। এরই মধ্যে ‘দ্য হর্স গার্ল’ খ্যাত এই কিশোরী ঘোড়দৌড়ে বেশ নাম করেছে। বাজি ধরে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয় তাসমিনা। ছেলেদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেও প্রথম স্থান ছিনিয়ে আনছে সে। নিজের ঘোড়া না থাকার পরও অপ্রতিরোধ্য তাসমিনা। কিন্তু দারিদ্র্য এই কিশোরীর চলা পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নেওয়া তার শখ। তবে, যে গ্রামে তাসমিনার বাস, সেখানে পনের বছর বয়স হওয়ার আগেই বেশির ভাগ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। প্রতিযোগিতায় তাসমিনা যখন তারচেয়ে বেশি বয়সের পুরুষ প্রতিযোগীদের পিছনে ফেলে প্রতিযোগিতায় প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে নেয়, তখন দর্শকদের অভিনন্দন বা প্রশংসা জোটে ঠিকই, কিন্তু পুরস্কারের নগদ অর্থ কিংবা দামি পুরস্কারগুলো নিয়ে যান ঘোড়ার মালিক। তাসমিনার মনে নতুন স্বপ্ন বাসা বাঁধে এবার নিজেই একটি ঘোড়া কিনবে সে।

বাড়িতে ঘোড়া ছিল,তাই ছোটবেলা থেকে খেলার ছলে ঘৌড়দৌড় শেখে তাসমিনা। সেই ঘোড়া এখন নেই। কিন্তু, দরিদ্র পরিবারটির আয়ের সম্বল হয়ে উঠেছে সে। দারিদ্রতাকে জয় করতে পারলেই সে হয়ে উঠতে পারে দেশে নারী খেলোয়াড়দের পথিকৃত্। তাসমিনাকে আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী করে গড়ে তুলতে কাজ করছেন তার বাবা-মা। তাসমিনার মা তহুরা বেগম বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই মেয়ের ঘোড়ার শখ ছিল। ছোট একটা ঘোড়াও ছিল বাড়িতে। মেয়ে একদিন ওই ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে। দিনে দিনে ওর ভয় ভেঙে যায়। কিন্তু অভাবের কারণে ঘোড়াটি তাসমিনার বাবা বিক্রি করে দেন। পরে স্থানীয় লোকজন মেয়ের ঘোড়া চালানোর প্রতিভা দেখে বাকিতে ময়মনসিংহ থেকে ২০ হাজার টাকায় একটা ঘোড়া কিনে দেয়। এরপর যেখানেই প্রতিযোগিতা হয় সেখানেই মেয়েকে নিয়ে যায় তার বাবা। প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সব জায়গায় মেয়ে প্রথম হয়েছে।’

তাসমিনার বাবা ওবায়দুল হক বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে একমুঠো ভাত খেয়ে ঘোড়ার পিঠে ওঠে তাসমিনা। দুপুরে এসে দুটো খেয়ে আবার ঘোড়া নিয়ে বের হয়। সারাদিন ঘোড়ার পিঠেই থাকে। তার একটা বড় ঘোড়া চাই। আমরা গরিব মানুষ। ভিটে ছাড়া কিছুই নেই। কৃষিকাজ করি। বড় ঘোড়ার দাম অনেক। কোথায় পাব? মেয়ে অন্য মানুষের বড় ঘোড়া চালায়।’

তাসমিনা শুধু দেশে না, দেশের বাইরেও প্রথম হতে চায় সে। বাবার ঘোড়া কেনার টাকা নাই, তারপরও সে বড় হয়ে ঘোড় সওয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। বড় হয়ে পুলিশের চাকরি করতে চায় সে। কারণ, স্কুলের শিক্ষকের কাছে সে শুনেছে, পুলিশে ঘোড়-সওয়ার নামের পদ রয়েছে। সেখানে সে যোগ দিতে চায়। ঘোড়া চালিয়ে সে বিদেশের মাটি থেকেও দেশের সম্মান বয়ে নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখে। তাই যেকোনো মূল্যে তার একটি বড় ঘোড়া চাই। এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে দিন পার করছে সে।

নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার পূর্বচকসুবল গ্রামের ওবায়দুল হকের মেয়ে তাসমিনা। সে উপজেলার শংকরপুর উচ্চবিদ্যালয় ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

ছবি :রুপম পল্লব