কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী যেসব তরুণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন, তাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত কয়েকজনের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে ‘কুইন্স ইয়াং লিডার’স অ্যাওয়ার্ড চালু করে যুক্তরাজ্য সরকার। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সিংহাসন আরোহণের ৬০ বছর পূর্তিতে এই অ্যাওয়ার্ড চালু করা হয়। ২০১৪ সালে রানির ৯০তম জন্মদিনের দিন শুরু হয় এই অ্যাওয়ার্ড প্রদান এবং এবার ২০১৮ সালেই শেষবারের মতো প্রদান করা হলো এটি। এই চারবছরে কুইন্স ইয়াং লিডার’স অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে নিয়েছেন বাংলাদেশের ছয় তরুণ। যথাক্রমে তারা হলেন সামির শিহাব, ওসামা বিন নূর, সাজিদ ইকবাল, রাহাত হোসেন, আয়মান সাদিক ও জাইবা তাহিয়া। এদের মধ্যে আয়মান ও জাইবা ২০১৮ সালে শেষবারের প্রদান করা অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন।
আয়মান সাদিক
অনলাইন শিক্ষক হিসেবেই তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন এই তরুণ। ডিজিটাল শিক্ষার প্রসারে অবদান রাখায় কুইন্স ইয়াং লিডার’স অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন তিনি। সেনা কর্মকর্তা বাবার সন্তান আয়মান নিজে ভিন্ন কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন। তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে পড়াশোনা শুরু করেন, তখন প্রায়ই বিভিন্ন বিষয়ে ইউটিউবের টিউটোরিয়ালের সহায়তা নিতেন। খান একাডেমিও তাকে প্রভাবিত করত। এ ছাড়াও কোচিং সেন্টারে পড়াতে তার বেশ ভালো লাগত। শিক্ষক হবেন, এটা ধরেই নিয়েছিলেন। তখন থেকেই তিনি ভাবতেন, দেশের জন্য এরকম কিছু করা দরকার, যেখানে একদম স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চাকরিপ্রত্যাশীরাও খুব সহজে বাংলায় বিভিন্ন কোর্স করতে পারবেন। এই ভাবনা থেকেই হয়েছে আজকের টেন মিনিটস স্কুল। ২০১৫ সালে এর যাত্রা শুরু হয়। এখন অনলাইনে লাখ লাখ শিক্ষার্থী আয়মান সাদিক ও তার টেন মিনিটস স্কুলের শিক্ষার্থী। নিজে শিক্ষকতা করার সময় আয়মান এমনও দেখেছেন, টাকার অভাবে অনেকে ভর্তি কোচিং করতে পারছেন না। সে কারণে খারাপ লাগা আর পড়ানোর প্রতি ভালো লাগা থেকে আয়মান ভাবতেন, বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীকে কীভাবে বিনা খরচে লেকচার দেওয়া যায়। নিজে সারাদিন ক্লাস করে, টিউশনি করে রাতের বেলায় ভিডিও কনটেন্ট বানাতেন। সেগুলো আপলোড করা হতো ওয়েবসাইটে। এখন পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছুরাসহ বিসিএস পরীক্ষার্থীরাও টেন মিনিটস স্কুলের শিক্ষার্থী। অসংখ্য ভক্ত পাঠ নিচ্ছে তার অনলাইন লেকচার থেকে। বিভিন্ন ভিডিও কনটেন্ট ছাড়াও রয়েছে বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের ক্লাসের সরাসরি সম্প্রচার।
জাইবা তাহিয়া
জাইবার জন্ম ঢাকায়। ছোটবেলায় কানাডায় স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। এরপর ঢাকায় ফিরে এসে কয়েকবছর থাকার পর ইংল্যান্ডে গিয়ে অপরাধ বিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। তার যখন উনিশ বছর বয়স, তখন তিনি বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্টে ইন্টার্নশিপ করেন। সেখানে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ওপরে গবেষণা করতে গিয়ে তাকে প্রায়ই নানা নির্মমতার ঘটনা জানতে হতো। ঘরে ফিরে কাঁদতেন। এরপরই সিদ্ধান্ত নেন এ নিয়ে কিছু করবেন। সেই ভাবনা থেকেই কাজ, আর নিজের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেলেন কুইন্স ইয়াং লিডার’স অ্যাওয়ার্ড। বাংলাদেশের যে ছয়জন তরুণ এই পুরস্কার পেয়েছেন, তাদের মধ্যে একমাত্র নারী তিনি। দেশে কিছু করার কথা মা-বাবাকে বলার পর শুরুতে তারা খুব অবাক হন, কিন্তু উত্সাহ দিয়ে বলেন, ‘থেমে থেকো না।’ পুলিশ স্টাফ কলেজে রিসার্চার হিসেবে কাজ করার পর ভাবলেন এবার কাজ শুরু করা যাক। গড়লেন নিজের সংগঠন, ফিমেল এম্পাওয়ার মুভমেন্ট বা সংক্ষেপে ফেম। গণমাধ্যমে নারী নির্যাতন, ধর্ষণের খবর প্রায়ই তার চোখে পড়ত, যা দেখে কষ্ট পেতেন। সমাধান ভাবতে গিয়ে শুরু করলেন প্রজেক্ট ‘আত্মরক্ষা’। নারীদের কারাতের মাধ্যমে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এতে। আত্মরক্ষার পদ্ধতি জানা থাকলে তা শুধু শারীরিকভাবে সুরক্ষাই দেয় না, আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে তোলে। তৃণমূল থেকে কাজ শুরু করলেও জাইবা প্রচারমুখী ছিলেন না। তিনি মনে করেন, শেখার কোনো শেষ নেই। তার জীবনের লক্ষ্যই হলো নিয়মতান্ত্রিক ও ইতিবাচক জীবন কাটাবেন, অন্যদের ইতিবাচক শিক্ষা দেবেন। জাইবার মতে, নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করার জন্য এখনই সময় এগিয়ে আসার। আর এতে তরুণদেরই মূল ভূমিকা রাখতে হবে।