পাকিস্তানের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রস্তাবিত 'জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন'কে 'লজ্জাজনক কমিশন' বলে সমালোচনা করেছে দেশটির সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণে কাজ করে যাওয়া বেশ কিছু সংগঠন। ৫ মে এই কমিশন গঠন করে যার প্রধান করা হচ্ছে তাহরিক-এ-ইনসাফ নেতাকে। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় তীব্র হচ্ছে। পাকিস্তানের এই কমিশন গঠনের সমালোচনা করে সংখ্যালঘুদের বেশ কিছু সংগঠন জানায়, এই কমিশনকে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি করা হচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।
পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণে কাজ করে আসা সংগঠন সেন্টার ফর সোশ্যাল জাস্টিস (সিএসজে), দ্য পিউপলস' কমিশন ফর মাইনোরিটিস রাইট (পিসিএমআর), দ্য সেসিল অ্যান্ড আইরিস চৌধুরী ফাউন্ডেশন এবং দ্য ক্যাথলিক কমিশন ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস এক যৌথ বিবৃতিতে এ কথাগুলো জানায়। জাতিসংঘের 'প্যারিস প্রিন্সিপাল' মানদণ্ড অনুসারে এই কমিশন গঠন করা হচ্ছে না বলে দাবি করে এই সংগঠনগুলো। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আইএ রহমান, পিটার জ্যাকব, মাইকেল চৌধুরী এবং অ্যাডভোকেট কল্পনা দেবী বলেন, '(পাকিস্তানের) প্রধান বিচারপতি তাসসাক হোসেন জিলানি ২০১৪ সালের জুন মাসে যে রায় দিয়েছে তার ৩৭ নম্বর প্যারার ৪ নম্বর অর্ডার অনুসারে এই কমিশন গঠিত হয়নি। সেখানে বলা হয়, সংখ্যালঘুদের জন্য গঠিত এই কমিশন হবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সংবিধান ও আইন অনুসারে সংখ্যালঘুরা তাদের অধিকার পাচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করাই হবে এই কমিশনের কাজ। আর প্রাদেশিক সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়নও এই কমিশনের দায়িত্বভুক্ত হবে।
পিসিএমআর চেয়ারম্যান পিটার জ্যাকব জানান, সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণে ভূমিকা রাখার জন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম কমিশন গঠন ছাড়া আদালতের এই নির্দেশ বাস্তবায়িত সম্ভব নয়।
এদিকে জাতিসংঘের (প্যারিস প্রিন্সিপাল) নির্দেশনা অনুসারে, রাজনৈতিক দলের কেউ এই কমিশনের অংশ হতে পারবে না। এটি সরকার ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মধ্যকার বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, বিগত ৩০ বছর এরকম অস্থায়ী বেশ কিছু কমিশন সরকারের মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন সময় তৈরি করা হয়েছে। যা শেষ পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় কোন ভূমিকাই পালন করতে পারেনি। পিটার জ্যাকব বলেন, 'একই ভাবে এমন একটি ক্ষমতাহীন কমিশন গঠন কোন কাজেই আসবে না। আর সে কারণে এমন টোকেন প্রস্তাবনা আমরা অস্বীকার করছি।'
তিনি বলেন, 'অধিকার সংরক্ষণের জন্য যেই প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হবে তার আইনি ভিত্তি থাকা জরুরি। অন্যথায়, তা দীর্ঘ পরিক্রমায় ধর্মীয় বিশ্বাসের বৈষম্যের কাছে টিকতে পারবে না।'
পাকিস্তানের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, নারীর মর্যাদা রক্ষা কমিশন এবং শিশু অধিকার রক্ষা কমিশনেরও আইনি ভিত্তি রয়েছে। তাহলে এই কমিশনের কেন আইনি ভিত্তি থাকবে না? তিনি বলেন, 'মানবাধিকারের প্রতি সম্মান রেখে এবং দেশের ভালোর কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত পুনরায় বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কাছে আবেদন করেছি আমরা।'
পাকিস্তান সরকারের ঘোষণা অনুসারে এই কমিশনের প্রধান হিসেবে হিন্দু কমিউনিটির চেলে রাম কেওলানির নাম জানানো হয়েছে। এ ছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, মানবাধিকার কমিশন, ফেডারেল এডুকেশন অ্যান্ড প্রফেশনাল ট্রেনিং, দ্য কাউন্সিল অব ইসলামি আইডোলজির চেয়ারম্যান এবং ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চেয়ারম্যান এই কমিশনে থাকবেন।
এদিকে পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার মুসলিম সংখ্যালঘু 'আহমদীয়া'দের এই কমিশনে সংযুক্ত করার প্রস্তাব বাতিলের জন্যও উঠে পড়ে লেগেছে দেশটির বেশ কিছু ধর্মীও সংগঠন। এমনকি দেশটির ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পীর নুরুল হক কাদরী আহমদীদের এই কমিশনে সংযুক্ত করার বিরোধিতা করে আসছেন। বিষয়টি নিয়ে কমিশন গঠনের আগেই কমিশনের শক্তির পরীক্ষা ও মানবাধিকার রক্ষার সক্রিয়তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ইত্তেফাক/আরএ