আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বর্ণিত সকল জাতিকেই বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেছেন। কখনো ঐশ্বর্য আবার কখনো কষ্টে পতিত করে পরীক্ষা করতে চেয়েছেন তারা আসলে আল্লাহর ওয়াহদানীয়তকে আঁকড়ে ধরে থাকে কি না। আর আল্লাহ প্রদত্ত নবি ও রসুলগণ ্তুবাশীর ও নাযীর হিসেবে কওমগুলোকে সতর্ককারীর দায়িত্ব পালন করেছেন। কোরআনের এসব পরীক্ষার বিষয়গুলো মুসলমান হিসেবে আমরা কম-বেশি জানি। আজ আমরা বর্তমান ইয়েমেনের সাবা সাম্রাজ্যের হিমিয়ারের তুব্বা জাতি সম্পর্কে আলোচনা করব, যাদের ব্যাপারে কোরআনের দুটো সুরা তথা দুখান :৩৭ ও ক্বাফ :১৪ নং আয়াতে আলোচিত হয়েছে। আর দু-একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে রসুল (স) থেকে আলোচিত হয়েছে।
হিমিয়ার রাজ্য প্রাচীন ইয়েমেনের একটি জনপদ। গ্রীক ও রোমানরা একে হোমেরিট রাজ্য বলত। এটি ১১০ খ্রিষ্টপূর্বে স্থাপিত হয়। প্রাচীন শহর জাফরের পর বর্তমান সানা এর রাজধানী হয়। রাজ্যটি ২৫ খ্রিষ্টপূর্বে প্রতিবেশী সাবা, ২০০ খ্রিষ্টাব্দে কাতাবান ও ৩০০ খ্রিষ্টাব্দে হাদরামাওত দখল করে নেয়। ২৮০ খ্রিষ্টাব্দে এটি সাবেইন রাজ্য জয় করে। ৫২৫ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টান আক্রমণকারীদের হাতে পতনের আগ পর্যন্ত হিমিয়ার রাজ্য টিকে ছিল। এ জনপদের সম্রাটকেও তুব্বা উপাধি দেওয়া হতো। তখনকার রীতিই ছিল প্রভাবশালী সম্রাটদের একটি উপনাম থাকত যা তার শৌর্য ও বীরত্বের প্রতীক। যেমন সে সময় পারস্যের বাদশাকে কিসরা, রোমের বাদশাকে সিজার, মিসরের বাদশাকে ফেরাউন এবং ইথিওপিয়ার বাদশাকে নাজ্জাসী বলা হতো। তুব্বা জাতি সম্মান ও উন্নতির সাফল্যে উঠেছিল। তারা হুমায়ের এলাকা যেখান থেকে ঐতিহাসিক সিল্ক রোড আরম্ভ হয়ে সুদূর কনস্টান্টিনপোল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এর শুরুর স্থানে অবস্থান করছিল। কৃষি ও আবাসন শিল্পে তাদের উত্কর্তার ব্যাপারে বর্তমান বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন। এ জাতির চূড়ান্ত সমৃদ্ধির সময় ছিল তুব্বা আসাদ আবু কারব আল হুমায়রীর সময়। তিনি আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। কেউ কেউ তাকে নবির মর্যাদা দিতেন বলে উল্লেখ করেছেন। তার সময়কালটি ছিল পঞ্চম শতাব্দীর উষালগ্নে। অর্থাত্ মুহাম্মদ (স)-এর জন্মের প্রায় সতর বছর পূর্বে। তিনিই একমাত্র ইয়েমেনী শাসক যিনি আরব সাগর পাড়ি দিয়ে হিন্দুস্থানের কিছু অংশ দখল করেছিলেন। তিনি ইয়েমেনের বর্তমান হীরা শহরের প্রতিষ্ঠাতা।
তাফসীরে ইবনে কাছীর বিষয়টি নিয়ে চমত্কার আলোচনা করেছে। তুব্বা বিজয়ের ধারাবাহিকতায় ইয়াসরীবে (পরবর্তীতে মদীনাতুন্নবী) এসেছিলেন। ইয়াসরিবের অধিবাসীরা দিনে তার সঙ্গে যুদ্ধ করত, আবার রাতে মেহমানদারীও করত। তুব্বা এতে খুবই লজ্জিত হন এবং ফিরে যান। এ সময় তার দুজন ইহুদী আলেমের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়। তারা তুব্বাকে বলেছিলেন, আপনি ইয়াসরিব ধ্বংস করতে পারেন না কেননা এটা হলো শেষ নবির হিজরতের স্থান। তুব্বা ইয়েমেন ফিরে যাওয়ার সময় এ দুই ইহুদী আলেমকে সঙ্গে নিয়ে যান। যাওয়ার সময় মক্কা বিশেষ করে কাবা দখল করতে চাইলে তাতেও এ দুই আলেম বাধা দেন এবং বলেন, এ ঘরের ভিত্তি স্থাপনকারী ইব্রাহীম (আ) এবং শেষ নবি মুহাম্মদ (স)-এর সময় এ ঘরের মূল সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পাবে। একথা শুনে তুব্বা এ পরিকল্পনাও বাদ দেন এবং কাবা তাওয়াফ ও গিলাফ উপহার দেন। অতঃপর আলেমদ্বয়কে নিয়ে ইয়েমেনে ফিরে গিয়ে নিজে তত্কালের সত্য ধর্ম তথা ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করেন এবং সকল জাতিকে এ ধর্ম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানান। তখনকার কাওমের মুষ্টিমেয় কিছু লোক ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করে আর অধিকাংশই উপহাসের সঙ্গে বাদশার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে এবং সেখানে প্রচলিত দেব-দেবীর পূজা অব্যাহত রাখে। তাদের অর্থসম্পদ ও আবাসন শিল্পের উন্নতি তাদের অহংকারকে আরো উসকে দেয়। ফলে তাদের ওপর আল্লাহ প্রবল বৃষ্টি ও তুফান ঘূর্ণিঝড়ের মাধ্যমে এ জাতিকে ধ্বংস করে দেন। কেউ কেউ প্রবল বন্যার কথাও উল্লেখ করেছেন। বাদশা তুব্বা এবং তার কিছু ইমানদার অনুসারী অবশ্য এ বিপদ থেকে নিরাপদে ছিলেন। এ কারণেই আতা ইবন আবি রাবাহ থেকে বর্ণিত আছে, রসুল (স) বলেছেন, ওলা-তাসুব্বু তুব্বাআন, ফাইন্নাহু কাদ কানা আসলামা।
lলেখক : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া