মুফতি মো. আব্দুল্লাহ
রোজা ভঙ্গ হওয়া প্রশ্নে সাধারণ ও ব্যাপকহারে আকর গ্রন্থগুলোতে (‘আ-ম্মা’, ‘জায়েফা’ ও মূল ‘মানফায’) মস্তিষ্কে ও পাকস্থলিতে স্বাভাবিক পথে ও সরাসরি মুখের মাধ্যমে পৌঁছার কথা যেমন বলা হয়েছে; ঠিক তেমনি অস্বাভাবিক পথে যেমন কান, নাকের মাধ্যমেও যদি কোনো ওষুধ, তেল ইত্যাদি মস্তিষ্কে পৌঁছে বা গলা অতিক্রম করে বা পাকস্থলিতে পৌঁছে—তাতেও রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। সুতরাং এমন যুক্তি বা সীমিতকরণ যে, পানাহারের কাজ না দিলে, তাতে রোজা ভাঙবে না; কিংবা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করলে; কিংবা পানাহারের স্বাভাবিক পথে (মুখে) না হলে রোজা ভাঙবে না—এমন কোনো ‘শেষকথা’ বা ‘যুক্তি’ বাস্তবে বা সর্বক্ষেত্রে সঠিক নয়। বরং সঠিক হলো, সে সব নীতি, মূলনীতি ও সুনির্দিষ্ট সমাধান যা সার্বিক বিবেচনান্তে গৃহীত হয়ে হাজার বছর ধরে বর্ণিত হয়ে আসছে এবং তাতে ‘ইজমা’ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। যেমন:
(১) “অ্যাজমা ও হাঁপানি রোগীদের অক্সিজেন বা ইনহেলার ব্যবহারের ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা সমস্যা .........তার সঙ্গে যদি ওষুধের সংমিশ্রণ থাকে, তা হলে সেক্ষেত্রে আবার তাতে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে” (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।
(২) “ইউনানী ও আয়ূর্বেদিক বিভিন্ন ওষুধ মুখ দিয়েও খেতে হয় না; কেবল জাল দেয়া বা গরমকৃত ভাঁপ বা বাষ্প নাক দ্বারা নিতে হয়; যা তাত্ক্ষণিক নাক দিয়ে গলা অতিক্রম করে বক্ষদেশ (ফুসফুস) পর্যন্ত পৌঁছে থাকে; তাতেও রোজা ভেঙে যাবে” (জাদীদ ফিকহি মাসাইল:১/১৮৮)।
(৩) “নারীর লজ্জাস্থানে কোনো কিছু (ওষুধ ইত্যাদি) রাখলে বা ব্যবহার করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে” (প্রাগুক্ত: পৃ-১৮১)।
(৪) “নাক , কান ও মলদ্বারের পথে পাকস্থলিতে বা মস্তিষ্কে পৌঁছতে পারে —এমন ওষুধ এসব স্থানে ব্যবহারেও রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়” (প্রাগুক্ত)।
(৫) “পায়খানা বন্ধ হওয়া অবস্থায় ‘অনিমা’ (বা ‘সাপোজিটর’) নেওয়া হয় সেক্ষেত্রে ওষুধস্বরূপ, তা অভ্যন্তর ভাগে লাগানো হয়। এতে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং তার ওপর কাজা করা ওয়াজিব হবে” (মাসায়েলে রোজা : রফয়ত কাসেমী, পৃ-১৩২, দেওবন্দ)।
(৬) “হোমিওপ্যাথিক ওষুধ যা কেবল ঘ্রাণ নিলেই মুখদ্বারা সেবনের অনুরূপ ফলদায়ক, উপকারী হয়”। “ইনজেকশন দ্বারা রোজা ভঙ্গ হয় না; কিন্তু তার মাধ্যমে যদি পাকস্থলিতে ওষুধ পৌঁছানো হয় তা হলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে” (ফাতাওয়া মাহমুদিয়া: খ-১৭, পৃ-১৬৬-১৬৭)।
(৭) “ঢুশ ব্যবহার বা হাঁপানির প্রকোপ নিরসনে গ্যাস জাতীয় ওষুধ ব্যবহারের দ্বারা রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে” (ফাতাওয়া ও মাসাইল: খ-৪, পৃ-৪১, ইফা)।
(৮) “নাকে ওষুধ দিলে রোজা ভেঙে যাবে। কেননা নাকের দিক থেকে গলার দিকে স্বাভাবিক পথ বিদ্যমান” (খানিয়া+হিন্দিয়া:১/২১০)
মোটকথা, সহীহ বিধানটি হলো, ‘ইনহেলার ব্যবহারে রোজা ভেঙে যাবে। তবে রোজা অবস্থায় অসহনীয় মাত্রায় হাঁপানির প্রকোপ দেখা দিলে ইনহেলার অবশ্যই ব্যবহার করতে পারবেন; কিন্তু ঐ রোজাটি পরবর্তীতে সুবিধামতো কাজা করে নিতে হবে।’
কোন্ কোন্ চিকিত্সায় রোজা ভাঙবে না
“শুধু অক্সিজেন গ্রহণের কারণে রোজা নষ্ট হবে না; কারণ তা সাধারণ বাতাস গ্রহণেরই নামান্তর। কিন্তু তার সঙ্গে ওষুধ থাকলে রোজা নষ্ট হবে” (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।
“ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে মহিলাদের মাসিক স্রাব বন্ধ রেখে ত্রিশ রোজা পূর্ণ করে নেওয়া বৈধ। এতে কোনো পাপ হবে না। তবে মাসিকের সাধারণ গতি বন্ধ রাখায় স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হলে, সেটা ভিন্ন ব্যাপার; যা বিজ্ঞ চিকিত্সকরাই ভালো বলতে পারেন।” (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।
“রোজা রেখে শরীরে থেকে রক্ত দিলে বা শরীরে রক্ত নিলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বিধি মোতাবেক যেসব পথে (মানফায) কোনো কিছু প্রবেশ করালে রোজা ভঙ্গ হয়; সে সব পথে রক্ত প্রবেশ বা বের করা হয় না”(জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।
“একইভাবে চিকিত্সাস্বরূপ স্যালাইন গ্রহণেও রোজা নষ্ট হয় না। কারণ, তা সেই সুনির্দিষ্ট পথ বা ছিদ্রের বাইরে রগের মাধ্যমে বা গোশতে গ্রহণ করা হয়।”(জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।
“রোজা অবস্থায় ডায়বেটিস রোগীর ইনসুলিন ব্যবহারেও রোজা নষ্ট হয় না। কারণ, তা-ও সেই ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্ত গ্রহণের অনুরূপ। তবে এই ইনসুলিনই যদি মুখে সেবনযোগ্য ওষুধ/ ট্যাবলেট আকারে (তেমনটি আবিষ্কৃত হলে) মুখ দ্বারা গ্রহণ করা হয়; সেক্ষেত্রে আবার রোজা ভেঙে যাবে। (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।
“রোজা অবস্থায় চোখে ওষুধ বা ড্রপ সুরমা বা মলম ব্যবহারে রোজা নষ্ট হবে না। যদিও এসবের স্বাদ গলায় অনুভূত হয়। কারণ, এসব ক্ষেত্রে রোজা না ভাঙার বিষয়টি সরাসরি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত”। (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।
“রোজা অবস্থায় দিনেরবেলায় তাজা ডাল বা শিকড় দ্বারা মিসওয়াক করাতে, রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। যদিও ঐ ডাল বা শিকড়ের স্বাদ মুখে বা গলায় বোঝা যায়”। এটিও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।
“রোজা অবস্থায় দিনেরবেলায় স্বপ্নদোষ হওয়াতেও রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। তবে যথাসাধ্য ফরজ গোসল করে পবিত্র হয়ে যাওয়া উত্তম। (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।
“রোজা অবস্থায় টিভি, নাটক, সিনেমা ও নাচ-গান দেখা পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। তার কারণ, রমজানের উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন ও আত্মশুদ্ধি; অথচ দু/একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এগুলোর অধিকাংশই রোজার উদ্দেশ্য ও শিক্ষা পরিপন্থি। এসব দ্বারা সিয়াম সাধনার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণের পরিবর্তে বরং সরাসরি তা ব্যাহত হয়। তারপরও তেমন অবৈধ ও অশালীন গান-বাজনা, সিনেমা, নাটক ও টিভি ইত্যাদি দেখা বা শোনার কারণে রোজা নষ্ট হবে না; যদিও শক্ত গুনাহ হবে।
lলেখক : মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, বায়তুল মোকাররম, ঢাকা