কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম ‘চর নোয়াগাঁও’।
গ্রামটির চারদিক নদীঘেরা, দ্বীপের মতো। গ্রামে যাতায়াতের কোনো রাস্তা নেই। গ্যাস নেই। গ্রামের বাসিন্দাদের নিজস্ব জমি নেই। তাদের জন্য নেই কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র কিংবা স্যাটেলাইট ক্লিনিক। রোগ হলে গ্রামের মানুষকে হাতুড়ে ডাক্তার আর ওঝা-কবিরাজের ঝাড়ফুঁকের ওপর ভরসা করতে হয়।
বিচ্ছিন্ন এ গ্রামের মানুষ স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দিতেও যোগাযোগ, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ মৌলিক নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ঐ গ্রামের নানা পেশার মানুষের সঙ্গে কথা হলে তারা তাদের প্রাত্যহিক জীবনের দুর্ভোগের নানা চিত্র তুলে ধরেন।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, চর নোয়াগাঁও গ্রামটি একটি দ্বীপের মতো। এ গ্রামের চারপাশ ঘিরে আছে কাঁঠালিয়া নদী। প্রায় ২ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে আর কোনো গ্রাম নেই। এই গ্রামে প্রায় ৫০০ মানুষ বসবাস করেন। গ্রামের অন্তত ১৮ জন বাসিন্দা জানান, শুকনো মৌসুমে কাঁঠালিয়া নদী পার হয়ে খেতের আল ধরে হেঁটে এবং বর্ষায় নৌকায় চড়ে গ্রামবাসীকে কাশিপুর হয়ে মেঘনা উপজেলা সদরে যাতায়াত করতে হয়।
এ জন্য গ্রামের মানুষকে নির্ভর করতে হয় শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকা সার্ভিসের ওপর। মাঝে-মধ্যে রাতে ডাকাত দল ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে হানা দেয়। ডাকাতের কবল থেকে রক্ষা পেতে গ্রামবাসীকে রাত জেগে পাহারা দিতে হয়।
তারা আরো জানান, এই গ্রামে বিদ্যুত্ এসেছে দেড় বছর আগে। তবে গ্যাস নেই। তাদের নিজস্ব জমি নেই, তাই অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে জীবিকা চালাতে হয়। তবে এ গ্রামে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। সেখানে শিক্ষক আছেন দুই জন এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে লেখাপড়ার জন্য নদী পার হয়ে গ্রামের ছেলেমেয়েদের যেতে হয় প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরবর্তী মানিকারচর এল এন উচ্চবিদ্যালয়ে। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় বিশেষ করে মেয়েদের পক্ষে এই দূরত্ব অতিক্রম করে যাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে মেয়েদের লেখাপড়া আর তেমন এগোয় না।
গ্রামের গৃহবধূ আমেনা বিবি জানান, দারিদ্র্যের কারণে তার দুই ছেলেকে পঞ্চম শ্রেণির বেশি পড়াতে পারেননি। একমাত্র মেয়ে কাঁঠালিয়া নদী পার হয়ে পাশের ব্রাহ্মণচর মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে পড়ছে।
ঐ গ্রামের বাসিন্দা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও কলেজে বিএসএস প্রথম বর্ষের ছাত্র সুমন জানান, তিনি ঐ গ্রামের একমাত্র বিএসএস পড়ুয়া ছাত্র। এর আগে এ গ্রামের কেউ বিএ পাস করেনি। চর নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কমিটির সহসভাপতি আবদুস সাত্তার জানান, স্বাধীনতার দীর্ঘ বছরেও এ গ্রামের মানুষ শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ মৌলিক নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
এই গ্রামে কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, স্যাটেলাইট ক্লিনিক নেই। এমনকি স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীদেরও এ গ্রামে যাতায়াত নেই। ফলে রোগবালাই হলে হাতুড়ে ডাক্তার, ওঝা আর কবিরাজের ঝাড়ফুঁকের ওপর গ্রামবাসীকে নির্ভর করতে হয়। বাসিন্দাদের দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাবে দিন দিন স্কুলেও ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
মেঘনা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল্লাহ মিয়া রতন শিকদার বলেন, এ গ্রামটি দ্বীপের মতো। সেখানে যাতায়াতে গ্রামের মানুষকে নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ নাগরিক নানা সুযোগ-সুবিধা, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।
ইত্তেফাক/জেডএইচ