সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে কার লাভ, কার ক্ষতি

সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আফগানিস্তান থেকেও করার সম্ভাবনা আছে। ইরাকে আকস্মিক সফরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, বিশ্বে পুলিশের দায়িত্ব পালন করতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৈন্য প্রত্যাহার নিয়ে ডান ও বামপন্থিদের ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে এসব দেশে যুদ্ধের কী হবে সেই বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো লক্ষ্য স্থির করতে পারেননি। সমালোচনা চলছে- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে কারা লাভবান এবং কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

 

লাভবান যারা

প্রেসিডেন্ট আসাদ: প্রধানত যিনি লাভবান হবেন তিনি হচ্ছেন- সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। একসময় গৃহযুদ্ধের কারণে ডুবে গেছিলেন প্রেসিডেন্ট আসাদ। আন্তর্জাতিকভাবে তিনি একা হয়ে পড়েছিলেন। ২০১৫ সালে রাশিয়া সহায়তা করার পর তিনি আবার জেগে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য প্রত্যাহারের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির ক্ষমতায় ফের শক্তিশালী হয়ে উঠবেন আসাদ। অথচ আমেরিকা তার স্বৈরশাসনের নিন্দা জানাতে কোনো ধরনের রাখঢাক করেনি। তাকে হাজার হাজার মানুষ হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। তিনি বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন বলেও অভিযোগ। যখন প্রমাণ পাওয়া গেল যে, আসাদের বাহিনী বিদ্রোহীদের এলাকায় নার্ভ এজেন্ট গ্যাস ব্যবহার করেছে তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিরিয়ায় মার্কিন বাহিনীকে বিমান হামলার নির্দেশ দেন। কিন্তু সিরিয়ায় এখন আর সেনাবাহিনী মোতায়েন রাখার কোনো দরকার নেই বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। সৈন্য প্রত্যাহারের পর আসাদ বাহিনী বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত মানবিজ শহরের দখল নিয়েছে বলে দাবি সরকারের। তবে যুক্তরাষ্ট্র সেই তথ্য মিথ্যা বলে দাবি করেছে।

ইরান: কয়েক মাস আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন বলেছিল, সিরিয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য মার্কিন সেনা মোতায়েন রাখা হবে। এখানে ইরানকে প্রতিরোধ করতেই এই কাজ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার এক তৃতীয়াংশ দখলে রেখেছে এবং ইরানের কার্যক্রম এখানে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ায় ইরান এখানে শক্তিশালী হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করবে। দেশটি আসাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। সিরিয়া দিয়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করে।

রাশিয়া: প্রেসিডেন্ট আসাদের প্রধান মিত্র রাশিয়া। ২০১৫ সাল থেকে সিরিয়ায় রুশ সেনাবাহিনী মোতায়েন আছে। মার্কিন সৈন্য না থাকায় সিরিয়ায় মস্কো তার আধিপত্য বিস্তার করবে। এখানকার শক্তি রাশিয়াকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করবে।

ইসলামিক স্টেট (আইএস): সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, আইএস সিরিয়ায় পরাজিত হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এর বিপরীতটাই সত্য। সিরিয়ায় ১৫ হাজার আইএস সদস্য রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আইএস দেশে অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে। অনেক এলাকায় নতুন করে প্রবেশ করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টুইটার বার্তার দশ মিনিট আগে রাক্কায় একটি হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে আইএস। এর মাধ্যমে প্রমাণ হচ্ছে, আইএস নিজেদের পুনরায় সংগঠিত করছে এবং আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংসতা বাড়ানোর হুমকি সৃষ্টি করছে। স্বশাসিত উত্তর ও পূর্ব সিরিয়ার সিনিয়র কর্মকর্তা ইলহাম আহমেদ বলেছেন, সিরিয়ায় মার্কিন সৈন্য রাখা উচিত। কারণ যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে কোনো সমাধান আসবে না, বরং দুর্যোগ বাড়বে।

 

ক্ষতিগ্রস্ত যারা

কুর্দিশ: কয়েক মাস ধরে তুরস্ক সিরিয়ার কুর্দি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় হামলা চালানোর হুমকি দিয়ে আসছে। তুরস্ক এর আগে হামলা চালালেও খুব বেশি ক্ষতি করতে পারেনি কুর্দিদের। মার্কিন সৈন্যরাই মূলত কুর্দিদের রক্ষা করে বা নিরাপত্তা দেয়। সিরিয়ার এক তৃতীয়াংশ কুর্দিদের দখলে। মার্কিন সৈন্য চলে যাওয়ায় কুর্দিরা একা হয়ে পড়বে। ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে সিরিয়ায় মার্কিন সৈন্যের অবস্থানের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পরই এরদোগান কুর্দিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন। কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কুর্দিশ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে তুরস্ক। প্রেসিডেন্ট এরদোগান মনে করেন, সিরিয়ায় কুর্দিরা আধিপত্য বিস্তার করলে তা তুরস্কের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

ইসরাইল: ইসরাইল সিরিয়ায় ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টায় মত্ত। কারণ সীমান্তের দেশটিতে ‘শত্রু দেশ’ ইরান শক্তিশালী হলে তা ইসরাইলের জন্য বিপদের কারণ হবে। এজন্য সিরিয়ায় ইসরাইল বিভিন্ন সময় বিমান হামলা চালিয়েছে। ইরান বাশার আল-আসাদের মিত্র হওয়ায় উদ্বিগ্ন ইসরাইল। যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ায় ইসরাইল তার মিত্র হারাবে।

ইরাকে আকস্মিক সফরে গুঞ্জন: কেউ টের পায়নি। আকস্মিকভাবে ইরাক সফর করলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে কখনো ইরাকের মার্কিন সেনাঘাঁটিতে যাননি ট্রাম্প। সেই নিয়ে প্রভূত সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ থেকে বারাক ওবামা মাঝে মধ্যেই বিদেশের মাটিতে কর্মরত মার্কিন বাহিনীকে চাঙ্গা করতে হাজির হয়ে যেতেন সেই দেশে। একমাত্র ট্রাম্পই গত দুই বছরে একবারের জন্যও ইরাকে পা ফেলেননি। সম্প্রতি সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ সরিয়ে নেওয়া কিংবা আফগানিস্তানের মাটি থেকে সেনা কমানোর কথা ঘোষণার পরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল, তাতে গুঞ্জন ওঠে- ট্রাম্প হয়তো এবার আগের প্রেসিডেন্টদের পথে হাঁটবেন এবং হলোও তাই। সেই সঙ্গে ইরাক সফরেই বুঝিয়ে দিলেন, তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। তিনি জানান, সিরিয়া থেকে সেনা সরানো হবেই।