প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ফিরে পেলেও দেশ সামলানো কঠিন হবে রনিলের

জটিল সাংবিধানিক সংকটের পর রনিল বিক্রমাসিংহে প্রধানমন্ত্রী পদে পুনর্বহাল হলেও ভারত মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক সংকটের অবসান এখনই হচ্ছে না। বিক্রমাসিংহেকে পুনর্বহাল করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট মাইথ্রপালা সিরিসেনা বলেন, ‘নতুন প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে তার মতের কোনো পরিবর্তন আসেনি। শুধুমাত্র পার্লামেন্টের ঐতিহ্য ও গণতন্ত্রের প্রতি সম্মান দেখাতেই তিনি বিক্রমাসিংহেকে পুনর্বহাল করেছেন’। পরিস্থিতিদৃষ্টে এটুকু স্পষ্ট যে, বিক্রমাসিংহে ক্ষমতা ফিরে পেলেও রাজাপাকসে ও সিরিসেনার বিরোধিতা বারবার রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ২০২০ সালে শ্রীলঙ্কার সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে মাহিন্দা রাজাপাকসে এবং মাইথ্রিপালা সিরিসেনার দুই জনেরই সাধারণ রাজনীতিতে ফিরে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। নির্বাচনের আগে তাদের চেষ্টা থাকবে নানাভাবে দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে, যাতে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির (ইউএনপি) সরকারের ভিত নড়বড়ে করে দেওয়া যায়।

২০১৫ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা অভাবনীয় বিজয় অর্জন করে বলেছিলেন, নির্বাচনে তত্কালীন প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের কাছে পরাজিত হলে তাকে ৬ ফুট মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হতো। অথচ এর প্রায় চার বছর পর সেই রাজাপাকসেকেই সম্প্রতি নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ পাঠ করান সিরিসেনা। রাজাপাকসেকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য গত ২৬ অক্টোবর আকস্মিকভাবে দীর্ঘদিনের মিত্র রনিল বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করেন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। এই ঘটনা শ্রীলঙ্কাকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখে ফেলে দেয়। যার সহায়তায় সিরিসেনা প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, সেই বিক্রমাসিংহেকেই প্রধানমন্ত্রীত্ব রক্ষার্থে সিরিসেনার কাছে অরণ্যে রোদন করতে হয়েছে। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে। পদচ্যুত নেতার পক্ষে রাজপথে নেমে আসেন হাজার হাজার সমর্থক। তারা সিরিসেনার অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার প্রতিবাদ জানান। পরবর্তীতে নানা নাটকীয়তার পর সেখানে পার্লামেন্ট অধিবেশন বসে, যাতে বিক্রমাসিংহের ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) সফলভাবে সরকারের বিরুদ্ধে দু’দফা অনাস্থা প্রস্তাব পাস করে। এর পরেও সিরিসেনা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন।

এদিকে সিরিসেনা বিক্রমাসিংহেকে দাম্ভিক ও একগুঁয়ে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘তিনি শুধু ব্যাপকভাবে দুর্নীতিপরায়ণই নন, প্রেসিডেন্টকে হত্যার ষড়যন্ত্র তদন্ত করতেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। বিক্রমাসিংহ যদি আবারো প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে আমি একটি ঘণ্টাও আমার অফিসে থাকবো না’। এরপর যখন স্পষ্ট হল, সরকার গঠন করার মতো সমর্থন নতুন নিয়োগ পাওয়া রাজাপাকসের নেই, তখন সিরিসেনা ২২৫ সদস্যের পার্লামেন্ট ভেঙে দেন। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে ডিক্রি জারি করেন। এতে আবারো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। এ সংক্রান্ত একটি রিটের প্রেক্ষিতে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট সিরিসেনার ওই ডিক্রির ওপর স্থগিতাদেশ দেন। এ প্রসঙ্গে রাজাপাকসের দল শ্রীলঙ্কা’স ফ্রিডম পার্টির নেতা সুশীল প্রেমাজয়ন্ত বলেন, ক্ষমতার লড়াইয়ের ইতি টানতে এবং নতুন সংসদ গঠনে জনগণকে সুযোগ দিতেই সংসদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সিরিসেনা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পুনরায় চালু হওয়া পার্লামেন্টে বিক্রমাসিংহের দল দ্রুতই রাজাপাকসে সরকারের বিরুদ্ধে দুই দফা অনাস্থা প্রস্তাব পাস করে। এরপরেও সিরিসেনা পিছু হটতে নারাজ। তিনি বলেন, আমি বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রী বানাবো না, জীবনেও না।

অবশেষে দু’মাসের দীর্ঘ ঝঞ্ঝাটের পর গত রবিবার সিরিসেনা কিছুটা নমনীয় হন বিক্রমাসিংহেকে আবারো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। পূর্বের কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে প্রেসিডেন্ট এটি করতে বাধ্য হয়েছেন মূলত সুপ্রিম কোর্টের চাপের কারণে। বিশ্লেষকরা একে বেশ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রকল্প পরিচালক অ্যালেন কিনান বলেন, শ্রীলঙ্কায় সাংবিধানিকভাবে অনুমোদিত সরকারের ক্ষমতা ফিরে পাওয়া দেশটির গণতন্ত্রের জন্য বড় বিজয়। তবে সংকটের অবসান হতে আরো সময় লাগবে। দেশে এখনো শান্তি ফিরে আসেনি। আর এর মূল কারণ হলো- প্রধান তিনজন ব্যক্তি সিরিসেনা, বিক্রমাসিংহে ও রাজাপাকসে নিজেদের ভেতরেই বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে অর্থনৈতিক নীতি, সাংবিধানিক সংস্কার, যুদ্ধাপরাধ ও দুর্নীতি সংক্রান্ত জবাবদিহিতা নিয়ে তাদের মধ্যে এখনো সুস্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।

সার্বিকভাবে, দফায় দফায় সুপ্রিম কোর্টের রুল জারির কারণেই মূলত শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অচলাবস্থার আপাতত অবসান ঘটেছে। গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি প্যানেল সিরিসেনার পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার নির্দেশনাকে অবৈধ আখ্যা দেন। এক রুল জারি করে তারা বলেন, সাড়ে চার বছর অতিবাহিত হওয়ার আগে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া বেআইনী (উল্লেখ্য, শ্রীলঙ্কার সর্বশেষ পার্লামেন্ট গঠন হয়েছিল আগস্ট, ২০১৫)। পরেরদিন আরেকটি রায়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রধানমন্ত্রী রাজাপাকসে ও তার মন্ত্রিসভার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখেন। রাজাপাকসের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট একের পর এক রায় দেয়ার ফলে অবশেষে গত শনিবার তিনি পদত্যাগ করেন।  প্রসঙ্গত, তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে ২৬ বছরের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসানের কৃতিত্ব থাকায় সিংহলীজদের কাছে এখনো রাজাপাকসের জনপ্রিয়তা রয়েছে। যদিও বর্তমান সাংবিধানিক সংকটের মুখে এই জনপ্রিয়তা খুব একটা কাজে আসেনি।

শনিবার পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও রাজাপাকসে বিক্রমাসিংহের সংস্কার কার্যক্রমে বাধা দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন। দীর্ঘ ১০ বছর ক্ষমতায় থাকা রাজাপাকসে প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসে আমরা দেশের বিরোধী সকল শক্তিকে পদানত করব’। প্রেসিডেন্ট সিরিসেনাও তার কৃতকর্মের জন্য কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। তিনি আরো বলেন, ‘যদি আমি অভিশংসিত হই, কারারুদ্ধও হই, তাহলে ইতিহাস সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আমার পক্ষে বিচার করবে’। অথচ কয়েক বছর আগেও সিরিসেনা ও বিক্রমাসিংহের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ২০১৫ সালে দুর্নীতি দমন ও যুদ্ধকালীন নৃশংসতার সুবিচার নিশ্চিতকরণের প্রতিজ্ঞা নিয়ে তারা উভয়ে সরকার গঠন করেছিলেন। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক নীতিকে কেন্দ্র করে তাদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেয় এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল ধরে।

এমতাবস্থায় তাদের আবারো একসঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করা বেশ কঠিন। যদিও গত রবিবার সিরিসেনা বলেন, ‘বিক্রমাসিংহকে পদচ্যুত করা হয়েছিল দেশের স্বার্থে তবে এখন এই সরকারের সঙ্গেই তিনি কোনো রকম সংঘাত ছাড়া কাজ চালিয়ে যাবেন’। এ প্রসঙ্গে এডেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রীলঙ্কান বংশোদ্ভূত অধ্যাপক অসঙ্গা ওয়েলিকালা বলেন, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর তারা আবারো একসঙ্গে কাজ করবেন এমনটি হওয়া দুষ্কর। বিক্রমাসিংহেকে আবারো পুনর্বহাল করাকে সিরিসেনার ‘কৌশলগত পশ্চাত্পসরণ’ হিসেবে দেখছেন তিনি।

শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কর্মী  শ্রীন সারুর ওয়েলিকালার সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, এটা খুবই বিশ্রী ব্যাপার হতে চলেছে। খুবই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। বিরোধীরা সবকিছুই আটকে দিয়ে দেশ পরিচালনা অসম্ভব করে তুলবে। কারণ, বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ইউএনপি সরকারের নেই। তারা সরকারকে অচল করে দেবে। গত সাত সপ্তাহ ধরে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যদিয়ে ইউএনপি যে সফলতা অর্জন করেছে, পরবর্তী দিনগুলোতে তা ম্লান হয়ে যাবে। যদি ইউএনপি ২০২০ সালের নির্বাচন পর্যন্ত তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে চায়, তাহলে দরিদ্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমাতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। একই সঙ্গে যুদ্ধ-সংঘাতে হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো সিরিসেনা বা রাজাপাকসের সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই নেয়ার সক্ষমতা বিক্রমাসিংহের রয়েছে। তবে ক্রাইসিস গ্রুপের প্রকল্প পরিচালক অ্যালেন কিনান ও অধ্যাপক ওয়েলিকালা বিষয়টিকে এত সহজ বলে মনে করছেন না।