n ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক দুর্যোগ ও অন্যান্য ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে আজ যখন বাংলাদেশের বিশ্বের বুকে মাথা তুলে নিজেদের জানান দেবার সময়, ঠিক তখন বাংলাদেশসহ সারাবিশ্ব এক অদৃশ্য জীবাণু করোনা ভাইরাসের কারণে বিপর্যস্ত। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ বেকারত্ব, দারিদ্র্যতা, খাদ্য ঘাটতি, দুর্ভিক্ষের মতবিষয়গুলো নিয়ে পূর্বাভাস দিয়ে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্ভাব্য খাদ্য ঘাটতি ও খাদ্যনিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ‘এক ইঞ্চি জায়গাও খালি রাখা যাবে না’ ঘোষণা দিয়েছেন। স্বাস্থ্য খাতের মতো এ মুহূর্তে এবং ভবিষ্যতে করোনামুক্ত হবার পরও কৃষির গুরুত্ব বিবেচনায় কৃষিতে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনাসহ সার ও বীজ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। শস্য কৃষি, ফলমূল, শাক-সবজি, হাঁস-মুরগি, মাছ ও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত উদ্যোক্তা ৪ শতাংশ সুদের হারে ঋণ নিতে পারবে। উদ্দেশ্যটি নিঃসন্দেহে যুগোপযোগী হলেও তার বাস্তবায়ন নিয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করার পাশাপাশি যাতে প্রকৃত কৃষকরা ঋণ পেতে পারে এ বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
কতিপয় সুপারিশমালা হলো— ধান-চাল ক্রয় কর্মসূচির সময় চাল আমদানি অনুত্সাহিত করতে হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকগণ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। কৃষকদের কাছ থেকে আরো বেশি পরিমাণ কেনার মাধ্যমে সরাসরি বেশি সংখ্যক কৃষকদের এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজারে যাতে কৃত্রিম উপায়ে দাম কমানোর ব্যবস্থা করতে না পারে সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন, খাদ্য অফিস ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে যৌথভাবে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, খাদ্য অফিস, কৃষি সম্প্রসারণ অফিস ও বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি দৈনিক ভিত্তিতে বাজার মনিটরিং করতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে কৃষকও ধান/চালের কেনাবেচার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফড়িয়া, ব্যাপারী,পাইকার, মজুতদার, মিলার, আড়তদার, পরিবহন ও অন্যান্য শ্রমিক যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে সে ব্যবস্থা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।
উত্পাদিত ধান অনেক সময় দূরের বাজারে বিক্রি করার প্রয়োজন হতে পারে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধান-চাল বাজারে পৌঁছাতে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা সহায়তা করতে পারে।
খাদ্য বিভাগ ঋণের বিনিময়ে ধান/চাল সংগ্রহ কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে। সরকার ব্যক্তি মালিকানাধীন চালকল/গুদাম ভাড়া নিয়ে এ কাজটি করতে পারে। ধরা যাক, ২ লাখ মেট্রিক টন ধান ক্রয় করা হবে। এক্ষেত্রে ঋণের বিনিময়ে কৃষক গুদামে ধান সংরক্ষণ করার বিনিময়ে ঋণ পাবে। ‘ধানের বিনিময়ে ঋণ’। যখন বাজারে দাম বৃদ্ধি পাবে তখন কৃষক তার গুদামে সংরক্ষিত ধান বাজারে বিক্রি করার মাধ্যমে ঋণ পরিশোধ করবে। খাদ্যবিভাগ ও কৃষক যৌথভাবে বাজারে বিক্রির কাজটি করতে পারে। খাদ্য বিভাগ বিক্রি থেকে ঋণের টাকা কাটার পর অতিরিক্ত অর্থ কৃষককে প্রদান করবে। এক্ষেত্রে ঋণের সময় মূল্য প্রদান করতে কৃষকরা রাজি থাকবে বলে আমার ধারণা। এ পুরো কাজটি হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে যেখানে অস্বচ্ছতার কোনো সুযোগ থাকবে না।
খাদ্য বিভাগ পুরো লক্ষ্যমাত্রা কেবলমাত্র কৃষকদের কাছ থেকে কিনে নিবে। এ কাজটি মিলারদের সঙ্গে নিয়ে করতে পারে। যেহেতু কৃষক আর্দ্রতা অনুযায়ী ধান বিক্রি করতে পারে না সেক্ষেত্রে মিলার ও খাদ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রচলিত ও প্রতিযোগিতামূলক সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে কৃষকদের ধান শুকানো ও মিলিং-এর কাজ করবে। এ অবস্থায়, কৃষক ও মিলার উভয়ই লাভবান হবে। সরকারও তার দুই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবে।
খাদ্য বিভাগ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে মিলারদের কাছ থেকে চাল কিনবে। সরকার কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে নিয়ে মিলারদের নিকট হতে প্রতিযোগিতামূলক খরচের ভিত্তিতে শুকানোর কাজটি করিয়ে নিতে পারে। যেমন এক জন মিলার যদি সর্বোচ্চ ১০ টন সংগ্রহ কেন্দ্রে বিক্রি করতে পারে তাহলে সরকার তার কাছ থেকে ৫ টন কিনে নিবে আর বাকি ৫ টন কৃষকদের কাছ থেকে সংগৃহীত ধান যা মিলারদের চাতালে বা মেশিনে শুকিয়ে চালে রূপান্তরের মাধ্যমে করে নিতে পারে। প্রতিযোগিতায় মূলক ভিত্তিতে কৃষক ও মিলার উভয়ই লাভবান হবে।
খাদ্য বিভাগ তার সংগ্রহ, পরিবহন ও মিলিং খরচ কমানোর ব্যবস্থা করতে পারে। বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে একাধিকবার শ্রমিক ও পরিবহন খরচ বহন করতে হয়। ধান কৃষকদের নিকট থেকে খাদ্য গুদাম, খাদ্য গুদাম থেকে মিলার পরবর্তীতে মিলারদের নিকট থেকে খাদ্য গুদামে আনা-নেওয়ার জন্য কৃষক ও খাদ্য অফিসকে খরচ বহন করতে হয়। খাদ্য বিভাগ কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয়কৃত ধান সরাসরি মিলারদের চালকলে পাঠিয়ে মিলিং করে খাদ্য গুদামে নিয়ে আসতে পারে। এ ব্যবস্থা সহজেই সরকারের ধান/চাল সংগ্রহের জন্য শ্রমিক ও পরিবহন খরচ কমাবে। সঙ্গে সঙ্গে ধানের বদলে চাল সংরক্ষণের জন্য মজুত সক্ষমতার পরিমিত ব্যবহার সম্ভব হবে। তাছাড়া খাদ্য বিভাগ ধানের ক্ষেত্রে ৮৫-৯০ মেট্রিক টনের খামালসমূহ চালের খামালে রূপান্তরের মাধ্যমে গুদাম ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও পরিমিত ব্যবহার করতে পারবে।
বাস্তবতার নিরিখে খাদ্য বিভাগের পক্ষে অসংখ্য কৃষকদের ফার্মগেটে যেয়ে ধান কেনা হয়তো সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে কৃষক পরিবহন খরচ ও সময় ব্যয় করে সংগ্রহ কেন্দ্রে এসে ধান বিক্রি করতে হয়। তবে বিক্রি করতে না পারার অনেক উদাহরণও আছে। এক্ষেত্রে কৃষক ধানের ১৪ শতাংশ আর্দ্রতা বজায় রাখতে না পারার বিষয়টি অন্যতম একটি কারণ। এ অবস্থায় কৃষক দুইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি হলো ধান বিক্রি করতে না পারা এবং অন্যটি পরিবহন ব্যয় ও সময়। এ বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। অনেক কৃষক দাঁত দিয়ে ধান কামড়িয়ে আর্দ্রতার একটা ধারণা নিয়ে থাকে সেটা সবসময় সঠিক নাও হতে পারে। সংগ্রহ কেন্দ্রে ধান কেনার জন্য ন্যূনতম ১৪ শতাংশ আর্দ্রতা বিষয়টি কৃষকদেরকে জানানোর পাশাপাশি আর্দ্রতা পরিমাপের জন্য নিকটবর্তী খাদ্য অফিস বা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সহযোগিতা করতে পারে। যে অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয় অথবা পরিবহন খরচ বেশি (যেমন- হাওর এলাকা, চর এলাকা) সেক্ষেত্রে এ বিষয়টি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
করোনাকালীন এ দুর্যোগেও করোনা পরবর্তীসম্ভাব্য খাদ্য ঘাটতি ও খাদ্য অনিরাপত্তা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের কৃষকদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাদের উত্পাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তিতে সহায়তা করতে হবে। তাদের কায়িক পরিশ্রমের বিনিময়ে ১৭ কোটি মানুষকে খাইয়ে রাখার এ যুদ্ধে তাদের পাশে দাঁড়ানোর বিকল্পটা কি হতে পারে।
g লেখক :প্রফেসর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়