শিফারুল শেখ
করোনা ভাইরাস মানুষের জীবন এবং জীবিকায় আঘাত করেছে। আবার বিশ্ব রাজনীতিতে দুই প্রভাবশালী রাষ্ট্রের মধ্যেও বিভেদের সৃষ্টি করেছে। বিতর্ক হচ্ছে মহামারীতে রূপ নেওয়া ভাইরাসের উত্পত্তি নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার দাবি করছেন, চীন থেকেই এই ভাইরাসের উত্পত্তি হয়েছে। আর চীন সেই অভিযোগ অস্বীকার করে চলছে।
একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনা সংকটের জন্য বারবার চীনকেই দায়ী করছেন। প্রতিবারই তিনি নতুন অভিযোগ দাঁড় করাচ্ছেন। ট্রাম্পের মতে, চীন ভুল করে করোনা সংকট সৃষ্টি করে সেই সংক্রান্ত তথ্য গোপন রেখেছে। তারপর চীনের বিরুদ্ধে তার বিস্ফোরক অভিযোগ, উহান শহরের গবেষণাগারে ইচ্ছাকৃতভাবে এই ভাইরাস তৈরি করা হয়েছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সেই সুরে সুর মিলিয়েছেন। এমন অভিযোগের সপক্ষে ট্রাম্প ও পম্পেও অবশ্য কোনো তথ্যপ্রমাণ দেখাতে পারেননি। আবার চীন যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ অস্বীকার করছে এবং এটা রাজনীতিকদের বাদ দিয়ে বিজ্ঞানীদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। দেশটি বলছে, আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় পেতেই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ও তার সমর্থকরা চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। আবার চীনও গত মার্চে বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রেই ভাইরাসটি তৈরি হয়েছে এবং মার্কিন সেনাবাহিনী সেটি চীনে এনেছে।
গোয়েন্দারা কী বলছেন
ট্রাম্প একবার দাবি করেন, তিনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য ঘেঁটে চীনে ভাইরাসের উত্পত্তির প্রমাণ পেয়েছেন। কিন্তু শীর্ষ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার দপ্তর প্রকাশ্যে এমন দাবি নস্যাত্ করে দেয়। তারপর আমেরিকাসহ পাঁচটি ইংরেজিভাষী দেশের তথাকথিত ‘ফাইভ আইস ইনটেলিজেন্স’ গোয়েন্দা সহযোগিতা কাঠামোর ১৫ পৃষ্ঠার এক দলিল উদ্ধৃত করে অস্ট্রেলিয়ার এক সংবাদপত্রের দাবি, করোনার বিষয়ে চীন মিথ্যা কথা বলেছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্যপ্রমাণ লোপাট করেছে। কিন্তু এমন দাবি নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস গোয়েন্দা সংস্থার এমন কোনো রিপোর্টের অস্তিত্ব সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। অস্ট্রেলিয়া সরকারের মতে, সবার জন্য উন্মুক্ত ‘ওপেন সোর্স’ নথিপত্রকেই গোয়েন্দা তথ্য হিসেবে তুলে ধরায় এমন বিভ্রান্তি। জার্মানির সম্প্রচার নেটওয়ার্ক এনডিআর জানায়, জার্মান গোয়েন্দা সংস্থা বিএনডিও ‘ফাইভ আইস’ গোয়েন্দা কাঠামোর চীন সংক্রান্ত দলিলের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে। ‘ফাইভ আইস নেটওয়ার্ক’ ট্রাম্পের দাবিকেও প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিজ্ঞানীদের অভিমত
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট রায় দিয়েছেন, কোভিড-১৯ কোনোমতেই মানুষের তৈরি হতে পারে না। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ল্যান্সেট মেডিক্যাল জার্নালে এক চিঠিতে লিখেছেন, করোনা ভাইরাস মানুষের তৈরি নয়। তারা বিজ্ঞানের বরাত দিয়ে বলেন, এই ভাইরাস কোনো বন্যপ্রাণী থেকে এসেছে। গত সোমবার ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে মার্কিন শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যান্থনি ফাউচিও বলেন, মানুষ এই ভাইরাসের প্রকৃতিতে কোনো রূপ তারতম্য ঘটিয়েছে এর প্রমাণ নেই। তিনি হোয়াইট হাউজের করোনা টাস্কফোর্সেরও বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেছেন, এটা প্রকৃতি থেকে মানুষের মধ্যে এসেছে। গত ১৭ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা ন্যাচারাল মেডিসিনে এক নিবন্ধে লেখেন, কোনো ল্যাব থেকে করোনা ভাইরাসের উত্পত্তি হওয়াটা অসম্ভব। তারা জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে এর প্রমাণ দেখান। তবে এর উত্স এখনো অজানা। কিন্তু কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা, এটা বাদুড় থেকে প্যাঙ্গোলিনের মধ্যে গেছে এবং সেখান থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যামের অধ্যাপক জোনাথন বল বলছেন, স্তন্যপায়ী প্রাণী হওয়ায় মানুষের মধ্যে সরাসরি অথবা মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কোনো প্রাণীর মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে বাদুড়।